
অনেক কিছু আমরা জানতে চাইনা। ট্যাবু ভেবে এড়িয়ে যাই। সেক্স এডুকেশন বা যৌন শিক্ষা এর একটি। এই বিষয়ে অসেচনতা, অসাবধানতা ও অজ্ঞানতার ফলে বহু কিশোর-কিশোরীর জীবনে হয়ে যায় বড় ক্ষতি। কম বয়সে যৌনসম্পর্কের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানামুখী মারাত্মক বিপদ।

অথচ সমাজে এই নেতিবাচক প্রবণতার উপস্থিতি অস্বীকার করার উপায় নেই। সম্প্রতি জানা যাচ্ছে, কম বয়সে প্রথম যৌনসম্পর্কের সঙ্গে দ্রুততর বার্ধক্য, কম আয়ুষ্কাল ও বয়সের সঙ্গে সঙ্গে নানা অসুস্থতা ও শারীরিক দুর্বলতার সম্পর্ক আছে। চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য উঠে এসেছে নতুন এক জেনেটিক গবেষণায়। চীনের শানডং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা এই গবেষণা করেছেন। গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে ইউরেকালার্ট–এ।
তবে এর অর্থ এই নয় যে কম বয়সে যৌনসম্পর্কে জড়ালেই একজন মানুষের শরীর দ্রুত বুড়িয়ে যাবে। গবেষকেরা এমন কিছু জেনেটিক প্রবণতা বিশ্লেষণ করেছেন, যেগুলোর সঙ্গে কম বয়সে প্রথম যৌনসম্পর্ক এবং পরবর্তী জীবনের বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত ফলাফলের সম্পর্ক আছে। গবেষণায় ‘মেন্ডেলিয়ান র্যান্ডমাইজেশন’ নামের একটি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।

মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে থাকা জেনেটিক পার্থক্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে কোনো একটি বিষয় অন্য একটি বিষয়ের ওপর সম্ভাব্য কারণগত প্রভাব ফেলছে কি না, তা বোঝার চেষ্টা করা হয় এই পদ্ধতিতে। গবেষকেরা প্রথম যৌনসম্পর্কের বয়সের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য, আয়ুষ্কাল এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে শারীরিক দুর্বলতার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেন।
দ্রুততর বার্ধক্যের ইঙ্গিত
গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব মানুষের জেনেটিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে তুলনামূলক কম বয়সে প্রথম যৌনসম্পর্কের প্রবণতার সম্পর্ক রয়েছে, তাঁদের পরবর্তী জীবনে বার্ধক্যের বিভিন্ন সূচক তুলনামূলক কম অনুকূল ছিল। অর্থাৎ বয়স বাড়ার সঙ্গে শরীর ও স্বাস্থ্যের বিভিন্ন দিকের অবনতির ঝুঁকি তাঁদের মধ্যে বেশি দেখা গেছে। এখানে বার্ধক্য বলতে শুধু চেহারায় বয়সের ছাপ পড়াকে বোঝানো হয়নি। গবেষকেরা শারীরিক সক্ষমতা, দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য এবং সুস্থভাবে বেঁচে থাকার সময়—এসব বিষয়ও বিবেচনায় নিয়েছেন।

আয়ুষ্কাল ও সুস্থভাবে বেঁচে থাকার সময়
কম বয়সে প্রথম যৌনসম্পর্কের প্রবণতার সঙ্গে অপেক্ষাকৃত কম আয়ুষ্কাল এবং ‘হেলথস্প্যান’ বা সুস্থভাবে বেঁচে থাকার সময় কম হওয়ার সম্পর্কও পাওয়া গেছে। অর্থাৎ শুধু একজন মানুষ কত বছর বেঁচে থাকছেন, তা নয়; জীবনের কতটা সময় ভালো স্বাস্থ্য ও শারীরিক সক্ষমতার সঙ্গে কাটাতে পারছেন, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
বয়স বাড়লে শারীরিক দুর্বলতার ঝুঁকি
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, কম বয়সে প্রথম যৌনসম্পর্কের সঙ্গে সম্পর্কিত জেনেটিক প্রবণতা থাকা ব্যক্তিদের পরবর্তী জীবনে শারীরিক দুর্বলতার হার বেশি হতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতা কমে যাওয়া, শারীরিক শক্তি ও কর্মক্ষমতা হ্রাসসহ বিভিন্ন বিষয়কে শারীরিক দুর্বলতার আওতায় বিবেচনা করা হয়।

