রঙের খেলায় মানসিক প্রশান্তির সন্ধান দিচ্ছে দিতির থেরাপিউটিক আর্ট
শেয়ার করুন
ফলো করুন

ছবি আঁকার জন্য শিল্পী হওয়া জরুরি নয়। মনের কথা প্রকাশের অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে একটি ক্যানভাস, কিছু রং আর তুলির টান। আর সেই সহজ মাধ্যমকেই ভিন্ন মাত্রা দিয়েছেন দিতি রায় তাঁর থেরাপিউটিক আর্ট চর্চার মাধ্যমে।

দিতি রায়ের থেরাপিউটিক আর্ট চর্চা অলটারনেটিভ ওয়েলবিইং-এর একটি রূপ হিসেবে জনপ্রিয় হচ্ছে
দিতি রায়ের থেরাপিউটিক আর্ট চর্চা অলটারনেটিভ ওয়েলবিইং-এর একটি রূপ হিসেবে জনপ্রিয় হচ্ছে

থেরাপিউটিক আর্ট বা আর্ট থেরাপির ইতিহাস শুরু হয় বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে। ১৯৪২ সালে ব্রিটিশ শিল্পী অ্যাড্রিয়ান হিল যক্ষ্মা রোগীদের সুস্থতায় শিল্পের ভূমিকা লক্ষ্য করে ‘আর্ট থেরাপি’ শব্দটি ব্যবহার শুরু করেন। সেখান থেকেই এটি ধীরে ধীরে একটি স্বীকৃত পদ্ধতিতে রূপ নেয়। সৃজনশীল প্রকাশের মাধ্যমে মানসিক ভারমুক্তিই ছিল এর মূল ভিত্তি। সিগমুন্ড ফ্রয়েড ও কার্ল ইয়ুং-এর মনোবৈজ্ঞানিক তত্ত্ব এই ধারাকে প্রভাবিত করে। তবে এর শিকড় আরও প্রাচীন, নানা সংস্কৃতির ভাষাহীন নিরাময় আচার ও শিল্পচর্চায় এর উপস্থিতি ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ধারণা আধুনিক মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নের একটি কাঠামোবদ্ধ ও পেশাদার চর্চায় পরিণত হয়েছে।

তুলির টানকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছেন দিতি রায় তাঁর থেরাপিউটিক আর্ট চর্চার মাধ্যমে
তুলির টানকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছেন দিতি রায় তাঁর থেরাপিউটিক আর্ট চর্চার মাধ্যমে

এই একই ধারাবাহিকতায়, শৈল্পিক উৎকর্ষের নিরিখে নয়, বরঞ্চ দিতি রায়ের থেরাপিউটিক আর্ট চর্চা অলটারনেটিভ ওয়েলবিইং-এর একটি রূপ হিসেবে জনপ্রিয় হচ্ছে। মানসিক প্রশান্তি দিচ্ছে, হিল করছে।একটি ওয়েলনেস ফেস্টে ব্যানক্যাটের আয়োজনে দিতির সঙ্গে আড্ডায় উঠে আসে তাঁর কাজের গল্প।

বিজ্ঞাপন

রং, তুলির টান আর ক্যানভাস এই তিনের মেলবন্ধনে তৈরি হয় এক নীরব আশ্রয়। সেখানে শিল্প কোনো প্রদর্শনীর জন্য নয়, নেই নিখুঁত আঁকার চাপ। আছে শুধু নিজের ভেতরের কথাগুলো রং-তুলির মাধ্যমে প্রকাশ করার স্বাধীনতা। এই জায়গাটিই তৈরি করেছে দিতি রায়ের থেরাপিউটিক আর্ট সেশন।

দিতি রায় একজন থেরাপিউটিক আর্ট লাইফ কোচ
দিতি রায় একজন থেরাপিউটিক আর্ট লাইফ কোচ

দিতি রায় একজন থেরাপিউটিক আর্ট লাইফ কোচ। দীর্ঘদিন ধরে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা, অ্যাকটিভ লিসনিং, বি ফ্রেন্ডিং এবং সুইসাইড প্রিভেনশন নিয়ে কাজ করছেন। তাঁর বিশ্বাস, একজন মানুষ যখন নিজের সৃজনশীল সত্তার সঙ্গে যুক্ত হন, তখন তিনি মানসিক অস্থিরতা ও জীবনের চাপের মধ্যেও নিজেকে সামলে নেওয়ার শক্তি খুঁজে পান যা ব্যস্ত জীবনে সুস্থভাবে টিকে থাকার জন্য খুবই প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন

অনেকেই আছেন, যারা কথা দিয়ে নিজের কষ্ট প্রকাশ করতে পারেন না। কাউন্সেলিং রুমে বসে মনের কথা বলা তাদের জন্য কঠিন। কিন্তু রং, রেখা ও টেক্সচারের স্তরে স্তরে তারা বলে ফেলেন মনের গভীরের না-বলা গল্প। দিতির সেশনগুলোতে তাই “ভালো আঁকতে হবে” এমন কোনো শর্ত নেই। কেউ আঁকেন আকাশ, কেউ অদ্ভুত ছায়া, কেউবা উজ্জ্বল ফুল। প্রতিটি ছবিই হয়ে ওঠে মনের ভাষা।

এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারীরা ধীরে ধীরে প্রশান্তি ফিরে পান
এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারীরা ধীরে ধীরে প্রশান্তি ফিরে পান

এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারীরা ধীরে ধীরে প্রশান্তি ফিরে পান। মনোযোগ চলে আসে বর্তমান মুহূর্তে। দুশ্চিন্তার কোলাহল কমে যায়। রং মেশানো, তুলির ধীর ছোঁয়া, কিংবা আঙুলের ডগায় ক্যানভাস ছোঁয়ার ছন্দে তৈরি হয় এক ধরনের মেডিটেটিভ অবস্থা। যা ধীরে ধীরে উদ্বেগ, চাপ ও একাকীত্ব কমাতে সাহায্য করে।

দিতির কাজের বড় একটি দিক হলো মানুষকে নিজের জন্য সময় বের করতে শেখানো। গান, নাচ, ছবি আঁকা শৈশবের এই ‘প্লেফুল’ অভ্যাসগুলো আমরা বড় হতে হতে হারিয়ে ফেলি। কিন্তু সেই মানসিকতায় ফিরে যেতে পারলে আমরা আমাদের ভেতরের শিশুসত্তার সঙ্গে আবার যুক্ত হতে পারি। বুঝতে পারি, সে কী চায়। এই সংযোগ মানুষকে আরও সচেতন ও ‘গ্রাউন্ডেড’ করে তোলে।

তিনি শিশু, প্রাপ্তবয়স্ক ও বয়স্ক সব বয়সীদের সঙ্গে কাজ করেন
তিনি শিশু, প্রাপ্তবয়স্ক ও বয়স্ক সব বয়সীদের সঙ্গে কাজ করেন
হোলিস্টিক ওয়েলবিয়িং এর দৃষ্টিকোণ থেকেই তাঁর সেশনগুলো তৈরি
হোলিস্টিক ওয়েলবিয়িং এর দৃষ্টিকোণ থেকেই তাঁর সেশনগুলো তৈরি

তিনি শিশু, প্রাপ্তবয়স্ক ও বয়স্ক সব বয়সীদের সঙ্গে কাজ করেন। প্রয়োজন হলে সাইকোলজিস্টদের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেন। কারণ তাঁর মতে, ভালো থাকা কোনো একদিনের বিষয় নয়; এটি একটি ধারাবাহিক চর্চা। ভালো লাইফস্টাইল, নিজের পছন্দের কাজকে সময় দেওয়া, মনকে ধীরে ধীরে স্থির করা এই ‘হোলিস্টিক ওয়েলবিয়িং’ এর দৃষ্টিকোণ থেকেই তাঁর সেশনগুলো তৈরি।

দিতির সেশনে রয়েছে ফোকাস ও কনসেনট্রেশন বাড়ানোর অনুশীলন, গ্রোথ মাইন্ডসেট, ভিশন বোর্ড, জেন্ট্যাঙ্গল ও প্যাটার্নভিত্তিক স্ট্রেস রিলিভিং টুলস। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি ঘটে সেশনের বাইরে। অংশগ্রহণকারীরা বাড়িতে নিজের মতো করে আঁকেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেন, একে অপরকে অনুপ্রাণিত করেন। তখন আর্টটি কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে না, জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।

দিতির থেরাপিউটিক আর্ট তাই কেবল ছবি আঁকা নয়। এটি নিজেকে আবিষ্কারের একটি অভিযাত্রা
দিতির থেরাপিউটিক আর্ট তাই কেবল ছবি আঁকা নয়। এটি নিজেকে আবিষ্কারের একটি অভিযাত্রা
দিতির সেশনে রয়েছে ফোকাস ও কনসেনট্রেশন বাড়ানোর অনুশীলন, গ্রোথ মাইন্ডসেটের মতো বিষয়
দিতির সেশনে রয়েছে ফোকাস ও কনসেনট্রেশন বাড়ানোর অনুশীলন, গ্রোথ মাইন্ডসেটের মতো বিষয়

দিতি মনে করেন, আমরা সবাই এক কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। চারপাশের অনেক কিছু আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। মতামত, অস্থিরতা, ক্লান্তি সব মিলিয়ে মন ভারী হয়ে থাকে। এই সময়ে সবচেয়ে জরুরি হলো সহমর্মিতা এবং নিজের মনকে যত্নে রাখা। কারণ নিজের ভেতরটা ঠিক রাখতে না পারলে পৃথিবীর জন্য কোনো ইতিবাচক অবদান রাখা সম্ভব নয়।

দিতির থেরাপিউটিক আর্ট তাই কেবল ছবি আঁকা নয়। এটি নিজেকে আবিষ্কারের একটি অভিযাত্রা যেখানে মানুষ নিজের ভেতরের অন্ধকারকে রঙিন করে দেখতে শেখে। আর সেই দেখার মধ্য দিয়েই শুরু হয় সুস্থতার পথচলা।

ছবি: দিতি রায় ও হাল ফ্যাশন

প্রকাশ: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮: ১০
বিজ্ঞাপন