তাল: গরমে প্রাকৃতিক এয়ারকন্ডিশনার
শেয়ার করুন
ফলো করুন

তাল (পালমাইরা বা আইস অ্যাপল)। এটি একটি সুস্বাদু ও পুষ্টিকর গ্রীষ্মকালীন ফল; যা ‘ট্রি অব লাইফ’ নামে পরিচিত; কারণ, তালগাছের প্রতিটি অংশ (ফল, পাতা, রস, কাঠ) কোনো না কোনো উপায়ে মানুষের কাজে লাগে—যেমন খাবার, ওষুধ, আসবাব, এমনকি জ্বালানি হিসেবে।

তালশাঁস গরমে দারুণ উপকারী; খেতেও মজা
তালশাঁস গরমে দারুণ উপকারী; খেতেও মজা

প্রচণ্ড গরম আবহাওয়ায় চিরায়ত প্রকৃতি শরীরকে ঠান্ডা যেসব উপাদান দিয়েছে, তাল এর একটি। এটি একটি ঐতিহ্যবাহী ফলও। এই সময় তাল পাকে। ফলে তাল দিয়ে  পিঠাসহ নানা পদ, পানীয়, হালুয়া তৈরি হয়। এসবই শরীর শীতল রাখতে সহায়তা করে। তালের রস থেকে গুড় তৈরি একটি ঐতিহ্যবাহী শিল্প। পেট ও ত্বকের সমস্যায় এবং গরমে সতেজ রাখতে ঐতিহ্যগতভাবে তাল ব্যবহৃত হয়।

বিজ্ঞাপন

তালের পুষ্টিগুণ

পাকা তাল খাওয়া যায় নানাভাবে
পাকা তাল খাওয়া যায় নানাভাবে

তালে থাকে ৯৫ শতাংশ পানি। এ জন্য একে গ্রীষ্মের ‘প্রাকৃতিক এয়ারকন্ডিশনার’ করে তোলে। এর পুষ্টিগুণ অসাধারণ। ১০০ গ্রামে প্রায় ৪৩ থেকে ৬০ ক্যালরি, কার্বোহাইড্রেট ১০ থেকে ১৫ গ্রাম, ফাইবার ১২ গ্রাম, ভিটামিন বি ও আয়রন, জিংক, পটাশিয়াম ও ক্যালসিয়াম থাকে।

• পাচনতন্ত্রের উন্নতি: ফাইবারের উপস্থিতি কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে ও মলত্যাগ নিয়মিত করে। এটি অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখে ও গ্যাস্ট্রিক আলসারের মতো সমস্যা কমায়। তালের অ্যান্টিইনফ্ল্যামেটরি গুণ পাকস্থলীর জ্বালাপোড়া কমায়। অনেকে গরমে পেট ঠান্ডা রাখতে তাল খান।

• হাইড্রেশনের রাজা: তাল প্রাকৃতিক ইলেকট্রোলাইট। এতে থাকা পটাশিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম গরমে ঘামের সঙ্গে বের হয়ে যাওয়া খনিজের ঘাটতি পূরণ করে এবং হিটস্ট্রোক প্রতিরোধ করে। এটি নারকেল পানির মতো কাজ করে, কিন্তু বেশি ফাইবারযুক্ত, যা পেটও পরিষ্কার রাখে। তালের উচ্চ পানির পরিমাণ (৮৭ থেকে ৯৫ শতাংশ) এটিকে গ্রীষ্মকালে একটি আদর্শ হাইড্রেটিং ফলে পরিণত করেছে। গ্রামাঞ্চলে গ্রীষ্মে তাল শরীর ঠান্ডা রাখতে ও হিটস্ট্রোক প্রতিরোধে খাওয়া হয়। লিভারের টক্সিন দূর করতে সাহায্য করে। কারণ, এটি প্রাকৃতিক ডিটক্সিফায়ার হিসেবে কাজ করে।

• ডায়াবেটিসের বন্ধু: এর গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কম (৩০ থেকে ৪৫), যা রক্তে শর্করা ধীরে বাড়ায়। এটি ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়ায় এবং ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য নিরাপদ। ভারতে তালকে ‘প্রাকৃতিক সুগার ফ্রি ড্রিঙ্ক’ বলা হয়। কারণ, এতে প্রাকৃতিক শর্করা থাকলেও অতিরিক্ত চিনির মতো ক্ষতি করে না।

বিজ্ঞাপন

• ত্বকের জাদুকর: অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট (ফ্ল্যাভোনয়েড, ফেনোলিক যৌগ) ও ভিটামিন সি থাকায় এটি বয়সের ছাপ কমায়, ঘামাচি, র‍্যাশ এবং চিকেনপক্সের লক্ষণ হ্রাস করে। গ্রামে নারীরা তালশাঁস গুঁড়ো করে ফেসপ্যাক বানান, যা ত্বককে ‘গ্লাস স্কিন’–এর মতো চকচকে করে।

তালের আটির ভেতরে যে শাঁস থাকে সেটাও দারুণ উপকারি
তালের আটির ভেতরে যে শাঁস থাকে সেটাও দারুণ উপকারি

