
ইদানীং নানা মিডিয়ায় শুনতে পাওয়া যায় যে রোজা রাখা আর অটোফ্যাজি করা একই বিষয়। এ নিয়ে নানা তত্ত্ব সামনে এনে বয়ান দেওয়া হচ্ছে। কেউ কেউ অটোফ্যাজি করার জন্য রোজা রাখতে পরামর্শ দিচ্ছেন। অথচ ইসলামের রোজা (বিশেষ করে রমজানের সিয়াম) এবং অটোফ্যাজি এক জিনিস নয়। দুটি ভিন্ন ধারণা; কিন্তু রমজানের রোজা রাখার ফলে শরীরে অটোফ্যাজি প্রক্রিয়া সক্রিয় হয়, বাড়ে বা উপকারীভাবে প্রভাবিত হয়— এটা সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত; তবু এটা অটোফ্যাজি নয়। আর রোজা শুধুই ধর্মীয় বিষয়, যার সঙ্গে কোনো শর্ত জড়িত নয়। ফলে রোজা কোনোভাবেই অটোফ্যাজি নয়। কেন এ দুটি বিষয় এক নয়, এক না হলে কী ক্ষতি বা লাভ—এ নিয়ে চরম বিতর্ক আছে। সহজভাবে বিষয়টি বুঝতে হলে জেনে নিই দুটি আলাদা বিষয় কেন?
• অটোফ্যাজি গ্রিক শব্দ: ‘auto’ অর্থ নিজে, ‘phagy’ অর্থ খাওয়া; অর্থাৎ ‘নিজেকে খাওয়া’ বা ‘সেলফ-ইটিং’।
• এটা শরীরের কোষের একটা প্রাকৃতিক ক্লিনিং/রিসাইক্লিং প্রক্রিয়া।
• কোষের ভেতরে ক্ষতিগ্রস্ত প্রোটিন, অপ্রয়োজনীয় অর্গানল (যেমন মাইটোকন্ড্রিয়া), ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার অংশ ইত্যাদি অটোফ্যাগোসোম নামক থলিতে ভরে লাইসোজোমে পাঠানো হয়, সেখানে ভেঙে ফেলা হয়, উপাদানগুলো রিসাইকেল করে নতুন শক্তি থেকে প্রোটিন তৈরি করা হয়।
• এটা শরীরের ‘অভ্যন্তরীণ ঘর পরিষ্কার’–এর মতো কোষকে সুস্থ, তরুণ ও কার্যকর রাখে।
• জাপানি বিজ্ঞানী ইয়োশিনোরি ওহসুমি ২০১৬ সালে এর মেকানিজম আবিষ্কার করে নোবেল প্রাইজ পান।
তিনি রমজানের রোজা নিয়ে কোনো গবেষণা করেননি, তাঁকে রোজা নিয়ে গবেষণা করেছেন বলে যে কথাগুলো বলা হয়, তা নিছক ভুল প্রচারণা।
• রমজানে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত (দেশভেদে সাধারণত ১২–১৮ ঘণ্টা) খাবার, পানি, যৌনতা, মিথ্যা, পরচর্চা ইত্যাদি থেকে বিরত থাকা।
• মূল উদ্দেশ্য: তাকওয়া (আল্লাহভীতি) বাড়ানো, আত্মশুদ্ধি, সহানুভূতি, ধৈর্য, আধ্যাত্মিক উন্নতি।
• এটা শুধু শারীরিক উপবাস নয়, এটা পূর্ণাঙ্গ ইবাদত।
কোরআনে এ নিয়ে যে আদেশ–উপদেশ দেওয়া হয়েছে, তা মূলত আত্মশুদ্ধির সঙ্গে আধ্যাত্মিক উন্নতির একটি বড় বিষয়। এখানে দৈহিক বিষয়টা বাড়তি পাওনা।
রোজা কীভাবে অটোফ্যাজিকে প্রভাবিত করে
রমজানের রোজা একধরনের দিন-রাতের ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং (dawn-to-dusk intermittent fasting)। গবেষণায় দেখা গেছে:
• সাধারণত ১২–১৬ ঘণ্টা না খেয়ে থাকলে শরীর গ্লুকোজ ও গ্লাইকোজেন শেষ করে ফ্যাট বার্ন শুরু করে অটোফ্যাজি সক্রিয় হয়।
• রমজানে দৈনিক ১৪–১৮ ঘণ্টা উপবাসে অটোফ্যাজি বাড়ে।
সাম্প্রতিক গবেষণা (২০২৩–২০২৫):
• ওভারওয়েট/অবসেস লোকদের মধ্যে ৪ সপ্তাহ রমজান ফাস্টিং ও অটোফ্যাজি জিনের (LC3B, LAMP2, ATG5, ATG4D, Beclin-1) এক্সপ্রেশন বেড়েছে (Clin Nutr ESPEN, ২০২৫)।
• সুস্থ মানুষের মধ্যে ৩০ দিনের রোজায় অটোফ্যাজির পথ সক্রিয় হয়ে এনার্জি ও মেটাবলাইটের ঘাটতি পূরণ করে, প্রদাহ কমায় (Mol Biol Res Commun, ২০২৫)।
• ইনফ্লেমেশন মার্কার (TNF-, IL-6) কমে, অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি (IL-10) বাড়ে।
• গাট মাইক্রোবায়োটা (যেমন Ruminococcaceae, Lactobacillus) পরিবর্তন হয় অটোফ্যাজি ও মেটাবলিজম ভালো হয়।
• ইঁদুরের মডেলে রমজান-স্টাইল ফাস্টিং লংজাভিটি (দীর্ঘায়ু) বায়োমার্কার ভালো হয়, mTOR কমে, AMPK বাড়ে (Scientific Reports, ২০২৪)।

• রোজা একটি সম্পূর্ণ ইবাদত, যার সঙ্গে ধর্মের বিষয় জড়িত, এতে বিশ্বাস ও নির্দিষ্ট কিছু বিধান আছে, যা পূরণ করতে হবে।
• আর অটোফ্যাজি হলো শারীরিক উপকার (ওজন কমা, প্রদাহ কমা, ইনসুলিন সেন্সিটিভিটি বাড়া, গাট হেলথ ভালো হওয়া ইত্যাদি)।
• রমজানের রোজা শুধু ‘ডায়েট’ বা ‘হেলথ হ্যাক’ নয়, এটা আল্লাহর নির্দেশিত একটা পূর্ণাঙ্গ জীবনধারা, যার মধ্যে বিজ্ঞানও অনেক উপকার দেখছে।
• অটোফ্যাজি করতে চাইলে এরও নির্দিষ্ট নিয়ম আছে, বিশেষ করে কোনো কিছু না খাওয়া হলেও কিছু তরল ও পানীয় পান করতে হয়। অটোফ্যাজিতে ডিহাইড্রেশন হওয়া যাবে না।
যার কারণে রোজা রাখায় আমাদের অটোফ্যাজি কাজ করলেও রোজা অটোফ্যাজি নয়। তাই বিষয়টি মানুষ যাতে ভুল না বোঝে, সেটা খেয়াল রাখতে হবে।
লেখক: খাদ্যপথ্য বিশেষজ্ঞ, প্রধান নির্বাহী, প্রাকৃতিক নিরাময় কেন্দ্র
ছবি: পেকজেলসডটকম