অবাক করা ৫ উপকারিতা জানলে আজ থেকেই বেশি বেশি খাবেন এই পুষ্টিতে ঠাসা হার্ব
শেয়ার করুন
ফলো করুন

ধনেপাতা (বৈজ্ঞানিক নাম: কোরিয়ানড্রাম স্যাটিভাম)। এটি জনপ্রিয় ভেষজ উদ্ভিদ, যা বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী রান্নায়, সালাদে ও ঔষধি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর সুগন্ধি পাতা শুধু খাবারের স্বাদ বাড়ায় না, বরং এর পুষ্টিগুণ স্বাস্থ্যের নানা উপকার করে থাকে। আর এই উপকারিতা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। ধনেপাতা খাওয়ার মজার তথ্য, এর পুষ্টিগুণ, স্বাস্থ্য উপকারিতার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাসহ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

ধনেপাতার পুষ্টিগুণ

ধনেপাতা পুষ্টিগুণে ভরপুর; ফলে একে সুপারফুড হিসেবেও গণ্য করা যায়। প্রতি ১০০ গ্রাম তাজা ধনেপাতায় নিম্নলিখিত পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়:
ক্যালরি: ২৩ কিলোক্যালরি (কম ক্যালরির কারণে ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক)।

ভিটামিন

• ভিটামিন এ: ৬৭৪৮ IU (দৃষ্টিশক্তি ও ত্বকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ)।
• ভিটামিন সি: ২৭ মিলিগ্রাম (ইমিউন সিস্টেম শক্তিশালী করে)।
• ভিটামিন কে: ৩১০ মাইক্রোগ্রাম (রক্ত জমাটবাঁধা ও হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয়)।

খনিজ

• আয়রন: ১.৭৭ মিলিগ্রাম (রক্তাল্পতা প্রতিরোধে সহায়ক)।
• ক্যালসিয়াম: ৬৭ মিলিগ্রাম (হাড় ও দাঁতের জন্য উপকারী)।
• পটাশিয়াম: ৫২১ মিলিগ্রাম (হৃদ্‌যন্ত্র ও পেশির কার্যকারিতা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক)।
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট: ধনেপাতায় কোয়ারসেটিন, কেম্ফেরল ও বিটাক্যারোটিনের মতো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে, যা ফ্রি র‌্যাডিকেলের ক্ষতি থেকে কোষকে রক্ষা করে।
উচ্চ ভিটামিন ও খনিজ উপাদানই ধনেপাতাকে পুষ্টিকর খাদ্যে পরিণত করেছে। ভিটামিন সি একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা কোষের অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমায় এবং প্রদাহবিরোধী ভূমিকা পালন করে। এ ছাড়া ভিটামিন কে ফিলোকুইনোন হিসেবে রক্ত জমাটবাঁধার প্রক্রিয়ায় কোফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে।

বিজ্ঞাপন

স্বাস্থ্য উপকারিতা

হজমশক্তির উন্নতি করে: পেট ফাঁপা, গ্যাস ও হজমের সমস্যা দূর করতে সহায়ক। এটি পরিপাকতন্ত্রের এনজাইম নিঃসরণ বাড়ায়। ধনেপাতায় রয়েছে লিনালুল ও বোর্নিওলের মতো উদ্বায়ী তেল, যা পাকস্থলীতে পিত্তরস (bile) নিঃসরণকে উদ্দীপিত করে। এটি খাদ্য ভাঙতে ও পুষ্টি শোষণে সহায়তা করে। ধনেপাতার নির্যাস ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোমের (আইবিএস) উপসর্গ কমাতে পারে।

রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি: ধনেপাতায় উচ্চমাত্রার ভিটামিন সি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করে। ভিটামিন সি শ্বেত রক্তকণিকার কার্যকারিতা বাড়ায় এবং সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সহায়তা করে। ধনেপাতার কোয়ারসেটিন ও কেম্ফেরল ফ্রি র‌্যাডিকেল নিষ্ক্রিয় করে, যা কোষের ক্ষতি রোধ করে এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগ যেমন ক্যানসার বা হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমায়।

