
বিগত এক দশকে নারীদের যে স্বাস্থ্য সমস্যা সবচেয়ে বেশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্বাস্থ্যবিষয়ক আলোচনা ও চিকিৎসা গবেষণায় উঠে এসেছে, তার নাম “পিসিওএস”। অনিয়মিত মাসিক, ওজন বেড়ে যাওয়া, ব্রণ, হরমোনের সমস্যা কিংবা বন্ধ্যাত্ব এসবের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই রোগ সম্পর্কে সচেতনতা যেমন বেড়েছে, তেমনি বদলেছে এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও।

আর সেই কারণেই সাম্প্রতিক সময়ে “পিসিওএস” নামটি বদলে নতুন নাম দেওয়া হয়েছে “পিএমওএস” বা “পলিএন্ডোক্রাইন মেটাবলিক ওভারিয়ান সিনড্রোম”। এই পরিবর্তনটি এসেছে অস্ট্রেলিয়ার মনাশ সেন্টার ফর হেলথ রিসার্চ অ্যান্ড ইমপ্লিমেন্টেশনের অধ্যাপক হেলেনা টিডের নেতৃত্বে ১৪ বছর ধরে চলা বৈশ্বিক ঐকমত্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। তিনি ও তাঁর রিসার্চ টিমের সাড়া জাগানো এই নিবন্ধ পলিএন্ডোক্রাইন মেটাবলিক ওভেরিয়ান সিনড্রোম, দ্য নিউ নেম ফর পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম: আ মাল্টিস্টেপ গ্লোবাল কনসেনসাস প্রসেস ১২ মে প্রকাশিত হয়েছে ল্যানসেট জার্নালে। আর এই আর্টিকেলটি বদলে দিয়েছে আমাদের দেশের বহু নারীর এই দুঃস্বপ্নের নাম ও কনসেপ্ট। বাংলাদেশের ৮ থেকে ১৩ শতাংশ প্রজননক্ষম নারী পিসিওএস বা নতুন সংজ্ঞা অনুযায়ী পিএমওএস-এ ভোগেন বলে জানা যায়। সে হিসাবে প্রায় প্রতি ১০ জনে একজন নারী এই স্বাস্থ্য সমস্যায় কষ্ট পান আমাদের দেশে। এছাড়াও বলা হচ্ছে, ৭০ শতাংশ নারীর এ রোগ নির্ণয়ই হয় না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু নাম পরিবর্তন নয়, বরং নারীদের স্বাস্থ্যকে নতুনভাবে বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বিশ্বজুড়ে ১৭০ মিলিয়নেরও বেশি নারী এই সমস্যায় আক্রান্ত। এতদিন “পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম” নামটি শুনলে মনে হতো এটি শুধুই ওভারির একটি সমস্যা, বিশেষ করে সিস্ট হওয়া সংক্রান্ত। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, এই রোগের মূল সমস্যা আসলে আরও গভীরে অর্থাৎ পুরো শরীরের মেটাবলিক ও হরমোনাল সিস্টেমে।

কেন পুরনো নামটি আর যথাযথ ছিল না?
“পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম” নামটির সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা ছিল এর বিভ্রান্তিকর ধারণা। কারণ নাম শুনেই মনে হয় এই রোগ মানেই ওভারিতে সিস্ট থাকা। কিন্তু বাস্তবে অনেক নারীর পিসিওএস থাকলেও ওভারিতে কোনো সিস্ট দেখা যায় না। আবার কারও ওভারিতে সিস্ট থাকলেও তাদের পিসিওএস থাকে না। এই অসামঞ্জস্যের কারণেই চিকিৎসক ও গবেষকরা মনে করছেন, রোগটির নাম রোগের প্রকৃত জটিলতা তুলে ধরতে পারছিল না। কারণ এটি শুধুই প্রজনন ব্যবস্থার সমস্যা নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ মেটাবলিক ও এন্ডোক্রাইন ডিসঅর্ডার।
আসলে শরীরে কী ঘটে?
পিএমওএস-এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে শরীরের নানা জটিল পরিবর্তন। যেমন—
ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স
হরমোনের ভারসাম্যহীনতা
ওজন বৃদ্ধি ও পেটের মেদ
দীর্ঘমেয়াদি ইনফ্ল্যামেশন
অনিয়মিত মাসিক

