ধীর গতির এই হাঁটাই এখন বিশ্বের নতুন ফিটনেস ট্রেন্ড, ওজন কমার সঙ্গে মিলবে মানসিক প্রশান্তিও
শেয়ার করুন
ফলো করুন

ফিটনেসের সংজ্ঞা বদলে যাচ্ছে। একসময় সুস্থ থাকার মানে ছিল ঘণ্টার পর ঘণ্টা জিমে কাটানো, দ্রুত দৌড়ানো কিংবা কঠিন শরীরচর্চা। এখন মানুষ এমন একটি ব্যায়াম খুঁজছেন, যা শরীরের পাশাপাশি মনকেও সুস্থ রাখে। সেই কারণেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে ‘তাইচি ওয়াকিং’। ধীর, সচেতন এবং মনোযোগী হাঁটার এক বিশেষ কৌশল।

ভোরের নরম আলোয় পার্কের সবুজ পথে কয়েকজন মানুষ ধীরে ধীরে হাঁটছেন। বাইরে থেকে এটি সাধারণ হাঁটা মনে হলেও, প্রতিটি পদক্ষেপে রয়েছে নিয়ন্ত্রিত শ্বাস-প্রশ্বাস, শরীরের ভারসাম্য এবং গভীর মনোযোগ। এ কারণেই তাইচি ওয়াকিংকে অনেক বিশেষজ্ঞ ‘চলমান ধ্যান’ বলেও অভিহিত করেন।

কী এই তাইচি ওয়াকিং?

প্রায় ৭০০ বছর আগে চীনে প্রাচীন মার্শাল আর্ট ‘তাই চি চুয়ান’ থেকে এই অনুশীলনের জন্ম। এখানে গতি নয়, গুরুত্ব দেওয়া হয় নিয়ন্ত্রিত চলাফেরা এবং সচেতনতার ওপর।
সাধারণ হাঁটার মতো দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে প্রতিটি পদক্ষেপ খুব ধীরে নেওয়া হয়। শরীরের ওজন ধীরে ধীরে এক পা থেকে অন্য পায়ে স্থানান্তরিত হয়। একই সঙ্গে গভীর ও ছন্দময় শ্বাস-প্রশ্বাস মনকে বর্তমান মুহূর্তে স্থির রাখে।

কেন এত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে?

করোনা মহামারির পর মানুষ শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মানসিক সুস্থতার প্রতিও অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। দীর্ঘ সময় ডেস্কে বসে কাজ, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, উদ্বেগ এবং ঘুমের সমস্যার মতো বিষয়গুলো এখন অনেকের নিত্যসঙ্গী।
এই বাস্তবতায় তাইচি ওয়াকিং একটি সহজ, নিরাপদ এবং কম চাপের শরীরচর্চা হিসেবে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এটি এমন একটি অনুশীলন, যা শরীরকে সচল রাখার পাশাপাশি মনকেও শান্ত করতে সাহায্য করে।

বিজ্ঞাপন

ওজন কমাতে কতটা কার্যকর?

Viktoriya Koldysheva

তাইচি ওয়াকিং উচ্চমাত্রার কার্ডিও ব্যায়াম নয়। তাই এটি দৌড়ানো বা দ্রুত হাঁটার মতো একই পরিমাণ ক্যালোরি পোড়ায় না। তবে নিয়মিত অনুশীলন করলে এটি ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।

কারণ এই অনুশীলন–

* শরীরকে নিয়মিত সক্রিয় রাখে।

* পেশিগুলোকে সচল করে।

* দীর্ঘ সময় বসে থাকার অভ্যাস কমায়।

* মানসিক চাপ কমাতে সহায়তা করতে পারে।

* অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সুষম খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে নিয়মিত তাইচি ওয়াকিং করলে দীর্ঘমেয়াদে ওজন নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হতে পারে।

গবেষণা কী বলছে?

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত তাইচি অনুশীলন–

* শরীরের ভারসাম্য উন্নত করতে পারে।

* পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।

* হাঁটুর কার্যক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক।

* মানসিক চাপ কমাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।

* ঘুমের মান উন্নত করতে পারে।

* রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।

* শরীরের নমনীয়তা ও সহনশীলতা বাড়াতে সাহায্য করে।

বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য এটি সবচেয়ে নিরাপদ ব্যায়ামগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।

বিজ্ঞাপন

কীভাবে শুরু করবেন?