বিজ্ঞাপন

ত্বকের যত্নে: ধনেপাতার অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টিইনফ্ল্যামেটরি গুণ ত্বকের ব্রণ এবং সংক্রমণ কমায়। ধনেপাতায় সিনিওল এবং লিনোলিক অ্যাসিডের মতো যৌগ রয়েছে, যা স্যাফাইলোক্কাস অরেয়াস ও অ্যাসশেরিশিয়া কোলির মতো ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কার্যকর। ধনেপাতার নির্যাস ত্বকের প্রদাহ ও সংক্রমণ কমাতে পারে।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ: ধনেপাতা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। এর পলিফেনল ও ফ্ল্যাভোনয়েড ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়ায় এবং গ্লুকোজ শোষণ কমায়। পরীক্ষায় দেখা গেছে, ধনেপাতার নির্যাস ইঁদুরের রক্তে শর্করার মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করে।

ডিটক্সিফিকেশন: ধনেপাতা শরীর থেকে ভারী ধাতু (যেমন সিসা, পারদ) দূর করতে সহায়ক। এতে থাকা ক্লোরোফিল ও অন্যান্য যৌগ কেলেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভারী ধাতুকে শরীর থেকে বের করে দেয়। ধনেপাতা সিসার বিষাক্ততা কমাতে পারে।

রান্নায় ধনেপাতার ব্যবহার

বাংলাদেশে মাছ, মাংস, ডাল, ভর্তা, চাটনি, সালাদ ও স্যুপে ধনেপাতা ব্যবহৃত হয়। এটি খাবারে সুগন্ধ ও স্বাদ যোগ করে।

মজার তথ্য

ধনেপাতার গন্ধ কিছু মানুষের কাছে সুগন্ধি মনে হলেও, অন্যদের কাছে এটি সাবানের মতো গন্ধ বলে মনে হয়। এটি OR6A2 নামক জিনের বৈচিত্র্যের কারণে ঘটে, যা গন্ধ সংবেদনশীলতার জন্য দায়ী। এই জিন অ্যালডিহাইড যৌগের প্রতি সংবেদনশীলতা নিয়ন্ত্রণ করে, যা ধনেপাতায় প্রচুর পরিমাণে থাকে।

প্রাচীন মিসরে ধনেপাতা ও বীজ ঔষধি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। তুতেনখামেনের সমাধিতে ধনের বীজ পাওয়া গেছে, যা এর তাৎপর্য বোঝায়।
ধনেপাতা থেকে তৈরি এসেনশিয়াল অয়েলে লিনালুল (৬০-৮০%) থাকে, যা অ্যারোমাথেরাপিতে উদ্বেগ কমাতে ব্যবহৃত হয়।

সতর্কতা

অ্যালার্জি: কিছু মানুষের ধনেপাতায় অ্যালার্জি হতে পারে, যা ত্বকে ফুসকুড়ি বা শ্বাসকষ্টের কারণ হতে পারে। এটি পাতায় থাকা অ্যালডিহাইড যৌগের কারণে ঘটতে পারে। অতিরিক্ত ধনেপাতা গর্ভবতী নারীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে; কারণ, এটি ইউটেরিন সংকোচনকে উদ্দীপিত করতে পারে।

ধনেপাতার চাটনি

উপকরণ: ১ কাপ ধনেপাতা, ২-৩টি কাঁচা মরিচ, ১ কোয়া রসুন, ১ টেবিল চামচ লেবুর রস, লবণ স্বাদমতো।

প্রণালি: সব উপকরণ ব্লেন্ডারে পিষে নিন। প্রয়োজনে সামান্য পানি মেশান। এটি ভাত, খিচুড়ি বা স্ন্যাকসের সঙ্গে পরিবেশন করুন।
এই চাটনিতে ধনেপাতার অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং কাঁচা মরিচের ক্যাপসাইসিন একসঙ্গে হজমশক্তি বাড়ায় ও বিপাক ক্রিয়া ত্বরান্বিত করে।
ধনেপাতা শুধু একটি সুগন্ধি মসলা নয়, বরং এটি পুষ্টিগুণ, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ঔষধি গুণে ভরপুর। হজমশক্তি বৃদ্ধি, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, ত্বকের যত্ন ও বিষাক্ত পদার্থ দূরীকরণে সহায়ক। এ জন্য এটিকে অত্যন্ত উপকারী খাদ্য উপাদান করে তোলে। তবে অতিরিক্ত ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন।

লেখক: খাদ্য ও পথ্যবিশেষজ্ঞ; প্রধান নির্বাহী, প্রাকৃতিক নিরাময় কেন্দ্র

ছবি: হাল ফ্যাশন

প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৫, ০১: ০০
বিজ্ঞাপন