
অনেকেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বলছেন, এতে ওজন কমেছে, শরীর হালকা লেগেছে কিংবা কিছু স্বাস্থ্যগত পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং কি সত্যিই শরীরের জন্য এতটাই কার্যকর, নাকি এর কিছু সুবিধাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাস্তবের তুলনায় বেশি বড় করে দেখানো হচ্ছে? সম্প্রতি প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে গবেষকদের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং কোনো জাদুকরি সমাধান নয়। কারও জন্য এটি কার্যকর খাদ্যাভ্যাস হতে পারে, আবার অন্য কারও ক্ষেত্রে একই ফল নাও মিলতে পারে। এর কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করে ব্যক্তির শরীর, জীবনযাপন এবং ফাস্টিংয়ের ধরনটির ওপর।

দীর্ঘ সময় খাবার না পেলে শরীরের শক্তি ব্যবহারের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসে। প্রথমে শরীর সহজলভ্য গ্লুকোজ ব্যবহার করে। পরে খাবারের সরবরাহ কমে গেলে সঞ্চিত চর্বি থেকে শক্তি নেওয়ার দিকে ঝোঁকে। গবেষণায় এই পরিবর্তনকে বলা হয় ‘মেটাবলিক সুইচ’।
ফাস্টিংয়ের সঙ্গে প্রায়ই অটোফ্যাজি নিয়েও আলোচনা হয়। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে কোষ ক্ষতিগ্রস্ত উপাদান পুনর্ব্যবহার করে। ধারণা করা হয়, এই প্রক্রিয়া কোষের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এ বিষয়ে যে তথ্য পাওয়া গেছে তার বড় অংশ প্রাণী গবেষণা থেকে এসেছে। ইঁদুরের শরীরে কোনো প্রক্রিয়া যেভাবে কাজ করে, মানুষের ক্ষেত্রে তা একইভাবে এবং একই মাত্রায় ঘটবে, এমন নিশ্চয়তা এখনো নেই।

ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় কারণ হলো ওজন কমানোর সম্ভাবনা। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু ধরনের ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং অনুসরণ করলে মানুষের ওজন কমতে পারে। তবে এই ফল সাধারণত প্রচলিত ক্যালরি নিয়ন্ত্রণ বা অন্যান্য খাদ্যাভ্যাসের তুলনায় নাটকীয়ভাবে বেশি নয়।
অর্থাৎ দিনের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খাবার খেলেই যে ওজন কমবে, এমন নয়। সেই সময়ের মধ্যে যদি অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত খাবার, মিষ্টি পানীয় বা অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়া হয়, তাহলে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার সুবিধা অনেকটাই কমে যেতে পারে।
কিছু গবেষণায় ওজন কমার পাশাপাশি রক্তচাপ, কোলেস্টেরলসহ কয়েকটি বিপাকীয় ঝুঁকির সূচকে উন্নতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে সেই উপকার কতটা হবে, তা ব্যক্তি, তার শারীরিক অবস্থা এবং ফাস্টিংয়ের পদ্ধতির ওপর নির্ভর করতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের সাফল্যের গল্প খুব সহজেই চোখে পড়ে। কেউ কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ওজন কমানোর ছবি দিচ্ছেন, কেউ বলছেন দীর্ঘ সময় না খেয়েও বেশ ভালো আছেন। কিন্তু একটি মানুষের অভিজ্ঞতা সবার শরীরে একইভাবে কাজ করবে, এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
বয়স, ঘুম, দৈনন্দিন শারীরিক পরিশ্রম, মানসিক চাপ, খাবারের ধরন, হরমোন এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য সবকিছুই ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
কেউ হয়তো ১৬ ঘণ্টা না খেয়ে থাকা সহজেই মেনে নিতে পারেন। আবার অন্য কারও ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকলে মাথা ঘোরা, দুর্বলতা, অতিরিক্ত ক্ষুধা কিংবা পরে বেশি খেয়ে ফেলার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা রুটিন নিজের জন্য হুবহু অনুসরণ করাই যে সঠিক পথ, তা নয়।

ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং নিয়ে গবেষণার একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো, মানুষ নিজের খাবারের হিসাব কতটা সঠিকভাবে রাখতে পারছেন। অনেকেই সকালের নাশতা, দুপুরের খাবার আর রাতের খাবার মনে রাখতে পারেন। কিন্তু মাঝখানে খাওয়া বিস্কুট, এক মুঠো বাদাম, এক কাপ মিষ্টি চা কিংবা ছোট কোনো নাশতা হয়তো হিসাবের বাইরে থেকে যায়। কখনো মানুষ নিজের খাদ্যতথ্য দিতে গিয়ে কতটা খেয়েছেন, সেটিও কম করে উল্লেখ করতে পারেন।
গবেষণায় মানুষের দেওয়া খাদ্যতথ্যে প্রতিদিনের কয়েক শ ক্যালরি পর্যন্ত কম হিসাব দেখানোর প্রবণতার কথা উঠে এসেছে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় আমরা মনে করি, ‘আমি তো খুব কম খাই, তাহলে ওজন কমছে না কেন?’ অথচ পুরো দিন ধরে কী খাচ্ছি, কতটা খাচ্ছি এবং কতবার খাচ্ছি তার সঠিক হিসাব রাখা সবসময় সহজ হয় না।

ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংকে এমন একটি সহজ সমীকরণ হিসেবে দেখার প্রবণতা আছে। কিছু ঘণ্টা না খেলেই যেন শরীরের নানা সমস্যা কমে যাবে। গবেষণা কিন্তু এতটা সরল কোনো উত্তর দেয় না।
আপনি কখন খাচ্ছেন, তার পাশাপাশি কী খাচ্ছেন এবং কতটা খাচ্ছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত প্রোটিন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাওয়া, নিয়মিত শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা এবং পর্যাপ্ত ঘুম এসবও সুস্থতার অংশ।
বিশেষ করে অতিরিক্ত কঠোর ফাস্টিং বা এক দিন পরপর খাবার খাওয়ার মতো পদ্ধতির ক্ষেত্রে শুধু শরীরের চর্বি নয়, পেশির পরিমাণও কমে যাওয়ার আশঙ্কার কথা গবেষণায় এসেছে। তাই ওজন কমার ক্ষেত্রে শুধু দাঁড়িপাল্লার সংখ্যা কমছে কি না, সেটিই একমাত্র মাপকাঠি হওয়া উচিত নয়। শরীরের পেশি ধরে রাখা, শক্তি বজায় রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস চালিয়ে যাওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

গবেষকেরা এখন মানুষ আসলে কী খাচ্ছে, তা আরও নির্ভুলভাবে বোঝার জন্য নতুন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন। খাবারের ছবি বিশ্লেষণ, চিবানোর ধরন শনাক্ত করতে পারে এমন যন্ত্র, স্মার্ট ফর্ক কিংবা দাঁতে লাগানো ক্ষুদ্র সেন্সর, এসব নিয়ে গবেষণা চলছে।
এ ছাড়া রক্ত ও প্রস্রাবের বিভিন্ন উপাদান বিশ্লেষণ করে একজন মানুষের খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়ার চেষ্টাও চলছে। ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তিগুলো আমাদের নিজের বলা খাদ্যতথ্যের পাশাপাশি শরীর বাস্তবে কী পেয়েছে, সে সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা দিতে পারে।

এর কোনো একক উত্তর নেই। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খাবার খাওয়ার অভ্যাস যদি আপনার জীবনযাপনের সঙ্গে সহজে মানিয়ে যায়, অপ্রয়োজনীয় নাশতা কমাতে সাহায্য করে এবং স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করে, তাহলে এটি আপনার জন্য কার্যকর একটি খাদ্যাভ্যাস হতে পারে। তবে এটিকে অলৌকিক সমাধান ভাবার কারণ নেই। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার পর যদি অতিরিক্ত খেয়ে ফেলেন, দিনের বাকি সময় পুষ্টিহীন খাবার খান, পর্যাপ্ত ঘুম না হয় কিংবা শারীরিক সক্রিয়তা একেবারেই না থাকে, তাহলে শুধু ‘ফাস্টিং’ করলেই সুস্থতা নিশ্চিত হবে না।
শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এমন একটি অভ্যাস বেছে নেওয়া, যা আপনার শরীর, দৈনন্দিন কাজের সময়সূচি এবং জীবনযাপনের সঙ্গে মানিয়ে যায় এবং দীর্ঘদিন ধরে বজায় রাখা সম্ভব। সুস্থ থাকার রহস্য হয়তো কোনো নতুন ফিটনেস ট্রেন্ডের মধ্যে লুকিয়ে নেই। বরং নিজের শরীরের প্রয়োজন বোঝা, কী খাচ্ছি সে বিষয়ে সচেতন থাকা, নিয়মিত নড়াচড়া করা, পর্যাপ্ত ঘুমানো এবং এমন অভ্যাস গড়ে তোলাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যা কয়েক সপ্তাহ নয়, বছরের পর বছর ধরে জীবনের অংশ হয়ে থাকতে পারে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি হেলথ
ছবি: এআই