
ঘুমের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি বোঝা যায়, যখন ঘুম আসে না। শান্তির ঘুমের মতো স্বস্তিও আর কিছুতে নেই। রাতে ঠিকমতো ঘুম না হলে তার প্রভাব পড়ে পরদিনের কর্মক্ষমতা, মনোযোগ ও মানসিক অবস্থার ওপর। শুধু তা-ই নয়, দীর্ঘদিন এই সমস্যা চলতে থাকলে তা নানা শারীরিক ও মানসিক জটিলতার কারণ হতে পারে। বর্তমানে পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে স্বাস্থ্যগত নানা সমস্যায় ভুগছেন বহু মানুষ। অনেকের রাতে হালকা ঘুমের কারণে বারবার ঘুম ভেঙে যায়, আবার অনেকের সহজেই ঘুম আসে না। ফলে পরদিন সারা দিন ক্লান্তি, বিরক্তি ও কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষ করে ২০২০ সালের পর থেকে অনিদ্রা বা ইনসমনিয়ার সমস্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে—
• অতিরিক্ত মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও কর্মক্ষেত্রের চাপ। অনেকের ক্ষেত্রে এর সঙ্গে বিষণ্নতা বা উদ্বেগজনিত সমস্যাও যুক্ত হয়।
• মোবাইল, ল্যাপটপ ও টেলিভিশনের অতিরিক্ত ব্যবহার। বিশেষ করে ঘুমানোর আগে স্ক্রিনের ব্লু লাইট মেলাটোনিন হরমোনের নিঃসরণ কমিয়ে দেয়। ফলে ঘুম আসতে দেরি হয়।

• অনিয়মিত জীবনযাপন। শিফট ডিউটি, বাড়ি থেকে কাজ করা কিংবা নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে না যাওয়ার কারণে শরীরের স্বাভাবিক ঘুমের ছন্দ নষ্ট হয়।
• অতিরিক্ত চা, কফি, অ্যালকোহল বা ধূমপানের অভ্যাস। এগুলো স্নায়ুতন্ত্রকে উত্তেজিত রাখে এবং ঘুমের মান কমিয়ে দেয়।
• মহামারির পর বদলে যাওয়া জীবনযাপন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় কাটানো এবং শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়াও অনিদ্রা বাড়ার অন্যতম কারণ।
ভালো ঘুমের জন্য বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি সাধারণ নিয়ম মেনে চলার পরামর্শ দেন। প্রতিদিন মোটামুটি একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়ার চেষ্টা করুন। ঘুমানোর অন্তত দুই থেকে তিন ঘণ্টা আগে রাতের খাবার শেষ করুন। বিছানায় মুঠোফোন, ল্যাপটপ বা অন্যান্য স্ক্রিন ব্যবহার এড়িয়ে চলুন। যদিও বর্তমান জীবনযাত্রায় এসব নিয়ম শতভাগ মেনে চলা অনেকের পক্ষেই কঠিন, তবু যতটা সম্ভব অভ্যাসে পরিবর্তন আনা জরুরি।

