সঙ্গীর নাক ডাকার শব্দ কেবল আপনার ঘুম নয় স্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতিকর, বলছে গবেষণা
শেয়ার করুন
ফলো করুন

একই বিছানায় ঘুমাচ্ছেন দুজন। একজন গভীর ঘুমে, আর অন্যজন বারবার পাশ ফিরছেন। কখনো কানে বালিশ চাপা দিচ্ছেন, কখনো সঙ্গীকে আলতো করে ধাক্কা দিয়ে কাত হয়ে শুতে বলছেন। ঘুম আসার পর আবার সেই পরিচিত শব্দ। রাত যত বাড়ে, বিরক্তিও তত বাড়তে থাকে। সকালে ঘুম থেকে উঠে মনে হতে পারে, সারারাত ঘুমিয়েও যেন ঠিকমতো বিশ্রাম হয়নি। মাথা ভার, শরীর ক্লান্ত, কাজে মন বসছে না। কারও কারও ক্ষেত্রে মেজাজও খিটখিটে হয়ে যেতে পারে। অনেকের কাছে এই অনুভূতি এতটাই তীব্র যে ঘুম থেকে ওঠার পর নিজেকে অনেকটা ‘হ্যাংওভারের মতো’ অবসন্ন মনে হয়।

নাক ডাকার শব্দে কেন ঘুম নষ্ট হয়?

ঘুমের সময় নাক ও গলার ওপরের শ্বাসনালির নরম টিস্যুতে কম্পন তৈরি হলে নাক ডাকার শব্দ হয়। একবার দুবার শব্দ হওয়া হয়তো বড় সমস্যা নয়। কিন্তু পুরো রাত ধরে বারবার সেই শব্দ চলতে থাকলে পাশের মানুষটির ঘুমের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা নষ্ট হতে পারে। ঘুমের সময় শরীর বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যায়। গভীর ঘুমের পর্যায়ে শরীর নিজেকে পুনরুদ্ধার করে। ঘুমের এক পর্যায়ে মস্তিষ্ক দিনের বিভিন্ন তথ্য প্রক্রিয়াজাত ও স্মৃতিতে সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করে। ঘুম বারবার ভেঙে গেলে এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। ফলে বিছানায় পর্যাপ্ত সময় কাটিয়েও সকালে সতেজ অনুভূতি না হতে পারে। মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হতে পারে, ভুলে যাওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে এবং দিনের কাজেও অনীহা তৈরি হতে পারে।

শুধু ক্লান্তি নয়, মেজাজেও প্রভাব পড়ে

এক রাতের খারাপ ঘুম হয়তো কোনোভাবে সামলে নেওয়া যায় কিন্তু দিনের পর দিন একই ঘটনা ঘটতে থাকলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। ঘুমের সঙ্গে মস্তিষ্কের চাপ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণেরও সম্পর্ক আছে। ঘুম নিয়মিতভাবে ব্যাহত হলে মানুষ আরও খিটখিটে হয়ে যেতে পারে, ছোট বিষয়েও বিরক্তি তৈরি হতে পারে এবং মানসিক চাপ সামলানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বিষয়টি সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। রাতে ঘুমের জন্য সঙ্গীকে বারবার জাগানো, বিরক্ত হওয়া বা আলাদা ঘরে গিয়ে ঘুমানোর প্রয়োজন তৈরি হওয়া থেকে ধীরে ধীরে দূরত্ব তৈরি হতে পারে। অথচ অনেক দম্পতি বছরের পর বছর নাক ডাকাকে ‘এমন তো হয়ই’ বলে এড়িয়ে যান।

বিজ্ঞাপন

আলাদা ঘরে ঘুমানো কি সমাধান?

