
আজকের ব্যস্ত জীবনে ফিটনেসকে আমরা অনেক সময় কেবল জিমে যাওয়া বা শরীরচর্চার মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে ফেলি। কিন্তু উদ্যোক্তা সাফিয়া শামা মনে করেন, ফিটনেস আসলে তার চেয়েও অনেক বড় একটি জীবনদর্শন। যেখানে শরীর, মন এবং জীবনযাপনের মান—সবকিছুর মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করা জরুরি। ব্যস্ত উদ্যোক্তা জীবনে প্রতিদিনই তাকে নিতে হয় নানা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। কাজের চাপ, দায়িত্ব আর মানসিক চাপ—সব মিলিয়ে দিনগুলো সহজ নয়। তাই তার কাছে ফিটনেস মানে শুধু শরীরকে শক্ত রাখা নয়, বরং মন ও মস্তিষ্ককে সুস্থ এবং স্থিতিশীল রাখা।

ভ্রমণ আর অ্যাডভেঞ্চারে জীবনের শক্তি
ভ্রমণ সাফিয়া শামার জীবনের একটি বড় অংশ। তিনি এখন পর্যন্ত ৩৫টির বেশি দেশে ভ্রমণ করেছেন। তবে তার ভ্রমণ কেবল দর্শনীয় স্থান দেখা নয়; বরং তিনি পছন্দ করেন অ্যাডভেঞ্চারধর্মী অভিজ্ঞতা।


ট্রেকিং, স্কুবা ডাইভিং, স্কাই-ডাইভিং কিংবা বান্জি জাম্প—এসব কার্যক্রম তার কাছে শুধু রোমাঞ্চ নয়, বরং শরীর ও মনের এক ধরনের অনুশীলন। তাঁর মতে, নতুন জায়গা দেখা এবং নতুন অভিজ্ঞতা নেওয়া মানুষকে মানসিকভাবে অনেক বেশি জীবন্ত করে তোলে। নিউরোসায়েন্সের গবেষণাও বলছে, নতুন অভিজ্ঞতা মস্তিষ্কে ডোপামিন এবং সেরোটোনিনের নিঃসরণ বাড়ায়, যা মনকে ইতিবাচক রাখে এবং স্ট্রেস কমাতে সাহায্য করে।
ফিটনেসে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত
ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ ছিল সাফিয়া শামার। তবে জীবনের বাস্তবতায় অনেক নারীর মতো তার জীবনেও একসময় নিজের শরীরের প্রতি যত্ন নেওয়া কিছুটা পিছিয়ে পড়ে। বিয়ে, সংসার এবং দুই সন্তানের দায়িত্বের মাঝে ধীরে ধীরে ওজন বাড়তে থাকে। কিছুদিন অ্যারোবিক্স করলেও সেটি নিয়মিত হয়ে ওঠেনি।


পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত আসে ২০২২ সালে। তখন তাঁর ছেলে-মেয়েরা পড়াশোনার জন্য বিদেশে চলে যায়। একাকিত্বের সেই সময়টিতে তিনি উপলব্ধি করেন—নিজের শরীর ও মনের দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হবে। সেই সময় থেকেই শুরু হয় তার নিয়মিত জিমে যাওয়া এবং ওয়েট ট্রেনিং।
কেন স্ট্রেংথ ট্রেনিং জরুরি মনে করেন শামা
সাফিয়া শামা মনে করেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের মাংসপেশি স্বাভাবিকভাবেই কমতে থাকে। গবেষণা অনুযায়ী, ৪০ বছরের পর প্রতি দশকে গড়ে ৩ থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত মাংসপেশি কমে যেতে পারে। এই কারণেই তিনি নিয়মিত স্ট্রেংথ ট্রেনিংকে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। এটি শুধু মাংসপেশি নয়, হাড়কেও শক্ত রাখে এবং শরীরের কর্মক্ষমতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।

