
খাবার শুধু শরীরের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করে না, দৈনন্দিন কর্মক্ষমতা ও ফিটনেস বজায় রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে কোন খাবার কখন খেলে বেশি উপকার পাওয়া যায়, তা নিয়ে প্রচলিত নানা ধারণা রয়েছে। কোনো খাবার খালি পেটে খাওয়া, রাতে নির্দিষ্ট খাবার এড়িয়ে চলা কিংবা ব্যায়ামের আগে-পরে খাদ্যাভ্যাস কেমন হওয়া উচিত—এসব বিষয়ে বিভ্রান্তিও কম নয়। পুষ্টিবিজ্ঞানের আলোকে জেনে নেওয়া যাক, প্রচলিত এসব ধারণার কোনগুলো সত্য, আর কোনগুলো নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন।

রাতভর ঘুমের পর শরীরকে দিনের কাজের জন্য প্রস্তুত করতে সুষম সকালের নাশতা সহায়ক হতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা নিয়মিত ব্যায়াম করেন, তাঁদের জন্য দিনের শুরুতে পর্যাপ্ত প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট ও ফাইবার গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। আপেল, কলা, ওটস, ডিম, দই কিংবা বাদাম সকালের নাশতায় রাখা যেতে পারে।
আপেলে থাকা ফাইবার হজমের স্বাভাবিকতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। তবে আপেল খালি পেটে খেতেই হবে, এমন কোনো বৈজ্ঞানিক নিয়ম নেই। যাঁদের খালি পেটে ফল খেলে অস্বস্তি হয়, তাঁরা অন্য খাবারের সঙ্গে ফল খেতে পারেন।
দই প্রোটিন ও ক্যালসিয়ামের ভালো উৎস। জীবিত উপকারী ব্যাকটেরিয়াযুক্ত দই অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্যও সহায়ক হতে পারে। সকালের নাশতা, দুপুরের খাবার কিংবা ব্যায়ামের পরের খাবারের অংশ হিসেবে দই খাওয়া যায়।

যাঁরা পেশি গঠনে আগ্রহী, তাঁরা প্রোটিনসমৃদ্ধ দইয়ের সঙ্গে ফল, ওটস বা অল্প পরিমাণ বাদাম মিশিয়ে খেতে পারেন। তবে দই খাওয়ার নির্দিষ্ট কোনো সেরা সময় নেই। ব্যক্তিগত সহনশীলতা ও দৈনিক পুষ্টির চাহিদাই এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

দুধে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান রয়েছে। সকালে কিংবা রাতে—দুই সময়েই দুধ পান করা যায়। রাতে হালকা গরম দুধ পান করলে কারও কারও আরাম লাগতে পারে, তবে দুধ খেলেই ঘুম ভালো হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
ফিটনেসের ক্ষেত্রে দুধ একটি সহজলভ্য প্রোটিনের উৎস। ব্যায়ামের পর দুধ ও কলা দিয়ে তৈরি পানীয় শরীরে প্রোটিন ও কার্বোহাইড্রেট সরবরাহ করতে পারে। তবে ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা থাকলে ল্যাকটোজমুক্ত দুধ বা বিকল্প খাবার বেছে নেওয়া ভালো।
কাঠবাদাম, কাজুবাদাম, আখরোট ও অন্যান্য বাদামে স্বাস্থ্যকর ফ্যাট, কিছু প্রোটিন, ফাইবার এবং বিভিন্ন খনিজ উপাদান থাকে। সকালের নাশতায় কিংবা দিনের অন্য সময়ে অল্প পরিমাণ বাদাম খাওয়া যেতে পারে।