অনিদ্রা (ইনসমনিয়া) শুধু একটি অভ্যাসগত সমস্যা নয়; এর পেছনে কাজ করে জটিল নিউরোবায়োলজিক্যাল, শারীরবৃত্তীয় ও মানসিক প্রক্রিয়া। এর মূল কারণগুলোর একটি হলো হাইপারঅ্যারাউজাল, অর্থাৎ শরীর ও মস্তিষ্কের অতিরিক্ত সক্রিয় অবস্থা, যা স্বাভাবিক ঘুমের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে।
ঘুম নিয়ন্ত্রণে শরীরের দুটি প্রধান প্রক্রিয়া কাজ করে। প্রথমটি হোমিওস্ট্যাটিক স্লিপ ড্রাইভ। দীর্ঘ সময় জেগে থাকলে মস্তিষ্কে অ্যাডেনোসিন জমতে থাকে, যা ঘুমের চাপ তৈরি করে। এ সময় মস্তিষ্কের ভেন্ট্রোলেটারাল প্রিওপটিক নিউক্লিয়াস (VLPO) ও MnPO নিউরন GABA এবং গ্যালানিন নিঃসরণ করে জাগ্রত রাখার কেন্দ্রগুলোকে দমন করে ঘুম আনতে সাহায্য করে।
অন্যটি হলো সার্কেডিয়ান রিদম। মস্তিষ্কের সুপ্রাকিয়াসম্যাটিক নিউক্লিয়াস শরীরের জৈবঘড়ি হিসেবে কাজ করে। আলো-অন্ধকারের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অন্ধকারে পিনিয়াল গ্রন্থি থেকে মেলাটোনিন হরমোন নিঃসৃত হয়, যা শরীরকে ঘুমের জন্য প্রস্তুত করে।
অনিদ্রার ক্ষেত্রে এই দুটি প্রক্রিয়ার মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। ফলে শরীর ক্লান্ত থাকলেও মস্তিষ্ক জেগে থাকার সংকেত দিতে থাকে এবং সহজে ঘুম আসে না।
আপনি জেনে অবাক হতে পারেন, কিছু খাবার স্বাভাবিকভাবেই ভালো ঘুমে সহায়তা করে। ঘুমানোর আগে বা নিয়মিত খাদ্যতালিকায় এসব খাবার রাখলে অনিদ্রার সমস্যা কিছুটা কমতে পারে।
• আমন্ড
ভালো ঘুমের জন্য আমন্ড একটি উপকারী খাবার। এতে রয়েছে পর্যাপ্ত ম্যাগনেশিয়াম, যা স্নায়ু ও পেশিকে শিথিল রাখতে সাহায্য করে। প্রতিদিন ছয় থেকে সাতটি আমন্ড খেলে অনিদ্রার সমস্যা কমতে পারে। পাশাপাশি এটি মানসিক চাপ কমাতে এবং ঘুমের স্বাভাবিক চক্র বজায় রাখতেও সহায়ক।

• কলা
কলা ম্যাগনেশিয়াম ও পটাশিয়ামের ভালো উৎস। এই দুটি খনিজ উপাদান পেশিকে শিথিল করতে এবং শরীরকে আরাম দিতে সাহায্য করে। নিয়মিত খাদ্যতালিকায় কলা রাখলে ম্যাগনেশিয়ামের ঘাটতি পূরণ হওয়ার পাশাপাশি ভালো ঘুমেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
• কম চর্বিযুক্ত দই
দই শুধু অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্যই উপকারী নয়, ভালো ঘুমের ক্ষেত্রেও সহায়ক হতে পারে। ১০০ গ্রাম কম চর্বিযুক্ত দইয়ে প্রায় ১৯ মিলিগ্রাম ম্যাগনেশিয়াম থাকে, যা শরীরকে শিথিল করতে এবং ঘুমের মান উন্নত করতে ভূমিকা রাখে।
ভালো ঘুমের জন্য আরেকটি সহজ উপায় হতে পারে ঘুমানোর আগে কিছুক্ষণ ঠান্ডা পানিতে পা ডুবিয়ে রাখা। একটি পাত্রে স্বাভাবিক ঠান্ডা পানি, অথবা কয়েকটি বরফের টুকরা দিয়ে সামান্য ঠান্ডা করা পানিতে ১০ থেকে ৩০ মিনিট দুই পা ডুবিয়ে রাখুন। এতে শরীর ধীরে ধীরে শীতল হতে শুরু করে এবং অনেকের ক্ষেত্রে ঘুমের অনুভূতি তৈরি হতে পারে। যদিও এই পদ্ধতির কার্যকারিতা ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হতে পারে, তবু অনেকেই এতে স্বস্তি পান।
জীবনযাপনে পরিবর্তন আনা এবং স্বাস্থ্যকর অভ্যাস অনুসরণের পরও যদি চার থেকে ছয় সপ্তাহ অনিদ্রার সমস্যা না কমে, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসক বা স্লিপ স্পেশালিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ, অনেক সময় থাইরয়েডের সমস্যা, স্লিপ অ্যাপনিয়া, বিষণ্নতা, রেস্টলেস লেগ সিনড্রোমসহ বিভিন্ন শারীরিক বা মানসিক সমস্যার কারণেও অনিদ্রা হতে পারে।
ঘুমের ওষুধ বা স্লিপিং পিল চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন ব্যবহার করা উচিত নয়। সাময়িকভাবে এগুলো উপকার দিলেও দীর্ঘ মেয়াদে অভ্যাস তৈরি হওয়ার পাশাপাশি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
লেখক: খাদ্য ও পথ্যবিশেষজ্ঞ; প্রধান নির্বাহী, প্রাকৃতিক নিরাময় কেন্দ্র