আপনি কি ৯০ মিনিট একদম কিছু না করে থাকতে পারবেন?
শেয়ার করুন
ফলো করুন

নীরব, স্থির বা শান্ত থাকা মানেই অলসতা নয়। ‘স্পেস-আউট’ প্রতিযোগিতা বলছে এটি মস্তিষ্ককে পুনরুজ্জীবিত করার একটি শক্তিশালী উপায়। দক্ষিণ কোরিয়ার স্পেস-আউট প্রতিযোগিতা দেখিয়েছে, শান্ত থাকা সৃজনশীলতা ও মানসিক স্থিরতা বাড়ায়। বায়ং-জিন পার্কের অভিজ্ঞতা বলছে, নিয়মিত মানসিক বিশ্রাম আমাদের মনকে অপরিমেয়ভাবে সতেজ করে।

আমরা অভ্যাসের দাস। স্ক্রিনে চোখ, নোটিফিকেশনের শব্দ, দৌড়ে চলা সময়সূচি। সবমিলিয়ে “কিছু না করা” বিষয়টি যেন ভুলে গেছি। অথচ বিজ্ঞান বলছে, একেবারে চুপচাপ বসে থাকা—মস্তিষ্কের জন্য এক গভীর বিশ্রাম। আর এই নীরবতার শক্তিকেই দক্ষিণ কোরিয়া পরিণত করেছে এক অভিনব প্রতিযোগিতায়। এই প্রতিযোগিতায় ৯০ মিনিট শুধু বসে থাকতে হয়। কোনো কথা নয়, ফোন নয়, ঘুম নয় শুধু নীরব থাকা।

নীরবতার আড়ালে লুকানো শক্তি

গবেষকেরা বলেন, এমন সময়ে মস্তিষ্কের “ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্ক” সক্রিয় হয়। যা সৃজনশীলতা, আত্ম-চিন্তা, আবেগের ভারসাম্য আর সমস্যা সমাধানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা যখন কিছু করছি না, তখনই মস্তিষ্ক অনেক গভীরভাবে কাজ করে। চিন্তা গুছিয়ে নেয়, অনিশ্চয়তা কমায়, নিজের সঙ্গে কথা বলতে শেখায়।

বায়ং-জিন পার্ক, যিনি কিছু না করে চ্যাম্পিয়ন হলেন

সিউলের ৩৬ বছর বয়সী উদ্যোক্তা ও ইন্ডি-পাংক সংগীতশিল্পী বায়ং-জিন পার্ক এবারের স্পেস-আউট প্রতিযোগিতায় ১০০ জনকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। ভাইরাল হওয়া উদ্দেশ্যে নয়, বরং নিজের সঙ্গে কিছু সময় কাটানো।

সম্পূর্ণ ৯০ মিনিট শান্ত থেকে, ধীরে ধীরে শ্বাস নিয়ে, একটি বিন্দুর দিকে তাকিয়ে তিনি নিজের মনকে স্থির করেছেন। পার্ক বলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজের শরীর পর্যন্ত ভুলে গিয়েছিলেন; মনে হয়েছিল সব শব্দ যেন দূরে হারিয়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন

যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল এক শিল্প-প্রকল্প হিসেবে

২০১৪ সালে ভিজ্যুয়াল আর্টিস্ট উপসিয়াং প্রথম এই প্রতিযোগিতাটি চালু করেন, আধুনিক জীবনের ব্যস্ততার বিরুদ্ধে এক ধরনের নীরব প্রতিবাদ হিসেবে।
আজ এটি সিউলের হান নদীর পাশে এক সাংস্কৃতিক ইভেন্টে পরিণত হয়েছে। শান্ত থাকা, পারফরম্যান্স আর্ট ও মানব-মানসের গভীর অনুসন্ধানের সমন্বয়।
অংশগ্রহণকারীদের হার্ট রেট মনিটর করা হয়, আর বিজয়ী নির্ধারিত হয় বায়োমেট্রিক শান্তি ও দর্শকদের ভোট মিলিয়ে।

আমরা কেন কিছু না করতে এত অসুবিধা বোধ করি?

অদ্ভুত হলেও সত্য, ২০১৪ সালের এক গবেষণা বলছে, অনেকে ১৫ মিনিট একা নিজের চিন্তার সঙ্গে থাকতে রাজি নন; বরং তার চেয়ে হালকা বৈদ্যুতিক শক নিতে প্রস্তুত। এর কারণ হিসেবে বলা হয়,

- স্মার্টফোনে আসক্তি

- অতিরিক্ত ব্যস্ততা

- প্রতিযোগিতামূলক সমাজ

- অলসতাকে ভয়

- নীরবতার সঙ্গে পরিচয় না থাকা

পার্ক বলছেন, আজকাল মেট্রোতে তাকালেই দেখা যায়, প্রায় সবাই স্ক্রিনে ডুবে। কেউই নিজের চিন্তার সঙ্গে কয়েক মুহূর্ত কাটাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না।

পার্কের কৌশল: নীরবতার সহজ অভ্যাস

- পেট দিয়ে ধীরে শ্বাস
- একটি স্থির বিন্দুর দিকে মনোযোগ
- অপ্রয়োজনীয় চিন্তাগুলোকে আসতে-যেতে দেওয়া
- প্রতিযোগিতার মাঝেও নিজের শরীর ও মনকে শান্ত রাখা
পার্ক বলেন, স্পেস আউট সব সমস্যা মেটায় না, তবে মনকে অসাধারণভাবে পরিষ্কার করে। ভারী চিন্তা হালকা হয়ে যায়, চাপ কমে, নিজের মধ্যে জায়গা তৈরি হয়।

আজকের জীবনে স্পেস আউট কেন জরুরি

পার্কের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে—
- সৃষ্টিশীলতা বাড়ে
- মনোযোগ উন্নত হয়
- উদ্বেগ কমে
- আবেগ স্থির হয়
- সমস্যার সমাধান সহজ হয়

তিনি এখন প্রতি সপ্তাহে পরিবারের সঙ্গে ছোট ধ্যান বা স্পেস আউট সেশন করার পরিকল্পনা করছেন।

আপনি কি পারবেন?

নতুন কিছু চেষ্টা করতে চাইলে—

প্রতিদিন ৫-১০ মিনিট বসে থাকুন।

ফোন দূরে রাখুন।

শ্বাসে মন দিন।

চিন্তাগুলোকে জোর করে আটকাবেন না, তাদের প্রবাহিত হতে দিন।

দেখবেন, ধীরে ধীরে মন পরিষ্কার হচ্ছে, ক্লান্তি কমছে, আপনি নিজেকে নতুনভাবে অনুভব করছেন।

তবে মনে রাখতে হবে-

কিছু না করা মানে সময় নষ্ট নয়।

এটি নিজেকে ফের খুঁজে পাওয়া।

নীরবতার এই ছোট মুহূর্তগুলোই আমাদের জীবনের দ্রুত গতিকে ভারসাম্য দেয়।

ছবি: এআই ও দা সিওল টাইমস

বিজ্ঞাপন
প্রকাশ: ২৫ নভেম্বর ২০২৫, ০১: ০০
বিজ্ঞাপন