এই শীতে লিভার ঠিক রাখতে খেতে পারেন এই স্যুপ
শেয়ার করুন
ফলো করুন

সঠিক নিয়মে খেতে পারলে শীতে সবজি সুপার পাওয়ারের মতো কাজ করে। শীতের সবজিতে বেশ কিছু গুণ থাকে, যা আপনাকে এই শীতে ভালো রাখতেই প্রকৃতি দিয়ে থাকে। শীতে গাছে ফল থাকে কম, কিন্তু মাঠে সবজি থাকে বেশি। তার মানে হচ্ছে সবজিতে এমন খাদ্য উপাদান দেওয়া আছে, যা শীতে আপনাকে ভালো রাখবে। ডিটক্স করতে, লিভার ঠিক রাখতে, ইলেকট্রোলাইট ঠিক রাখতে কাজ করে। সেই সঙ্গে হার্ট ও ইমিউন সিস্টেমকে বুস্ট করতে পারে। এমন সবজির স্যুপ আপনি কীভাবে খাবেন, কোনটার সঙ্গে কোনটা মিশিয়ে খাবেন, সেটা আজ জানবেন।

এই চারটি সবজি এই শীতে দারুণ কার্যকর
এই চারটি সবজি এই শীতে দারুণ কার্যকর

বিটরুট (বিট), গাজর, মুলা ও টমেটো দিয়ে তৈরি স্যুপ পুষ্টিকর খাবার, যা বিভিন্ন স্বাস্থ্য উন্নত করে। এসব সবজির সমন্বয়ে তৈরি স্যুপ শরীরের জন্য অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন, মিনারেল ও ফাইবারের সমৃদ্ধ উৎস হয়ে ওঠে, যা লিভারের ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করে, হার্টের স্বাস্থ্য রক্ষা করে, ডাইজেস্টিভ সিস্টেমকে সাহায্য করে এবং সামগ্রিকভাবে হজমকে উন্নত করে। এর উপকারিতা ও ব্যাখ্যা বিস্তারিতভাবে দেওয়া হলো।

বিজ্ঞাপন

হার্টের স্বাস্থ্য উন্নত করে

এই স্যুপে বিটরুটের নাইট্রেটস রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে। নাইট্রেটস শরীরে নাইট্রিক অক্সাইডে পরিণত হয়, যা রক্তনালিগুলোকে প্রসারিত করে (ভাসোডিলেশন) এবং রক্তপ্রবাহ উন্নত করে। টমেটোর লাইকোপিন ও গাজরের বিটাক্যারোটিনও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে, যা অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমিয়ে হার্ট ডিজিজের ঝুঁকি হ্রাস করে। মুলা সালফার ধারণকারী যৌগ (গ্লুকোসিনোলেটস) প্রদান করে, যা কোলেস্টেরল লেভেল নিয়ন্ত্রণ করে এবং ইনফ্লামেশন কমায়। টমেটো, বিটরুট ও গাজরের সমন্বয় অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট অ্যাকটিভিটি বাড়িয়ে কার্ডিওভাসকুলার রোগের ঝুঁকি কমাতে পারে।

বিজ্ঞাপন

ইমিউন সিস্টেমকে বুস্ট করে

স্যুপে থাকা ভিটামিন সি (টমেটো ও মুলা থেকে), ভিটামিন এ (গাজর থেকে) এবং ফোলিক অ্যাসিড (বিটরুট থেকে) ইমিউন ফাংশনকে শক্তিশালী করে। বিটাক্যারোটিন শরীরে ভিটামিন এ–তে পরিণত হয়, যা ইমিউন সেলের (যেমন টি সেল) উৎপাদন বাড়ায় এবং ইনফেকশন প্রতিরোধ করে। মুলার অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টিফাঙ্গাল প্রোপার্টিজ ইমিউন রেসপন্সকে সাপোর্ট করে। এই সবজিগুলোর অ্যান্টিঅক্সিডেন্টস ফ্রি র‍্যাডিক্যালস নিউট্রালাইজ করে ইমিউনিটি বাড়ায়।