ব্রণ ও অতিরিক্ত ফেসিয়াল হেয়ার
ক্লান্তি ও ঘুমের সমস্যা
উদ্বেগ, মুড সুইং ও ডিপ্রেশন
বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীর যখন ইনসুলিন ঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে না, তখন রক্তে চিনির ভারসাম্য নষ্ট হয়। এর প্রভাব পড়ে হরমোন, ওজন, ত্বক, এমনকি মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও। অনেকেই মনে করেন অনিয়মিত মাসিকই পিসিওএস-এর প্রধান লক্ষণ। কিন্তু বাস্তবে এই সমস্যার প্রভাব আরও অনেক গভীর। পেটের মেদ শুধু বাহ্যিক নয়, শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলোর চারপাশেও চর্বি জমতে শুরু করে, যা লিভার, প্যানক্রিয়াস এবং হরমোন সিস্টেমের স্বাভাবিক কার্যকারিতা ব্যাহত করে।

আধুনিক জীবনযাপন কীভাবে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান জীবনযাপন পিএমওএস বৃদ্ধির অন্যতম বড় কারণ।
যেসব অভ্যাস ঝুঁকি বাড়াচ্ছে:
দীর্ঘ সময় বসে থাকা
নিয়মিত ব্যায়ামের অভাব
পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া
অতিরিক্ত প্রসেসড ও জাঙ্ক ফুড খাওয়া
মানসিক চাপ
অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম
ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি
ঘুম কম হলে শরীরে কর্টিসল ও ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের পরিবর্তন ঘটে। ফলে মিষ্টি ও জাঙ্ক ফুডের প্রতি আকর্ষণ বাড়ে, যা আবার ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সকে আরও খারাপ করে তোলে। মনে রাখতে হবে শুধু ওজনের সমস্যা নয়। অনেকেই পিএমওএসকে শুধুমাত্র ওজন বাড়ার সমস্যা হিসেবে দেখেন। কিন্তু এটি প্রভাব ফেলতে পারে বিভিন্নভাবে। যেমন:
মস্তিষ্কের কার্যকারিতায়
ত্বকে
লিভারে
হৃদযন্ত্রে
প্রজনন স্বাস্থ্যে
মানসিক স্বাস্থ্যে
দীর্ঘদিন অবহেলা করলে ভবিষ্যতে টাইপ-২ ডায়াবেটিস, ফ্যাটি লিভার, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব?
চিকিৎসকদের মতে, শুধু ওষুধ দিয়ে পিএমওএস পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। জীবনযাত্রার পরিবর্তনই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
যা করতে হবে:
১. নিয়মিত শরীরচর্চা
প্রতিদিন অন্তত ৩০–৪৫ মিনিট হাঁটা বা ব্যায়াম ইনসুলিন সেনসিটিভিটি বাড়াতে সাহায্য করে।
২. সুষম খাদ্যাভ্যাস
প্রসেসড ফুড কমিয়ে প্রোটিন, সবজি, ফল, ফাইবার ও স্বাস্থ্যকর ফ্যাট বাড়াতে হবে।
৩. পর্যাপ্ত ঘুম
প্রতিদিন ৭–৮ ঘণ্টা ঘুম হরমোনের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ।
৪. মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ
মেডিটেশন, যোগব্যায়াম বা নিজের পছন্দের কাজ স্ট্রেস কমাতে সাহায্য করে।
৫. নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা
রক্তে সুগার, হরমোন ও ভিটামিন ডি পরীক্ষা করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

সচেতনতাই সবচেয়ে বড় শক্তি
পিএমওএস কোনো “সাধারণ মেয়েলি সমস্যা” নয়। এটি পুরো শরীরের মেটাবলিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে। তাই শরীরের পরিবর্তনকে অবহেলা না করে শুরু থেকেই সচেতন হওয়া জরুরি। কারণ স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম, ভালো ঘুম এবং মানসিক সুস্থতাই হতে পারে এই সমস্যার সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ। মনে রাখবেন, সচেতনতাই সবচেয়ে বড় শক্তি।
তথ্য: ল্যানসেট, হেলথলাইন প্রথম আলো
ছবি: ইন্সটাগ্রাম