শুকনো ফলে প্রাকৃতিক চিনি ও ক্যালরি তুলনামূলক ঘনভাবে থাকে। তাই ওজন কমানোর চেষ্টা করলে পরিমাণের দিকে খেয়াল রাখা জরুরি। বাদাম খেলেই রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকবে, এমন নয়<bha>;</bha> বরং সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস, খাবারের পরিমাণ ও শারীরিক সক্রিয়তা এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ডার্ক চকোলেটে ফ্ল্যাভানলসহ কিছু অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান থাকতে পারে। তবে সব ডার্ক চকোলেটে এসব উপাদানের পরিমাণ সমান নয়। অল্প পরিমাণে খাওয়া যেতে পারে, কিন্তু ভারী খাবারের পর ডার্ক চকোলেট খেলে হজম ভালো হয়, এমন শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
যাঁদের অ্যাসিড রিফ্লাক্স বা বুকজ্বালার সমস্যা আছে, তাঁদের ক্ষেত্রে চকোলেট উপসর্গ বাড়াতে পারে। তাই নিজের শরীরের প্রতিক্রিয়া বুঝে খাবার নির্বাচন করা উচিত।
কলা নিয়ে প্রচলিত একটি ধারণা হলো, খালি পেটে কলা খেলে শরীরে পটাশিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামের ভারসাম্য নষ্ট হয়। সাধারণত সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে এ ধারণার পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

কলা পটাশিয়াম, কার্বোহাইড্রেট ও ভিটামিন বি৬-এর উৎস। ব্যায়ামের আগে সহজলভ্য শক্তির জন্য কলা কার্যকর হতে পারে। আবার ব্যায়ামের পর দই বা দুধের সঙ্গে কলা খেলে কার্বোহাইড্রেট ও প্রোটিন—দুই ধরনের পুষ্টিই পাওয়া যায়। তবে কিডনির নির্দিষ্ট সমস্যা থাকলে পটাশিয়াম গ্রহণের বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন হতে পারে।

অনেকেই ঘুম থেকে উঠেই কফি পান করেন। সুস্থ অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য পরিমিত কফি সাধারণত গ্রহণযোগ্য। তবে খালি পেটে কফি পান করলে কারও কারও অম্বল, বুকজ্বালা, পেটের অস্বস্তি বা অস্থিরতা বাড়তে পারে। যাঁদের এমন সমস্যা হয়, তাঁরা নাশতার পরে কফি পান করতে পারেন।
ফিটনেসের জন্য কফি ব্যবহার করলে মনে রাখতে হবে, ক্যাফেইন সাময়িকভাবে সতর্কতা ও ব্যায়ামের কর্মক্ষমতা বাড়াতে পারে, কিন্তু এটি ঘুমের বিকল্প নয়। বিকেল বা সন্ধ্যায় ক্যাফেইন গ্রহণ ঘুমের মানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ওজন নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলোর একটি হলো, রাতে ভাত খেলেই মেদ জমে। বাস্তবে ওজন বাড়া বা কমার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি মোট ক্যালরি গ্রহণ, শারীরিক পরিশ্রম, ঘুম ও খাদ্যাভ্যাসের সম্পর্ক রয়েছে। ভাত নিজে থেকেই রাতে ক্ষতিকর হয়ে যায় না।

বাংলাদেশের খাদ্যাভ্যাসে ভাত একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তির উৎস। তাই রাতের খাবার থেকে ভাত পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং পরিমাণ অনুযায়ী ভাতের সঙ্গে মাছ, ডিম, মুরগি বা ডাল এবং পর্যাপ্ত সবজি রাখুন। রাতে অতিরিক্ত খাওয়া এবং ঘুমানোর ঠিক আগে ভারী খাবার গ্রহণ এড়িয়ে চলা অনেকের জন্য উপকারী হতে পারে।
বিশেষ করে যাঁরা নিয়মিত জিম করেন, তাঁদের শরীরের শক্তির চাহিদা অনুযায়ী কার্বোহাইড্রেট গ্রহণ করা দরকার। পেশি গঠন কিংবা ব্যায়ামের পর পুনরুদ্ধারের জন্যও কার্বোহাইড্রেট গুরুত্বপূর্ণ।

লেবু, কমলা ও অন্যান্য সাইট্রাস ফলে ভিটামিন সি থাকে। খালি পেটে এসব ফল খাওয়া সবার জন্য ক্ষতিকর নয়। তবে যাঁদের গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স বা অ্যাসিড রিফ্লাক্সের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে টক ফল বা লেবুর রস উপসর্গ বাড়াতে পারে।
এ ক্ষেত্রে খাবারের সময়ের চেয়ে ব্যক্তিগত সহনশীলতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। টক ফল খেলে অস্বস্তি হলে খাবারের সঙ্গে বা অন্য সময়ে অল্প পরিমাণে খেয়ে দেখা যেতে পারে। সমস্যা নিয়মিত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