• ওজন কমানোর সহায়ক: কম ক্যালরি (৪৩/১০০ গ্রাম) এবং উচ্চ ফাইবারের কারণে ক্ষুধা কমায় ও ভরপুর অনুভূতি দেয়। এটি ‘প্রাকৃতিক অ্যাপেটাইট সাপ্রেসার’ হিসেবে কাজ করে, যাঁরা ডায়েট করেন তাঁদের জন্য আদর্শ—একটি ফলে ৮৭ শতাংশ পানি থাকে, যা ওজন কমাতে সাহায্য করে।

• হার্ট ও লিভারের রক্ষক: পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে, কোলেস্টেরল কমায় ও লিভার থেকে টক্সিন বের করে। এটি অ্যান্টিইনফ্ল্যামেটরি ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল বলে লিভার–ক্লিনজার হিসেবে কাজ করে।

• ইমিউনিটি বুস্টার: ভিটামিন সি ও জিংক ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করে, সংক্রমণ প্রতিরোধ করে, ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (ইউটিআই) প্রতিরোধে সাহায্য করে। প্রাচীন আয়ুর্বেদে এটিকে ‘কৃমিনাশক’ বলা হয়; কারণ, এটি কৃমি দূর করে ও শিশুদের পুষ্টির অভাব পূরণ করে।

• হার্টের স্বাস্থ্য: পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে ও হৃৎপিণ্ডের চাপ কমায়। এটি কোলেস্টেরল কমাতেও সাহায্য করে। অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট হার্টের প্রদাহ কমায় এবং রক্তনালি সুস্থ রাখে।

• অন্যান্য উপকারিতা: তালের অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল গুণ ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের বিরুদ্ধে কাজ করে। আর্থ্রাইটিসের প্রদাহ কমাতে সহায়ক। লিভার টনিক হিসেবে কাজ করে ও মালনিউট্রিশন প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে।

সতর্কতা

কারও কারও তালে অ্যালার্জি হতে পারে, যার ফলে ত্বকে র‍্যাশ, চুলকানি বা শ্বাসকষ্ট হয়। প্রথমবার অল্প পরিমাণে খেয়ে দেখা উচিত। আর অতিরিক্ত তাল খেলে ডায়রিয়া, পেটব্যথা বা ফোলাভাব হতে পারে; কারণ, এটি ল্যাক্সেটিভ হিসেবে কাজ করে। পচা বা অতিরিক্ত পাকা তাল পেটের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। অতিরিক্ত ঠান্ডা গুণের কারণে ঠান্ডাজনিত সমস্যা হতে পারে। এ জন্য পরিমিত খাওয়া উচিত।

যেভাবে খাবেন

তাল বিভিন্ন উপায়ে খাওয়া হয়, যা স্বাদ ও পুষ্টি দুটোই বাড়ায়।
• দুধের সঙ্গে: তালশাঁস দুধ, মধু বা চিনি মিশিয়ে খান। এটি একটি শীতল ডেজার্ট হিসেবে কাজ করে। ১ কাপ দুধে ১টি ফলের শাঁস মিশিয়ে ঠান্ডা পরিবেশন করুন।
• স্মুদি বা শরবত: তালশাঁস ব্লেন্ড করে নারকেল পানি, লেবু বা পুদিনাপাতা মিশিয়ে স্মুদি বা শরবত বানান। এটি গরমে সতেজ পানীয়। তালের শরবত চিনি বা গুড় মিশিয়ে বানানো হয়।
• ডেজার্ট বা অন্যান্য খাবার: তালশাঁস দিয়ে ক্ষীর, পুডিং, জ্যাম, ক্যান্ডি বা পিকল তৈরি করা যায়। তালের ক্ষীর গ্রামে জনপ্রিয়। তালের গুড় (পাটালি) মিষ্টি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়, যা তালের রস থেকে তৈরি।

তুলনামূলক তথ্য

তালকে অন্য ফলের সঙ্গে তুলনা করলে এর অনন্যতা বোঝা যায়। নিচে একটি টেবিলে কয়েকটি জনপ্রিয় ফলের সঙ্গে তুলনা দেওয়া হলো (প্রতি ১০০ গ্রামের ভিত্তিতে আনুমানিক মান):

Sk. Saifur Rahman

তাল ডাবের পানির তুলনায় বেশি ফাইবারযুক্ত (যা হজমশক্তি বাড়ায়); আবার ফ্যাট কম থাকায় ওজন কমায়। তালের অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট ডাবের পানির চেয়ে বেশি হওয়ায় লিভারকে রক্ষা করে। কমলার সঙ্গে তুলনায় তালে ভিটামিন সি কম হলেও পটাশিয়াম বেশি থাকায় হার্টের জন্য ভালো। আপেলের মতো ফাইবার থাকলেও তালে পানি বেশি থাকায় গরমে শরীরকে সতেজ রাখে।

লেখক: খাদ্য ও পথ্য বিশেষজ্ঞ; প্রধান নির্বাহী, প্রাকৃতিক নিরাময় কেন্দ্র
ছবি: উইকিপিডিয়া, সামাজিক মাধ্যম

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৫, ০১: ০০
বিজ্ঞাপন