FaustFoto

তাইচি ওয়াকিংয়ের জন্য আলাদা কোনো যন্ত্রপাতির প্রয়োজন নেই।

শুরু করার সহজ উপায়–

* সোজা হয়ে দাঁড়ান।

* কাঁধ ও ঘাড় শিথিল রাখুন।

* ধীরে গভীর শ্বাস নিন।

* একটি পা খুব ধীরে সামনে বাড়ান।

* প্রথমে গোড়ালি মাটিতে স্পর্শ করান।

* ধীরে পুরো পায়ের ওপর ভর দিন।

* শরীরের ওজন সামনের পায়ে স্থানান্তর করুন।

* একইভাবে অন্য পা সামনে আনুন।

* প্রতিটি পদক্ষেপের সময় শ্বাস-প্রশ্বাস ও ভারসাম্যে মনোযোগ দিন।
প্রথমে ১০ মিনিট অনুশীলন করুন। পরে ধীরে ধীরে সময় বাড়িয়ে ২০ থেকে ৩০ মিনিটে নিতে পারেন।

কেন এই হাঁটা আলাদা?

ভারসাম্য বাড়ায়

বয়স বাড়ার সঙ্গে শরীরের ভারসাম্য কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাইচি ওয়াকিং পায়ের ছোট ছোট পেশিকে সক্রিয় করে ভারসাম্য উন্নত করতে সাহায্য করে।

জয়েন্টের ওপর চাপ কম

দৌড়ানো বা লাফানোর তুলনায় হাঁটু, কোমর ও গোড়ালির ওপর অনেক কম চাপ পড়ে। তাই যাদের জয়েন্টে অস্বস্তি রয়েছে, তাদের জন্য এটি উপকারী হতে পারে।

মনকে শান্ত রাখে

ধীর গতি, গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস এবং সচেতন হাঁটা স্নায়ুতন্ত্রকে শিথিল রাখতে সাহায্য করতে পারে। ফলে উদ্বেগ ও মানসিক চাপ কমানোর ক্ষেত্রেও এটি সহায়ক।

শরীরের ভঙ্গি ঠিক রাখে

দীর্ঘ সময় কম্পিউটারের সামনে বসে থাকার কারণে অনেকের শরীর ঝুঁকে যায়। তাইচি ওয়াকিং সোজা হয়ে দাঁড়ানো এবং কোর পেশিকে সক্রিয় রাখার অভ্যাস গড়ে তোলে।

নমনীয়তা বাড়ায়

ধীরে ধীরে পুরো শরীর নড়াচড়া করার ফলে সন্ধি ও পেশির নমনীয়তা বাড়তে পারে।
রক্ত সঞ্চালন উন্নত করতে পারে

এই মৃদু শরীরচর্চা হৃদ্যন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়েই শরীরজুড়ে রক্তপ্রবাহ বাড়াতে সহায়তা করতে পারে।

কারা করতে পারেন?

এই অনুশীলন বিশেষভাবে উপযোগী–

* যারা প্রথমবার ব্যায়াম শুরু করছেন।

* ৫০ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তিরা।

* দীর্ঘ সময় ডেস্কে বসে কাজ করেন।

* মানসিক চাপ কমাতে চান।

* হাঁটুতে হালকা অস্বস্তি রয়েছে।

* অসুস্থতার পর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরছেন (চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী)।

কখন করবেন?

ভোরের নির্মল পরিবেশ কিংবা বিকেলের নরম আলো, দুই সময়ই তাইচি ওয়াকিংয়ের জন্য আদর্শ। পার্ক, লেকের পাড়, বাগান কিংবা গাছপালায় ঘেরা খোলা জায়গায় এই অনুশীলন সবচেয়ে বেশি উপভোগ করা যায়।

কিছু সতর্কতা

FaustFoto

* শুরুতে খুব ধীরে অনুশীলন করুন।

* আরামদায়ক জুতা পরুন।

* মাথা ঘোরা বা তীব্র ব্যথা অনুভব করলে সঙ্গে সঙ্গে থেমে যান।

* ভারসাম্যের সমস্যা থাকলে দেয়াল বা রেলিংয়ের পাশে অনুশীলন করুন।

* হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, স্নায়বিক সমস্যা বা সাম্প্রতিক অস্ত্রোপচার থাকলে অবশ্যই

চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

আজকের দ্রুতগতির জীবনে আমরা প্রায়ই নিজের শরীর ও মনের সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে ফেলি। তাইচি ওয়াকিং সেই হারিয়ে যাওয়া সংযোগ ফিরিয়ে আনার একটি সহজ অথচ কার্যকর উপায় হতে পারে।

মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিটের এই ধীরগতির হাঁটায় হয়তো খুব বেশি ক্যালোরি পোড়াবে না। কিন্তু যদি এটি আপনাকে প্রতিদিন একটু শান্ত থাকতে শেখায়, নিয়মিত শরীরচর্চার অভ্যাস গড়ে তোলে এবং নিজের প্রতি যত্নশীল হতে অনুপ্রাণিত করে, তাহলে সেটিই হতে পারে সুস্থ ও সুন্দর জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান পদক্ষেপ।

তথ্যসূত্র: হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল

ছবি: পেকজেলসডটকম

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬, ০১: ০০
বিজ্ঞাপন