কখনো কখনো ভালো ঘুম নিশ্চিত করার জন্য আলাদা ঘরে ঘুমানো প্রয়োজন হতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুম শরীর ও মস্তিষ্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়াকে সম্পর্কের সমস্যা হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। তবে শুধু আলাদা ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়লেই সমস্যার সমাধান হয় না, নাক ডাকার কারণটিও বোঝা জরুরি। কেউ কেউ কানে ইয়ারপ্লাগ ব্যবহার করে উপকার পেতে পারেন। আবার ঘুমের অবস্থান পরিবর্তন করেও নাক ডাকার মাত্রা কমতে পারে তবে দীর্ঘদিনের সমস্যা হলে কারণ অনুসন্ধান করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

নাক ডাকা আর স্লিপ অ্যাপনিয়া এক নয়

সব নাক ডাকাই স্লিপ অ্যাপনিয়ার লক্ষণ নয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে নাক ডাকার আড়ালে ঘুমের মধ্যে শ্বাস-প্রশ্বাসের গুরুতর সমস্যা থাকতে পারে। স্লিপ অ্যাপনিয়ায় ঘুমের মধ্যে বারবার শ্বাস বন্ধ হয়ে আবার শুরু হতে পারে। এর সঙ্গে জোরে নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে হঠাৎ দম বন্ধ হয়ে আসার মতো শব্দ, বারবার জেগে ওঠা এবং সকালে মাথাব্যথার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। সঙ্গীর ঘুমের মধ্যে এমন কিছু লক্ষ্য করলে বিষয়টি হালকাভাবে না নেওয়াই ভালো। কারণ শুধু নাক ডাকার শব্দ কমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা না করে এর পেছনে কোনো শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত সমস্যা আছে কি না, সেটি জানা প্রয়োজন।

নাক ডাকা কমাতে কী করা যায়?

সাধারণ নাক ডাকার ক্ষেত্রে জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন উপকারী হতে পারে। ওজন বেশি থাকলে তা কমানোর চেষ্টা, ধূমপান বন্ধ করা, ঘুমানোর আগে অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা এবং চিৎ হয়ে না শুয়ে কাত হয়ে ঘুমানোর মতো পরিবর্তন কিছু মানুষের ক্ষেত্রে নাক ডাকার মাত্রা কমাতে পারে। নাক বন্ধ থাকা বা অ্যালার্জির কারণেও নাক ডাকা বাড়তে পারে। তাই দীর্ঘদিনের সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজন অনুযায়ী নাকের বাধা বা অ্যালার্জির চিকিৎসা, বিশেষ ধরনের মুখের যন্ত্র কিংবা স্লিপ অ্যাপনিয়ার ক্ষেত্রে সিপ্যাপ যন্ত্রের মতো চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

সঙ্গীর নাক ডাকা নিয়ে কথা বলুন

নাক ডাকার বিষয়টি নিয়ে অনেক সময় সঙ্গীর সঙ্গে কথা বলতেও অস্বস্তি হয়। কেউ মনে করতে পারেন, এটি নিয়ে কথা বললে অপরজন অপমানিত হবেন। আবার যিনি নাক ডাকেন, তিনি নিজেও অনেক সময় বুঝতে পারেন না যে তার কারণে পাশের মানুষটির ঘুম কতটা নষ্ট হচ্ছে কিন্তু বিষয়টি নিয়ে অভিযোগের বদলে যত্নের জায়গা থেকে কথা বলা যেতে পারে। এখানে শুধু রাতের বিরক্তির বিষয় নেই, দুজনের ঘুম, সুস্থতা এবং সম্পর্কের বিষয়ও জড়িয়ে আছে। প্রতিদিন সকালে যদি একজন মানুষ ক্লান্ত হয়ে ওঠেন, কাজে মনোযোগ দিতে না পারেন, সহজেই বিরক্ত হয়ে যান কিংবা নিয়মিত ঘুমের ঘাটতিতে ভোগেন, তাহলে সমস্যাটিকে আর ছোট করে দেখার কারণ নেই।

নাক ডাকা হয়তো শোবার ঘরের একটি পরিচিত শব্দ। কিন্তু সেই শব্দ যদি কারও প্রতিদিনের জীবন থেকে স্বস্তির ঘুম কেড়ে নেয়, তাহলে সেটিকে মেনে নেওয়ার বদলে কারণ খুঁজে সমাধানের চেষ্টা করাই ভালো। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। কারণ ভালো ঘুম শুধু সকালে সতেজ হয়ে ওঠার জন্য নয়, সুস্থ শরীর, স্থির মেজাজ এবং সুন্দর সম্পর্কের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র: বিবিসি হেলথ

ছবি: পেকজেলসডটকম

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫: ০০
বিজ্ঞাপন