‘স্মার্ট ট্রেনিং’-এর ধারণা
৫২ বছর বয়সে এসে সাফিয়া শামা তার ফিটনেস রুটিনকে বলেন স্মার্ট ট্রেনিং।
তাঁর মতে, ফিটনেস মানে শুধু বেশি সময় জিমে থাকা নয়, বরং শরীরকে বুঝে ট্রেনিং করা। স্মার্ট ট্রেনিংয়ের মধ্যে রয়েছে—
সঠিক টেকনিক
পর্যাপ্ত রিকভারি
স্ট্রেচিং ও মবিলিটি
সঠিক পুষ্টি
ভালো ঘুম
শামার ভাষায়, “ফিটনেস শুধু পরিশ্রম না, এটা স্ট্র্যাটেজির বিষয়।”
কার্ডিও ও ওয়েট ট্রেনিংয়ের ভারসাম্য
সাফিয়া শামার ফিটনেস রুটিনের মূল ভিত্তি ওয়েট ট্রেনিং। কারণ এটি মেটাবলিজম বাড়ায়, হাড়কে শক্তিশালী রাখে এবং বয়সজনিত মাংসপেশি ক্ষয় কমাতে সাহায্য করে।
এর পাশাপাশি তিনি কার্ডিও করেন—দ্রুত হাঁটা, এলিপটিক্যাল কিংবা ট্রেকিং। তাঁর মতে, অ্যাডভেঞ্চার ট্রাভেলও এক ধরনের ফাংশনাল কার্ডিও, যা শরীরকে প্রাকৃতিকভাবে সক্রিয় রাখে।


বয়স বাড়লে কি ট্রেনিং কমাতে হবে?
অনেকেই মনে করেন বয়স বাড়লে ওয়েট ট্রেনিং কমিয়ে দেওয়া উচিত। কিন্তু এই ধারণার সঙ্গে একমত নন সাফিয়া শামা। তাঁর মতে, বরং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্ট্রেংথ ট্রেনিং আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নিয়মিত স্ট্রেংথ ট্রেনিং হাড়ের ঘনত্ব বাড়াতে সাহায্য করে, জয়েন্টকে স্থিতিশীল রাখে এবং শরীরের মেটাবলিজম সক্রিয় রাখে।
তিনি বলেন, “আমাদের সমাজে একটা ভুল ধারণা আছে—বয়স মানেই ধীর হয়ে যাওয়া। কিন্তু বাস্তবে মুভমেন্টই সুস্থ থাকার সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি।”

ফিটনেসের তৃতীয় স্তম্ভ: ঘুম
ফিটনেস নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সাফিয়া শামা বিশেষ গুরুত্ব দেন ঘুমের ওপর। তাঁর মতে, ডায়েট এবং এক্সারসাইজের পাশাপাশি ঘুম হলো ফিটনেসের তৃতীয় স্তম্ভ।
ঘুমের সময় শরীর মাংসপেশি রিপেয়ার করে, গ্রোথ হরমোন নিঃসরণ করে এবং মস্তিষ্কের টক্সিন পরিষ্কার করে। নিউরোসায়েন্স অনুযায়ী ঘুমের সময় মস্তিষ্কের গ্লিম্ফ্যাটিক সিস্টেম সক্রিয় হয়ে মস্তিষ্ককে পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে।
ঘুম কম হলে কী হয়
ঘুম কম হলে শরীরের হরমোনাল ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। তখন ক্ষুধা বাড়ানোর হরমোন ঘ্রেলিন বেড়ে যায় এবং পেট ভরার সংকেত দেওয়া লেপ্টিন কমে যায়। ফলে মানুষ বেশি খেতে শুরু করে। এছাড়া স্ট্রেস হরমোন কর্টিসল বেড়ে যায়, যা পেটের চর্বি বাড়াতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে ইনসুলিন সেনসিটিভিটিও কমে যায়, ফলে শরীর খাবারকে শক্তির বদলে চর্বি হিসেবে জমিয়ে রাখতে পারে। রাত জেগে ফোন ব্যবহার করাও ঘুমের বড় শত্রু। ফোনের ব্লু লাইট মেলাটোনিন হরমোন কমিয়ে দেয়, ফলে ঘুম দেরিতে আসে এবং ঘুমের গভীরতাও কমে যায়।
শামার সহজ তিনটি নিয়ম

যাঁরা ডায়েট, এক্সারসাইজ ও ঘুমের ভারসাম্য রাখতে পারছেন না, তাঁদের জন্য সাফিয়া শামার পরামর্শ খুবই সহজ—
১. নিয়মিত মুভমেন্ট
২. সচেতন খাবার
৩. পর্যাপ্ত ঘুম
তাঁর কথায়, “ফিটনেসকে জটিল করে ফেলবেন না। এই তিনটি বিষয়ই দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতা তৈরি করে।” সবশেষে তিনি মনে করিয়ে দেন—ফিটনেস কোনো শর্টকাট নয়; এটি আজীবনের একটি অভ্যাস।