কেন এমন সম্পর্ক দেখা গেল?
এই সম্পর্কের পেছনে কী কাজ করতে পারে, তা বোঝার জন্য গবেষকেরা ১৪৫টি সম্ভাব্য জৈবিক ও আচরণগত কারণ বিশ্লেষণ করেন। এর মধ্যে ৩৪টি গুরুত্বপূর্ণ কারণ শনাক্ত করা হয়েছে। গবেষকদের বিশ্লেষণে বিশেষভাবে উঠে এসেছে বিষণ্নতা, আবেগপ্রবণ আচরণ এবং ধূমপানজনিত ফুসফুসের রোগের ঝুঁকি। অর্থাৎ কম বয়সে যৌনসম্পর্কের সঙ্গে তুলনামূলক খারাপ বার্ধক্যের সম্পর্কের পেছনে যৌনসম্পর্ক একমাত্র কারণ—এমনটা গবেষণাটি বলছে না। বরং মানসিক স্বাস্থ্য, আচরণ ও জীবনযাপনের বিভিন্ন বিষয়ও এই সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। যেমন, কম বয়সে যৌনসম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত কিছু সামাজিক বা আচরণগত পরিস্থিতি কারও মধ্যে বিষণ্নতা, ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ কিংবা ধূমপানের মতো অভ্যাসের সম্ভাবনা বাড়াতে পারে। আবার এসব বিষয়ই পরবর্তী জীবনে স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
গবেষণার ফল কীভাবে দেখবেন?
এই গবেষণার ফলকে ‘কম বয়সে যৌনসম্পর্ক মানেই দ্রুত বুড়িয়ে যাওয়া’—এমন সরল বার্তা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। গবেষকেরা জেনেটিক তথ্য ব্যবহার করে সম্ভাব্য কারণগত সম্পর্ক অনুসন্ধান করেছেন। মানুষের স্বাস্থ্য ও বার্ধক্য অত্যন্ত জটিল বিষয়। এর সঙ্গে জিনগত বৈশিষ্ট্য, শৈশবের অভিজ্ঞতা, মানসিক স্বাস্থ্য, আর্থসামাজিক পরিস্থিতি, খাদ্যাভ্যাস, ঘুম, শরীরচর্চা, ধূমপানসহ নানা বিষয় জড়িত। গবেষকেরাও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ও জীবনযাপনের গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন। জেনেটিক বৈশিষ্ট্য ও শৈশবের নানা অভিজ্ঞতা মানুষের স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য ও জীবনমান গঠনে ব্যক্তির জীবনযাপন ও আচরণও গুরুত্বপূর্ণ।

গবেষণাটি প্রথম যৌনসম্পর্কের বয়সের সঙ্গে পরবর্তী জীবনের স্বাস্থ্যগত বিভিন্ন সূচকের সম্পর্ক নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এই সম্পর্কের প্রকৃতি আরও ভালোভাবে বুঝতে ভবিষ্যতে আরও গবেষণার প্রয়োজন। তবে এই প্রাথমিক ধারণা থেকে এটুকু বলা যায় যে কম বয়সে প্রথম যৌন অভিজ্ঞতার কুফল দীর্ঘমেয়াদী হতে পারে। আর সেই সঙ্গে আরও নানা ক্ষতি ও বিপদের ঝুঁকি তো থাকেই। তাই ট্যাবু হিসেবে না নিয়ে এ নিয়ে কথা বলা উচিত ও সচেতনতা তৈরি করা উচিত সবার মাঝে।
সূত্র: ইউরেকালার্ট, সেজ জার্নালস
ছবি: পেকজেলস, এআই