লিম্ফ্যাটিক ওয়াকিং কি সত্যিই শরীরের ‘টক্সিন’ বের করে?
শেয়ার করুন
ফলো করুন

কোথাও বলা হচ্ছে এগুলো শরীরের ফোলা ভাব কমাতে পারে, কোথাও দাবি করা হচ্ছে শরীর থেকে ‘টক্সিন’ বের করে দিতে পারে, আবার কোথাও বলা হচ্ছে লিম্ফের প্রবাহ বাড়িয়ে শরীরকে আরও সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। এসব দাবির মধ্যে কোনটির পেছনে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে, আর কোনটি মূলত ওয়েলনেস ট্রেন্ড? আগে জানা দরকার, লিম্ফ্যাটিক সিস্টেম আসলে কীভাবে কাজ করে।

শরীরের ভেতরের অদৃশ্য পরিবহনব্যবস্থা

লিম্ফ্যাটিক সিস্টেম হলো শরীরের একটি জটিল নেটওয়ার্ক, যার মধ্যে রয়েছে লিম্ফ্যাটিক নালি, লিম্ফ নোড এবং বিভিন্ন লিম্ফ্যাটিক অঙ্গ। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো টিস্যুর মধ্যে জমে থাকা অতিরিক্ত তরল সংগ্রহ করে তা আবার রক্তসঞ্চালনের সঙ্গে যুক্ত করা। একই সঙ্গে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সঙ্গেও এই সিস্টেমের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে।

রক্তনালির মতো লিম্ফ্যাটিক সিস্টেমও সারা শরীরে বিস্তৃত। শরীরের বিভিন্ন টিস্যুতে রক্ত থেকে তরল বের হওয়ার পর তার একটি অংশ আবার রক্তপ্রবাহে ফিরে যায়। অতিরিক্ত তরলের একটি অংশ লিম্ফ্যাটিক নালির মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। সেই লিম্ফ তরল লিম্ফ নোডের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় সেখানে থাকা রোগ প্রতিরোধকারী কোষ জীবাণু ও অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদান শনাক্ত করতে সাহায্য করে। পরে লিম্ফ তরল আবার রক্তসঞ্চালনের সঙ্গে যুক্ত হয়। অর্থাৎ লিম্ফ্যাটিক সিস্টেম শুধু শরীরের তরল ভারসাম্য রক্ষায় নয়, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রমেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

লিম্ফের নিজস্ব কোনো হৃদ্যন্ত্র নেই

লিম্ফ্যাটিক সিস্টেম নিয়ে মানুষের আগ্রহের একটি কারণ এখানেই। রক্তকে সারা শরীরে সঞ্চালিত করার জন্য আমাদের হৃদ্যন্ত্র রয়েছে। কিন্তু লিম্ফ তরলকে সারা শরীরে ঘোরানোর জন্য এমন কোনো কেন্দ্রীয় পাম্প নেই।

লিম্ফের চলাচলে পেশির সংকোচন, শরীরের নড়াচড়া এবং শ্বাস-প্রশ্বাসসহ বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া ভূমিকা রাখে। ফলে আমরা যখন হাঁটি, শরীর নড়াচড়া করি কিংবা পেশি ব্যবহার করি, তখন সেই নড়াচড়াও লিম্ফের স্বাভাবিক প্রবাহে ভূমিকা রাখতে পারে।

এই জায়গা থেকেই ‘লিম্ফ্যাটিক ওয়াকিং’ ধারণাটির সঙ্গে সাধারণ হাঁটার একটি সম্পর্ক তৈরি হয়। নিয়মিত হাঁটা শরীরকে সক্রিয় রাখে এবং পেশির নড়াচড়া লিম্ফের প্রবাহে সহায়তা করতে পারে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে একটি বিশেষ ধরনের হাঁটার কৌশল সাধারণ হাঁটার চেয়ে অনেক বেশি ‘টক্সিন’ বের করে দেবে।

বিজ্ঞাপন

তাহলে শরীরের ‘টক্সিন’ কি লিম্ফের মাধ্যমে বের হয়?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ডিটক্স’ শব্দটির ব্যবহার এত বেশি যে শরীরের স্বাভাবিক বর্জ্য অপসারণ ব্যবস্থার সঙ্গে ওয়েলনেস ট্রেন্ডের পার্থক্যটি অনেক সময় চোখ এড়িয়ে যায়।

লিম্ফ্যাটিক সিস্টেম শরীরের অতিরিক্ত তরল পরিবহন এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু লিম্ফ্যাটিক ড্রেনেজ করলে শরীরের সব ধরনের ‘টক্সিন’ বের হয়ে যায়, এমন বিস্তৃত দাবির পক্ষে শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