ডাইজেস্টিভ হেলথ ও ডিটক্সিফিকেশন উন্নত করে

এই সবজিগুলোতে প্রচুর ফাইবার থাকে, যা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে এবং অন্ত্রের স্বাস্থ্য রক্ষা করে। বিটরুট ও মুলা লিভারকে ডিটক্স করে। কারণ, এদের যৌগগুলো (বেটালেইনস ও গ্লুকোসিনোলেটস) টক্সিনসকে বের করে দেয়। মুলার পলিস্যাকারাইডস প্রিবায়োটিক হিসেবে কাজ করে গাট মাইক্রোবায়োমকে সাপোর্ট করে এবং ওবেসিটি বা স্থূলতা প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখে। টমেটো ও গাজরের ক্যারোটিনয়েডস ডাইজেস্টিভ ট্র্যাক্টকে প্রোটেক্ট করে। এই সমন্বয় ডাইজেস্টিভ সিস্টেমকে পরিষ্কার করে এবং ইনফ্লামেশন কমায়।

ক্যানসার প্রতিরোধ ও অ্যান্টিইনফ্লামেটরি এফেক্টস

গাজরের বিটাক্যারোটিন সেল মেমব্রেনকে টক্সিন থেকে রক্ষা করে এবং ক্যানসার সেলের বৃদ্ধি হ্রাস করে করে। টমেটোর লাইকোপিন ও বিটরুটের বেটালেইনস অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে ক্যানসারের ঝুঁকি কমায়। মুলার অ্যান্থোসায়ানিনস এবং ভিটামিন সি ইনফ্লামেশন কমিয়ে ক্যানসার প্রতিরোধী হিসেবে কাজ করে। এই যৌগগুলো ফ্রি র‌্যাডিক্যালসকে নিউট্রালাইজ করে সেল ড্যামেজ প্রতিরোধ করে।

বিট, গাজর, মুলা ও টমেটোর স্যুপের রেসিপি

এই স্যুপ খুবই স্বাস্থ্যকর, লো-ক্যালরি ও পুষ্টিকর। বিটের গভীর লাল রং, গাজরের মিষ্টি, মুলার তীক্ষ্ণতা ও টমেটোর টকমিষ্টি স্বাদ মিলে এক অসাধারণ ফ্লেভার তৈরি হয়। এটি ডিটক্সের জন্য আদর্শ ও শীতকালে গরম গরম খেতে দারুণ লাগে। চারজনের জন্য পরিমাণ।

সুপের প্রতীকী ছবি
সুপের প্রতীকী ছবি

উপকরণ

বিটরুট (বিট): ১টি মাঝারি (খোসা ছাড়িয়ে কিউব করে কাটা)
গাজর: ২টি মাঝারি (খোসা ছাড়িয়ে কিউব করে কাটা)
মুলা (সাদা বা লাল): ১টি মাঝারি (খোসা ছাড়িয়ে কিউব করে কাটা)
টমেটো: ২টি মাঝারি (চৌকো করে কাটা)
পেঁয়াজ: ১টি মাঝারি (কুচি করা)
রসুন: ৪-৫ কোয়া (কুচি বা পেস্ট)
আদা: ১ ইঞ্চি (কুচি বা পেস্ট)
তেল বা মাখন: ১-২ টেবিল চামচ (অলিভ অয়েল বা ঘি ভালো)
লবণ: স্বাদমতো
কালো গোলমরিচগুঁড়া: ১ চা–চামচ (বা স্বাদমতো)
জিরাগুঁড়া বা গোটা জিরা: ১/২ চাচামচ (ঐচ্ছিক, ফ্লেভারের জন্য)
পানি বা ভেজিটেবল স্টক: ৪-৫ কাপ
ফ্রেশ ক্রিম বা দুধ: ২–৩ টেবিল চামচ (ক্রিমি করার জন্য, ঐচ্ছিক)
ধনেপাতা বা পেঁয়াজপাতা কুচি: সাজানোর জন্য

