
গতকাল বুধবার থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে খুলনায় রান্না করা গরুর মাংস সবুজ রং ধারণ করার ভিডিও ও ছবি। মুহূর্তেই ঘটনাটি ভাইরাল হয়ে যায়। কেউ বিষয়টি নিয়ে মজা করছেন, কেউ আবার নানা ধরনের ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। অনেকেই দাবি করছেন, এটি ছত্রাকের কারণে হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়নি। তাই নিশ্চিতভাবে কারণ নির্ধারণের সুযোগ নেই।

খাদ্যনিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, রান্নার সময় বা রান্নার পর গরুর মাংস সবুজাভ হয়ে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। সব ক্ষেত্রেই যে ছত্রাক দায়ী, তা–ও নয়। কোনো পরীক্ষাগারের বিশ্লেষণ ছাড়া শুধু ছবি বা ভিডিও দেখে মাংসের রং পরিবর্তনের প্রকৃত কারণ বলা বৈজ্ঞানিকভাবে সম্ভব নয়।

কাঁচা বা রান্না করা মাংস সবুজ হয়ে যাওয়ার সবচেয়ে সাধারণ কারণ ছত্রাক নয়; বরং ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি, পচন, রাসায়নিক পরিবর্তন অথবা সংরক্ষণের ত্রুটি। ছত্রাক বা ইংরেজিতে মোল্ড সাধারণত মাংসের উপরিভাগে তুলার মতো সাদা, সবুজ, নীল বা কালো আবরণ তৈরি করে। তবে ছত্রাক সংক্রমণ যদি অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়, তাহলে তা মাংসের গভীর স্তরেও প্রবেশ করতে পারে। এ ধরনের মাংস কখনোই খাওয়া নিরাপদ নয়।

খাদ্যবিজ্ঞানীদের মতে, কিছু ছত্রাক সবুজ বা নীল-সবুজ স্পোর তৈরি করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পেনিসিলিয়াম প্রজাতি, এস্পারগিলাসের প্রজাতি ও ক্ল্যাডোস্পোরিয়ামের কিছু প্রজাতি। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, শুধু সবুজ রং দেখেই কোনো নির্দিষ্ট ছত্রাক শনাক্ত করা সম্ভব নয়। ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হয়।
মাংসে সিউডোমোনাস জাতীয় ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধি পেলে সবুজাভ বা ইরিডিসেন্ট (রংধনুর মতো ঝিলমিল) বর্ণ দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে রেফ্রিজারেশনের তাপমাত্রায় দীর্ঘদিন সংরক্ষিত মাংসে এই ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধি পেতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে ল্যাকটোব্যাসিলাস ও অন্যান্য পচন সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়াও মাংসের রং পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিচের ভুলগুলো করলে মাংস নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়
• জবাইয়ের পর দ্রুত ঠান্ডা না করা।
• দীর্ঘ সময় কক্ষের তাপমাত্রায় রেখে দেওয়া।
• ফ্রিজের তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে না রাখা।
• বারবার ফ্রিজ থেকে বের করে আবার সংরক্ষণ করা।
• কাঁচা মাংস দীর্ঘদিন ফ্রিজে রেখে দেওয়া।
• ফ্রিজারে সংরক্ষণের সময় বায়ুরোধী প্যাকেজিং ব্যবহার না করা।
• বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার কারণে বারবার তাপমাত্রার ওঠানামা হওয়া।

সবুজ রং দেখা মানেই যে মাংস রান্নার সময় নষ্ট হয়েছে, এমন নয়। কয়েকটি কারণে রান্নার পরও সবুজাভ রং দেখা দিতে পারে।
১. রঙের রাসায়নিক পরিবর্তন: মাংসের মায়োগ্লোবিন নামের রঞ্জক অক্সিজেন, তাপ ও বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়ার কারণে রং পরিবর্তন করতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এটি সবুজাভ আভা তৈরি করতে পারে।
২. ধাতব পাত্রের প্রতিক্রিয়া: অ্যাসিডিক উপাদান (যেমন টমেটো বা ভিনেগার) এবং কিছু ধাতব পাত্রের পারস্পরিক বিক্রিয়ায় বিরল ক্ষেত্রে রঙের পরিবর্তন হতে পারে।
৩. মাংস আগে থেকেই নষ্ট ছিল: সংরক্ষণের সময় ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাকের বৃদ্ধি শুরু হয়ে থাকলে রান্নার পর সেই পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হয়ে দেখা দিতে পারে। রান্নার তাপ সব ধরনের বিষাক্ত টক্সিন ধ্বংস করতে পারে না।
নিচের লক্ষণগুলোর যেকোনোটি থাকলে মাংস খাওয়া উচিত নয়-
• সবুজ, নীল বা কালো দাগ।
• পিচ্ছিল বা আঠালো অনুভূতি।
• দুর্গন্ধ বা টক গন্ধ।
• তুলার মতো ছত্রাকের আবরণ।
• অস্বাভাবিক বিবর্ণতা।
• দীর্ঘ সময় সঠিক তাপমাত্রার বাইরে থাকা।

• কেনার পর যত দ্রুত সম্ভব ফ্রিজে রাখুন।
• ৪°ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার কম তাপমাত্রায় রেফ্রিজারেটরে সংরক্ষণ করুন।
• দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের জন্য -১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার নিচে তাপমাত্রায় ফ্রিজারে রাখুন।
• কাঁচা মাংস আলাদা পাত্রে রাখুন, যাতে অন্য খাবার দূষিত না হয়।
• গলানোর জন্য ঘরের তাপমাত্রা নয়, রেফ্রিজারেটর ব্যবহার করুন।
• একবার গলে যাওয়া মাংস বারবার জমিয়ে রাখা থেকে বিরত থাকুন।
শুধু রং দেখে কোনো মাংস নিরাপদ কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। আবার সবুজাভ রংকে স্বাভাবিক বলেও ধরে নেওয়া ঠিক নয়। যদি রং পরিবর্তনের সঙ্গে দুর্গন্ধ, পিচ্ছিল ভাব বা ছত্রাকের উপস্থিতি দেখা যায়, তাহলে সেই মাংস খাওয়া থেকে বিরত থাকাই নিরাপদ। প্রয়োজনে নমুনা পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা উচিত। কোনো মাংস সবুজ হওয়ার প্রকৃত কারণ ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া নাকি রাসায়নিক পরিবর্তন, তা নিশ্চিত করতে মাইক্রোবায়োলজিক্যাল ও ল্যাবরেটরি বিশ্লেষণের বিকল্প নেই।
তথ্যসূত্র :
১. United States Department of Agriculture (USDA) Food Safety and Inspection Service -Color of Meat and Poultry এবং Molds on Food: Are They Dangerous?
২. U.S. Food and Drug Administration (FDA) -Foodborne Illness & Safe Food Handling Guidelines
৩. Centers for Disease Control and Prevention (CDC) -Food Safety
৪. Food Standards Agency (UK) -Food Storage and Use-by Date Guidance
৫. Penn State Extension -Understanding Meat Color Changes
৬. Jay, J. M., Loessner, M. J. & Golden, D. A. Modern Food Microbiology (Springer)
৭. Adams, M. R. & Moss, M. O. Food Microbiology (Royal Society of Chemistry)
ছবি: এআই
ভিডিও: প্রথম আলো