মাথা ঠান্ডা রাখার নিনতাই টেকনিকই কি জাপানের সাফল্যের রহস্য? দেখুন, আপনি কীভাবে তা নিজের জীবনে কাজে লাগাবেন
শেয়ার করুন
ফলো করুন

জীবনে আমাদের সবকিছু যেন এখন ‘এখনই’ চাই। সাফল্য, স্বীকৃতি কিংবা ফলাফল প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাড়াহুড়া আমাদের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। ফলে এই নিরন্তর দৌড়ে মানুষ ক্রমেই ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। এখানেই জাপানিদের সেই চারিত্রিক স্থিরতার দর্শন শেখাতে পারে, অস্থিরতা ছাড়া নিজের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব। আর এই প্রাচীন জাপানি দর্শনের নাম নিনতাই (Nintai)। নিনতাই শেখায় কীভাবে চাপের মুখেও মাথা ঠান্ডা রাখা যায়, কীভাবে ধৈর্য ও সহনশীলতাকে আশ্রয় করে মানসিক প্রশান্তি খুঁজে নেওয়া যায়।

নিনতাই কেন আধুনিক সহনশীলতার চেয়ে আলাদা

জাপানি শব্দ ‘নিন’–এর অর্থ হলো সহ্য করা, আর ‘তাই’ মানে ঠেলে এগিয়ে যাওয়া। দুটি মিলিয়ে নিনতাইয়ের অর্থ দাঁড়ায়—ধৈর্যের সঙ্গে প্রতিকূলতা সহ্য করা এবং নীরবে এগিয়ে চলা। আধুনিক মনোবিজ্ঞানে সহনশীলতা বা রিজিলিয়েন্স বলতে সাধারণত বিপর্যয়ের পর ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতাকে বোঝানো হয়। কিন্তু নিনতাইয়ের দর্শন তার চেয়ে অনেক গভীর ও আত্মিক। পশ্চিমা মনোবিজ্ঞান মূলত বাইরে থেকে মোকাবিলার কৌশল ও পুনরুদ্ধারের ওপর জোর দেয়। কিন্তু নিনতাই উল্টো রথে হাঁটে। এই জীবনদর্শন গ্রহণযোগ্যতা, সচেতনতা ও ভেতরের পরিবর্তনকেই মূলত গুরুত্ব দেয়। সমস্যার মুখে তাড়াহুড়া করে প্রতিক্রিয়া না দিয়ে বরং তার সঙ্গেই শান্তভাবে থাকার নামই নিনতাই।

বিজ্ঞাপন

কীভাবে নিনতাই মানসিক চাপ কমায়

নিনতাইয়ের চর্চা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এটি শুধু আবেগ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে না; বরং কঠিন পরিস্থিতিতেও মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখার শক্তি জোগায়। কল্পনাশক্তি, সচেতনতা, স্মৃতি, ইচ্ছাশক্তি ও বিবেক—এ পাঁচটি মানবিক গুণের চর্চার মাধ্যমে নিনতাইকে জীবনের অংশ করে তোলা সম্ভব। এর ফলে অস্থির মন ধীরে ধীরে শান্ত হয় এবং মানুষ আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়া দেখানোর বদলে আরও সচেতন ও বিচক্ষণভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে শেখে। এই মানসিক পরিবর্তন শরীরের স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে এবং বিশ্রাম ও পুনরুদ্ধারের জন্য দায়ী প্যারাসিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেমকে সক্রিয় করে। এই দর্শনের মূল শিক্ষা হলো, শান্তি অস্বস্তি থেকে পালিয়ে যাওয়ার মধ্যে নয়; বরং বর্তমান মুহূর্তকে গ্রহণে বেঁচে থাকার মধ্যে নিহিত।

বিজ্ঞাপন

রোজকার জীবনে নিনতাইয়ের চর্চা করবেন যেভাবে

নিনতাইয়ের চর্চার জন্য জীবনে বড় কোনো পরিবর্তন আনার প্রয়োজন নেই; বরং ছোট ছোট সচেতন অভ্যাসের মাধ্যমেই এটি ধীরে ধীরে নিজের মধ্যে ধারণ করা যায়। বিষয়টি উদাহরণের মাধ্যমেই বোঝানো যাক, যেমন কোনো মেসেজ বা বার্তার উত্তর দেওয়ার আগে এক মুহূর্ত থেমে ভাবা, ট্রাফিক সিগন্যালে অপেক্ষা করার সময় গভীর শ্বাস নেওয়া কিংবা কোনো বিচার–বিশ্লেষণ ছাড়াই চারপাশের পরিবেশকে পর্যবেক্ষণ করা।

এ ছাড়া ধীর শ্বাস–প্রশ্বাসের অভ্যাস, সচেতনভাবে হাঁটা, প্রতিদিন কৃতজ্ঞতার বিষয়গুলো লিখে রাখা জার্নালিংয়ের মাধ্যমে, নিরিবিলি কিছু সময় নিজের সঙ্গে কাটানো, প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকা, ধ্যান করা এবং নিজের চিন্তাগুলোকে সচেতনভাবে পর্যবেক্ষণ করাও নিনতাইয়ের চর্চার অংশ। মূলত তাড়াহুড়ার বদলে শান্তি, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার বদলে বোঝাপড়া ও ভয়ের বদলে বিশ্বাসকে বেছে নেওয়ার মধ্যেই নিহিত রয়েছে নিনতাইয়ের দর্শন। বর্তমান সময়ের অস্থির পৃথিবীতে এই নীরব শক্তিই হয়তো আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

ছবি: ইন্সটাগ্রাম, এআই

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ১০: ৪৯
বিজ্ঞাপন