
সকালের নাশতায় শুধু ফল, দুপুরে তাড়াহুড়ো করে সামান্য ভাত, রাতে হালকা কিছু খেয়ে দিন শেষ। এমন খাদ্যাভ্যাস এখন অনেকেরই। বাইরে থেকে সবকিছু ঠিকঠাক মনে হলেও, দিনের পর দিন শরীরে পর্যাপ্ত প্রোটিন না পৌঁছালে শরীর ধীরে ধীরে কিছু সংকেত দিতে শুরু করে। সমস্যা হলো, আমরা অনেক সময় সেগুলোকে কাজের চাপ, বয়স বা ঘুমের অভাব বলে এড়িয়ে যাই।

প্রোটিন শুধু পেশি গঠনের জন্য নয়। শরীরের কোষ মেরামত, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, হরমোন তৈরি, ত্বক, চুল, নখ এবং মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কাজেও এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই এর ঘাটতি হলে প্রভাব পড়ে পুরো শরীরেই।
পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়ার পরও যদি সারাক্ষণ ক্লান্ত লাগে, ছোট ছোট কাজেও শক্তি ফুরিয়ে যায়, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। শরীর প্রয়োজনীয় প্রোটিন না পেলে শক্তি উৎপাদনে সমস্যা হয়। দীর্ঘদিন এমন চলতে থাকলে শরীর শক্তির চাহিদা পূরণ করতে নিজের পেশি ভাঙতে শুরু করে। এর ফলে দুর্বলতা, অবসন্নতা এবং কর্মক্ষমতা কমে যেতে পারে।

নিয়মিত জিমে যাচ্ছেন বা শরীরচর্চা করছেন, কিন্তু পেশি গড়ে উঠছে না কিংবা প্রত্যাশিত পরিবর্তন চোখে পড়ছে না? এর একটি কারণ হতে পারে প্রোটিনের ঘাটতি। ব্যায়ামের পর পেশি পুনর্গঠন ও নতুন কোষ তৈরির জন্য শরীরের পর্যাপ্ত প্রোটিন প্রয়োজন হয়। শুধু ব্যায়াম করলেই হবে না, খাবারের প্লেটেও প্রোটিনের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।
চুল আগের তুলনায় বেশি ঝরছে? নখ বারবার ভেঙে যাচ্ছে? ত্বকও যেন আগের মতো উজ্জ্বল নেই? চুল ও নখের প্রধান উপাদানই হলো প্রোটিন। তাই শরীরে দীর্ঘদিন এর ঘাটতি থাকলে চুল পাতলা হয়ে যেতে পারে, নখ দুর্বল হয়ে ভেঙে যেতে পারে এবং ত্বকও শুষ্ক দেখাতে পারে।

ভাত বা রুটি খাওয়ার অল্প সময় পরই আবার কিছু খেতে ইচ্ছে করছে? এটি অনেক সময় খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিন না থাকার লক্ষণ হতে পারে। প্রোটিন দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। অন্যদিকে শুধু শর্করাভিত্তিক খাবার খেলে দ্রুত ক্ষুধা ফিরে আসে।
তাই সকালের নাশতা বা দুপুরের খাবারে ডিম, মাছ, ডাল, টক দই বা ছোলার মতো প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখলে অনেকক্ষণ তৃপ্তি পাওয়া যায়।

প্রোটিন শুধু শরীর নয়, মস্তিষ্কের জন্যও জরুরি। প্রোটিন থেকে তৈরি হওয়া অ্যামিনো অ্যাসিড মস্তিষ্কে বিভিন্ন রাসায়নিক বার্তা আদান-প্রদানে সাহায্য করে। তাই পর্যাপ্ত প্রোটিনের অভাব হলে অনেকের মেজাজের ওঠানামা, মনোযোগ কমে যাওয়া, অস্থিরতা বা মন খারাপের প্রবণতাও বাড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিনের প্রতিটি প্রধান খাবারে প্রায় ৩০ গ্রাম করে প্রোটিন রাখার চেষ্টা করা ভালো। অর্থাৎ দিনে প্রায় ৯০ গ্রাম প্রোটিন অনেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের চাহিদা পূরণে সহায়ক হতে পারে।
তবে সবার প্রয়োজন এক নয়। বয়স, ওজন, শারীরিক পরিশ্রম, স্বাস্থ্যগত অবস্থা এবং গর্ভাবস্থার মতো বিষয় অনুযায়ী প্রোটিনের চাহিদা কম বা বেশি হতে পারে। তাই ব্যক্তিগত প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে ভালো।

প্রোটিনের উৎস মানেই শুধু মাংস নয়। প্রতিদিনের খাবারে সহজেই যোগ করা যায় এমন অনেক স্বাস্থ্যকর খাবার রয়েছে।
ভালো প্রোটিনের উৎসের মধ্যে রয়েছে–
* ডিম
* মাছ
* মুরগির মাংস
* দুধ ও টক দই
* পনির
* মসুর ডাল
* ছোলা
* সয়াবিন
* বিভিন্ন ধরনের বাদাম
* অন্যান্য ডালজাতীয় খাবার
যতটা সম্ভব প্রক্রিয়াজাত খাবারের পরিবর্তে প্রাকৃতিক উৎসের প্রোটিন বেছে নেওয়াই শরীরের জন্য বেশি উপকারী।

শরীর খুব কমই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। বেশির ভাগ সময়ই সে আগে থেকেই বিভিন্ন লক্ষণের মাধ্যমে আমাদের সতর্ক করে দেয়। তাই দীর্ঘদিন ধরে ক্লান্তি, অতিরিক্ত চুল পড়া, বারবার ক্ষুধা লাগা কিংবা ব্যায়ামের পরও প্রত্যাশিত ফল না পেলে বিষয়টি অবহেলা করবেন না।
সুস্থ থাকার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো প্রতিদিনের খাবারে সুষম পুষ্টি নিশ্চিত করা। আর সেই তালিকায় প্রোটিনের জায়গাটি যেন কখনোই ফাঁকা না থাকে। কারণ, সুন্দর ত্বক, শক্তিশালী শরীর, সুস্থ মন এবং প্রাণবন্ত জীবনের ভিত্তি গড়ে ওঠে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস থেকেই।
ছবি: পেকজেলস ও এআই