শরীরের বিপাকজাত বর্জ্য ও বিভিন্ন পদার্থ অপসারণে কিডনি, লিভার, ফুসফুস এবং অন্ত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই কোনো নির্দিষ্ট হাঁটা, ম্যাসাজ কিংবা যন্ত্রকে শরীরের সামগ্রিক ‘ডিটক্স’ প্রক্রিয়ার বিশেষ মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরা বৈজ্ঞানিক তথ্যকে অতিরঞ্জিত করতে পারে।

লিম্ফ্যাটিক ড্রেনেজের চিকিৎসাগত ব্যবহার আছে

লিম্ফ্যাটিক ড্রেনেজ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওয়েলনেস ট্রেন্ড নয়, নির্দিষ্ট কিছু শারীরিক সমস্যার চিকিৎসাতেও এর ব্যবহার রয়েছে।

বিশেষ করে লিম্ফেডিমার ক্ষেত্রে ম্যানুয়াল লিম্ফ্যাটিক ড্রেনেজ চিকিৎসা ব্যবস্থার অংশ হতে পারে। লিম্ফেডিমায় শরীরের কোনো অংশে লিম্ফ তরল জমে গিয়ে দীর্ঘস্থায়ী ফোলা তৈরি হয়। ক্যানসার বা ক্যানসারের চিকিৎসার সময় লিম্ফ নোড কিংবা লিম্ফ্যাটিক নালি ক্ষতিগ্রস্ত হলে এ ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

এ ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত থেরাপিস্টের মাধ্যমে ম্যানুয়াল লিম্ফ্যাটিক ড্রেনেজের পাশাপাশি কমপ্রেশন, ব্যায়াম এবং ত্বকের যত্ন মিলিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

অর্থাৎ নির্দিষ্ট রোগের ক্ষেত্রে লিম্ফ্যাটিক ড্রেনেজের চিকিৎসাগত ভূমিকা রয়েছে। একজন সুস্থ মানুষের শরীর থেকে ‘টক্সিন বের করার’ জন্য এটিকে ব্যবহার করার দাবি আলাদা বিষয় এবং সেই দাবির পক্ষে একই মাত্রার প্রমাণ নেই।

কমপ্রেশন বুট কতটা কার্যকর?

জিম, স্পোর্টস রিকভারি সেন্টার এবং ওয়েলনেস ক্লিনিকে এখন কমপ্রেশন বুট বেশ পরিচিত একটি উপকরণ। একই সঙ্গে কমপ্রেশন সকসও ব্যবহার করছেন অনেকে। এসব উপকরণ শরীরের নির্দিষ্ট অংশে পর্যায়ক্রমে চাপ প্রয়োগ করে।

লিম্ফেডিমার চিকিৎসায় ইন্টারমিটেন্ট নিউম্যাটিক কমপ্রেশন কিছু ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। ২০২৬ সালের একটি সাম্প্রতিক পদ্ধতিগত পর্যালোচনায় নিচের অঙ্গের লিম্ফেডিমায় এ ধরনের কমপ্রেশনের ব্যবহারে ফোলা এবং অঙ্গের আয়তন কমার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে গবেষণাগুলোর মধ্যে পার্থক্য এবং কিছু পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতাও ছিল।

অন্যদিকে, ব্যায়ামের পর একজন সুস্থ মানুষের শরীরকে দ্রুত ‘রিকভার’ করানো কিংবা লিম্ফ্যাটিক ‘ডিটক্স’ করার জন্য কমপ্রেশন বুট কতটা কার্যকর, সে বিষয়ে প্রমাণ এখনও সীমিত। ২০২৫ সালের একটি পর্যালোচনায় ব্যায়ামের পর কমপ্রেশন বুট ব্যবহারের ছয়টি গবেষণা বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানে কোনো একটি পদ্ধতির স্পষ্ট শ্রেষ্ঠত্ব পাওয়া যায়নি এবং গবেষণার সংখ্যাও ছিল সীমিত।

বিজ্ঞাপন

ভাইব্রেশন প্লেট কি লিম্ফের প্রবাহ বাড়ায়?

