
বাংলাদেশের প্রকৃতিতে গ্রীষ্মকাল মানেই তীব্র তাপপ্রবাহ। এই সময়টাকে আবার মধুঋতু বললেও ভুল বলা হবে না। কারণ, এই সময় এত ফল পাওয়া যায়, যেটা অন্য ঋতুতে বিরল। প্রকৃতির এই আচরণ আপনাকে তথ্য ও সতর্কতা—উভয়ই দিয়ে থাকে। এই আবহাওয়ার এমন আচরণ কৃষিভিত্তিক মাটির জন্য প্রয়োজন; কারণ, গ্রীষ্ম শেষেই তো বর্ষা। মাটি রোদে ফেটে যাবে, সেই ফাটা মাটিতে আবার পানি দিয়ে পূর্ণ হয়ে নতুন জীবন তৈরি করবে। এটাই প্রকৃতির ধরন। তেমনি গরম, রোদ মানুষের শরীরে জমে থাকা পানি কমিয়ে দেবে, ফল খেয়ে তা পূরণ করবেন।

এই গরম ফলের সমারোহে তালের শাঁস একটি বিশেষ ফল, যা আপনার শরীরে মিনারেলের ঘাটতি পূরণে সহায়ক, সেই সঙ্গে শরীর ঠান্ডা রাখার জন্য দুর্দান্ত। এর ইংরেজি নাম আইস অ্যাপল। নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে প্রাকৃতিক কুল্যান্ট হিসেবে এর ভূমিকার কথা। এদিকে দেখতেও অনেকটা বরফেরই মতো এই মনপ্রাণ ও পেট ঠান্ডা করা ফলটি। আইস অ্যাপল বা তালের শাঁস খাওয়ার অনেক উপকারিতা রয়েছে। এটি বাংলাদেশ ও ভারতের গ্রীষ্মকালীন জনপ্রিয় ফল, যা Borassus flabellifer গাছের কচি বীজের জেলি-জাতীয় অংশ।

এর পুষ্টিগুণ (প্রতি ১০০ গ্রাম আনুমানিক)
• পানি: ৮৭%+ (খুব হাইড্রেটিং)।
• ক্যালরি: খুব কম (~৪০-৮৭ kcal)।
• কার্বোহাইড্রেট: প্রাকৃতিক শর্করা।
• ফাইবার: ভালো পরিমাণে।
• ভিটামিন: এ, বি-কমপ্লেক্স (থায়ামিন, রিবোফ্লাভিন, নিয়াসিন), সি।
• খনিজ: ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, আয়রন, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, জিঙ্ক।
• অন্যান্য: অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট (ফ্ল্যাভোনয়েড, ফেনোলিক যৌগ)।
তালের শাঁস খেলে শরীরের উপকার তা জেনে খেলে আপনি ভাল থাকবেন; সেই সঙ্গে আপনার সন্তানদের খাওয়াতে উৎসাহবোধ করবেন। এবার জেনে নিই তালের শাঁসের উপকারিতা।
• শরীর ঠান্ডা ও হাইড্রেটেড রাখে: অধিক পরিমাণ পানি ও ইলেকট্রোলাইট (পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম) থাকার কারণে গরমে ডিহাইড্রেশন প্রতিরোধ করে। এটি প্রাকৃতিক কুল্যান্ট হিসেবে কাজ করে। খাওয়ার কিছু সময়ের মধ্যেই আপনি শরীরে আরাম পাবেন। মজার বিষয় হচ্ছে, এই আরামটা শুরু হবে পেট থেকে।
• হজমশক্তি উন্নত করে: তালের শাঁসে ডায়েটারি ফাইবার পর্যাপ্ত পরিমাণে আছে তাই এটা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে, অন্ত্র পরিষ্কার রাখে (পুরোনো বর্জ্য) বের করে দেবে এবং বদহজম-গ্যাস কমায়।
• রক্তশূন্যতা (অ্যানিমিয়া) দূর করতে সাহায্য করে: যাদের হিমোগ্লোবিন কম থাকে, শরীর দুর্বল লাগে আয়রনের ঘাটতিজনিত কারণে তালের শাঁস একটি বিশ্বস্ত বন্ধু, যা আয়রন ও ভিটামিন সি-এর সমন্বয়ে শরীরে আয়রন শোষণ বাড়ায়।
• হাড় ও দাঁত মজবুত করে: যাদের ক্যালসিয়াম ঘাটতিজনিত কারণ রয়েছে, তারা তালের শাঁস খান। নিয়মিত খান, এই মৌসুমে যত দিন পাওয়া যাতে তত দিন খান। পুরো বছর ভালো থাকবেন। কারণ, তালের শাঁসে থাকা ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস হাড়ের ঘনত্ব বাড়ায়, বিশেষ করে গর্ভবতী ও শিশুদের জন্য উপকারী।
• ইমিউনিটি বৃদ্ধি ও অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট প্রভাব: এতে থাকা ভিটামিন সি ও ফেনোলিক যৌগ ফ্রি র্যাডিক্যাল নিরপেক্ষ করে কোষের ক্ষতি কমায়, প্রদাহ কমায় এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায়।
• লিভারের স্বাস্থ্যের জন্য: ঐতিহ্যবাহী ব্যবহার ও কিছু গবেষণায় দেখা গেছে কচি শাঁস লিভার থেকে টক্সিন বের করতে সাহায্য করতে পারে। এবং লিভারের পিত্ত কমাতে সাহায্য করে, যা অন্য কোনো ফলের চেয়ে উত্তম।
• ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ: তালের শাঁস লো গ্লাইসেমিক ইনডেক্স থাকার কারণে প্রাকৃতিক শর্করার পরিমিত খেলে রক্তে শর্করা খুব বেশি বাড়ায় না। যার দরুন প্রতিদিন দুটি শাঁস খেতে পারেন সকালের নাশতায়।
• ত্বকের জন্য: যাদের ত্বক নিয়ে অভিযোগ আছে তারা এই মৌসুমে তালের শাঁস খান নিয়মিত খান, এতে ভিটামিনি এ ও সি ত্বক উজ্জ্বল করতে ও গ্রীষ্মের প্রিকলি হিট কমাতে সাহায্য করে।
অতিরিক্ত খেলে ডায়রিয়া হতে পারে (বিশেষ করে খুব ঠান্ডা অবস্থায়)। পরিমিত (দিনে ৪-৫টা) খাওয়া ভালো। অ্যালার্জি থাকলে সতর্ক থাকুন।
তালগাছকে ‘দরিদ্রের অ্যান্টিডোট’ বলা হয় কারণ এর প্রায় সব অংশ (ফল, শাঁস, রস, পাতা, কাণ্ড) মানুষের কাজে লাগে। সিজনাল ট্রিট হিসেবে গ্রীষ্মে প্রাকৃতিক ঠান্ডা পানীয় হিসেবে শাঁস খাওয়া বাঙালি সংস্কৃতির অংশ। তাই তালের শাঁস গ্রীষ্মের একটি সুস্বাদু ও পুষ্টিকর উপহার। সিজনে নিয়মিত খান, পরিমিত খান, তালের শাঁসের উপকারিতা উপভোগ করুন। স্বাস্থ্য ভালো থাকবে!
লেখক: খাদ্য ও পথ্য বিশেষজ্ঞ প্রধান নির্বাহী, প্রাকৃতিক নিরাময় কেন্দ্র
ছবি: পেকজেলসডটকম