প্রণালি

১.
বিট, গাজর, মুলা ও টমেটো ভালো করে ধুয়ে খোসা ছাড়িয়ে ছোট ছোট কিউব করে কেটে নিন। পেঁয়াজ, রসুন ও আদা কুচি করে রাখুন।
২.
একটি প্রেশার কুকার বা প্যানে তেল বা মাখন গরম করুন। গোটা জিরা দিয়ে ফোড়ন দিন। তারপর আদা–রসুন কুচি দিয়ে ১ মিনিট ভাজুন। পেঁয়াজ কুচি দিয়ে স্বচ্ছ হওয়া পর্যন্ত ভাজুন (২-৩ মিনিট)।
৩.
এবার কাটা বিট, গাজর, মুলা ও টমেটো দিন। লবণ ও কালো গোলমরিচগুঁড়া ছড়িয়ে দিয়ে ৪-৫ মিনিট মাঝারি আঁচে নেড়েচেড়ে ভাজুন। এতে সবজির স্বাদ বেরিয়ে আসবে।
৪.
মাঝারি আঁচে প্রেশার কুকারে ৪-৫ কাপ পানি বা স্টক দিয়ে ঢাকনা লাগান। ৩-৪টা সিটি দিলে নামিয়ে নিন।
আর সাধারণ প্যানে রান্না করলে ৫-৬ কাপ পানি দিয়ে ঢেকে ২০ থেকে ২৫ মিনিট সেদ্ধ করুন যতক্ষণ না সবজি নরম হয়।
৫.
সেদ্ধ হয়ে গেলে সবজি ঠান্ডা হতে দিন। তারপর হ্যান্ড ব্লেন্ডার বা মিক্সারে ব্লেন্ড করে নিন। চাইলে ছাঁকনি দিয়ে ছেঁকে নিন পারেন।
৬.
এবার পিউরি করা মিশ্রণ আবার পাত্রে নিয়ে মাঝারি আঁচে গরম করুন। প্রয়োজনে আরেকটু পানি যোগ করে পাতলা করুন। ফ্রেশ ক্রিম বা দুধ দিয়ে ক্রিমি করুন (ঐচ্ছিক)। স্বাদ দেখে লবণ ও গোলমরিচ ঠিক করুন। ৪-৫ মিনিট ফুটিয়ে নিন।
পরিবেশন: গরম গরম বাটিতে ঢেলে ওপরে ধনেপাতা বা পেঁয়াজপাতা ছড়িয়ে দিন। চিজ বা রোস্টেড বাদাম দিয়ে সাজিয়ে পরিবেশন করুন।
ডিনারে এই স্যুপ খাবেন। এর সঙ্গে অন্যকিছু খাবেন না। ১৫ দিন খেয়েই দেখুন।

যারা খেতে পারবেন না

কিডনি সমস্যায় ভুগছেন এমন রোগী এই স্যুপ খেতে পারবেন না। যাঁদের বিট বা মুলায় অ্যালার্জি আছে, তাঁরা খেতে পারবেন না। এই স্যুপে বেকিং পাউডার ও টেস্টিং সল্ট ব্যবহার করবেন না।

এই স্যুপ অত্যন্ত পুষ্টিকর ও লো-ক্যালরি খাবার। প্রধান উপাদানগুলো (বিটরুট, গাজর, মুলা, টমেটো) থেকে এতে প্রচুর ভিটামিন, মিনারেল, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ফাইবার থাকে। রেসিপি অনুসারে (প্রায় ৪-৫ সার্ভিংয়ের জন্য) একজনের জন্য (প্রায় ২৫০-৩০০ মিলি) যথেষ্ট।

লেখক: খাদ্য ও পথ্য বিশেষজ্ঞ; প্রধান নির্বাহী, প্রাকৃতিক নিরাময়কেন্দ্র

ছবি: পেকজেলসডটকম, উইকিপিডিয়া

প্রকাশ: ০২ জানুয়ারি ২০২৬, ০১: ০০
বিজ্ঞাপন