ভাইব্রেশন প্লেট নিয়েও একই ধরনের আলোচনা রয়েছে। বলা হয়, শরীরের কম্পনের ফলে তরল নড়াচড়া করে এবং লিম্ফ্যাটিক প্রবাহ বাড়ে।

শরীরের নড়াচড়া ও পেশির সংকোচন যে লিম্ফের স্বাভাবিক চলাচলে ভূমিকা রাখে, সেটি প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু সেখান থেকে সরাসরি বলা যায় না যে ভাইব্রেশন প্লেট শরীরের ‘টক্সিন’ বের করে দেয় কিংবা সাধারণ মানুষের লিম্ফ্যাটিক স্বাস্থ্য উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করে।

কোনো যন্ত্র ব্যবহারের পর শরীর হালকা লাগা বা সাময়িক আরাম পাওয়া ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হতে পারে। কিন্তু সেটিকে চিকিৎসাগত কার্যকারিতার প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

সবচেয়ে সহজ উপায়, শরীরকে সচল রাখা

লিম্ফ্যাটিক সিস্টেম নিয়ে এত আলোচনা হলেও এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সবচেয়ে সহজ অভ্যাসটি আমাদের পরিচিত। সেটি হলো নিয়মিত নড়াচড়া করা। হাঁটা, সিঁড়ি ভাঙা, সাইক্লিং, সাঁতার কিংবা শক্তির ব্যায়ামের সময় পেশি বারবার সংকুচিত ও প্রসারিত হয়। এই পেশির নড়াচড়া লিম্ফের স্বাভাবিক প্রবাহে সহায়তা করতে পারে।

ক্যানসার-সম্পর্কিত লিম্ফেডিমার ক্ষেত্রেও ব্যায়াম চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার একটি অংশ হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, উপযুক্ত ব্যায়াম পেশিশক্তি বাড়ানো, ক্লান্তি ও ব্যথা কমানো এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে সহায়ক হতে পারে। তাই শুধু ‘লিম্ফ্যাটিক ডিটক্স’ করার জন্য নতুন কোনো রুটিন যোগ করার চেয়ে প্রতিদিন নিয়মিত হাঁটা, শরীরচর্চা করা এবং দীর্ঘ সময় এক জায়গায় বসে না থাকার অভ্যাস বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

শরীরে অস্বাভাবিক ফোলা হলে কী করবেন?

শরীরের কোনো অংশে দীর্ঘদিন ধরে ফোলা থাকলে সেটিকে শুধু ‘পানি জমেছে’ বা ‘লিম্ফ আটকে আছে’ বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। লিম্ফেডিমা ছাড়াও হৃদ্যন্ত্র, কিডনি, লিভার, শিরার সমস্যা, কিছু ওষুধ কিংবা অন্যান্য শারীরিক অবস্থার কারণেও শরীরে ফোলা দেখা দিতে পারে।

বিশেষ করে নতুন করে বা দ্রুত কোনো অঙ্গ ফুলে গেলে, সেই সঙ্গে ব্যথা, লালচে ভাব, ত্বকের পরিবর্তন কিংবা অন্য কোনো উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

ট্রেন্ডের আড়ালে শরীরের যে গল্প

লিম্ফ্যাটিক সিস্টেম আমাদের শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্বাভাবিক ব্যবস্থা। এটি টিস্যুর অতিরিক্ত তরল সামলাতে সাহায্য করে এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে।

লিম্ফ্যাটিক ওয়াকিংয়ের নামে নিয়মিত হাঁটা অবশ্যই ভালো অভ্যাস হতে পারে। কিন্তু হাঁটার উপকারকে একটি বিশেষ ‘ডিটক্স কৌশল’-এর ফল হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। একইভাবে কমপ্রেশন বুট কিংবা ম্যানুয়াল লিম্ফ্যাটিক ড্রেনেজ নির্দিষ্ট চিকিৎসাগত সমস্যায় উপকারী হতে পারে, কিন্তু সবার শরীরে একই ধরনের ফল দেবে এমন দাবি করার মতো প্রমাণ এখনও নেই।

শরীর সুস্থ রাখার জন্য শেষ পর্যন্ত খুব পরিচিত কিছু অভ্যাসই গুরুত্বপূর্ণ, নিয়মিত নড়াচড়া, পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাবার এবং প্রয়োজন হলে সঠিক চিকিৎসা
নতুন কোনো ওয়েলনেস ট্রেন্ড অনুসরণ করার আগে তাই শুধু ‘কীভাবে করবেন’ তা নয়, শরীরের ভেতরে আসলে কী ঘটছে সেটাও জানা জরুরি। কারণ নিজের শরীরকে বোঝার অভ্যাসটিই হতে পারে সুস্থ থাকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তথ্য: সায়েন্স ফ্রাইডে

ছবি: এআই

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১: ০০
বিজ্ঞাপন