টমেটো ভিটামিন সি, পটাশিয়াম ও লাইকোপিনের উৎস। রাতে টমেটো খেলে সবার অ্যাসিডিটি হয় কিংবা ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে, এমন কোনো সর্বজনীন নিয়ম নেই।
তবে যাঁদের অ্যাসিড রিফ্লাক্স রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে টমেটো বা টমেটোভিত্তিক খাবার অস্বস্তি বাড়াতে পারে। সে ক্ষেত্রে নিজের উপসর্গ পর্যবেক্ষণ করে খাবারের পরিমাণ ও সময় নির্ধারণ করাই ভালো।

সুস্থ শরীর, ভালো কর্মক্ষমতা ও ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য কয়েকটি অভ্যাস অনুসরণ করা যেতে পারে—
১. নিয়মিত সময়ে খাবার খান: প্রতিদিনের কাজ, ক্ষুধা ও ব্যায়ামের সময় অনুযায়ী খাবারের একটি বাস্তবসম্মত রুটিন তৈরি করুন।
২. প্রধান খাবারে প্রোটিন রাখুন: ডিম, মাছ, মুরগি, দুধ, দই, ডাল ও অন্যান্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার পেশি গঠন ও পুনরুদ্ধারে সহায়ক।
৩. কার্বোহাইড্রেটকে ভয় পাবেন না: ভাত, রুটি, ওটস, আলু ও ফল শরীরকে শক্তি দেয়। প্রয়োজন অনুযায়ী পরিমাণ নির্ধারণ করুন।
৪. ব্যায়ামের আগে ও পরে খাবারের পরিকল্পনা করুন: ব্যায়ামের আগে সহজপাচ্য খাবার এবং পরে প্রোটিন ও কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবার উপকারী হতে পারে। তবে খাবারের সুনির্দিষ্ট সময় ব্যক্তির ব্যায়ামের ধরন ও সহনশীলতার ওপর নির্ভর করে।
৫. পর্যাপ্ত পানি পান করুন: শরীরের পানির চাহিদা পূরণ করুন। বিশেষ করে গরম আবহাওয়ায় ও ঘাম ঝরানো ব্যায়ামের সময় পানির দিকে বাড়তি নজর দিন।
৬. ঘুমানোর আগে অতিরিক্ত ভারী খাবার এড়িয়ে চলুন: বিশেষ করে অ্যাসিড রিফ্লাক্স থাকলে শোয়ার প্রায় তিন ঘণ্টা আগে রাতের খাবার শেষ করা উপকারী হতে পারে।
৭. অতিরিক্ত কঠোর খাদ্যনিয়ম চাপিয়ে দেবেন না: কোনো খাবার শুধু নির্দিষ্ট সময়ে খেলেই উপকার হবে কিংবা অন্য সময়ে খেলেই ক্ষতি হবে—এমন ধারণা সব খাবারের ক্ষেত্রে সত্য নয়।
ফিটনেস মানে শুধু জিমে গিয়ে ব্যায়াম করা কিংবা ওজন কমানো নয়। পর্যাপ্ত পুষ্টি, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, ভালো ঘুম এবং টেকসই খাদ্যাভ্যাস—সবকিছুর সমন্বয়েই গড়ে ওঠে সুস্থ জীবন।
আপেল, কলা, ভাত, দুধ, দই কিংবা টমেটোর মতো সাধারণ খাবারকে অকারণে ভালো বা খারাপের তালিকায় ফেলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং সুষম খাবার, উপযুক্ত পরিমাণ, ব্যক্তিগত সহনশীলতা এবং নিয়মিত জীবনযাপন—এই চারটি বিষয়কে গুরুত্ব দিন। কারণ সুস্থ থাকার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ভয়ভিত্তিক খাদ্যনিয়ম নয়, বরং বিজ্ঞানসম্মত ও বাস্তবসম্মত অভ্যাস গড়ে তোলা।
তথ্যসূত্র: ফিট টু ডে
ছবি: পেকজেলসডটকম