
অনেক সময় আমরা বুঝতেই পারি না, প্রতিদিনের খাদ্যতালিকার বড় একটি অংশই এমন খাবারে ভরে যাচ্ছে, যেখানে প্রাকৃতিক উপাদানের চেয়ে বেশি থাকে সংরক্ষণকারী, ঘন করার উপাদান, কৃত্রিম স্বাদ ও রঙ। তবে সুস্থভাবে খাওয়ার জন্য সবকিছু একদিনে বদলে ফেলতে হবে না। রান্নাঘরে ছোট কয়েকটি পরিবর্তনই ধীরে ধীরে আপনাকে আল্ট্রা-প্রসেসড খাবারের ওপর নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করতে পারে।

গরমের দিনে আইসক্রিম খেতে কার না ভালো লাগে? কিন্তু বাজারের অনেক আইসক্রিমেই থাকে নানা ধরনের ইমালসিফায়ার, স্ট্যাবিলাইজার ও সংরক্ষণকারী উপাদান। এর বদলে বাড়িতেই তৈরি করা যায় স্বাস্থ্যকর আইসক্রিম।
অতিরিক্ত পেকে যাওয়া কলা ফ্রিজে রেখে পরে কোকো পাউডারের সঙ্গে ব্লেন্ড করে নিলেই তৈরি হয়ে যায় মোলায়েম চকলেট আইসক্রিম। চাইলে এর সঙ্গে যোগ করা যায় চিনাবাদামের মাখন বা দই। এতে খাবারের অপচয়ও কমবে, আবার প্রাকৃতিক মিষ্টিও পাওয়া যাবে।

সকালের নাস্তায় ব্যাগেল অনেকেরই পছন্দ। কিন্তু বাজারের অনেক ব্যাগেলে অতিরিক্ত চিনি ও নানা সংযোজক উপাদান থাকে। অথচ মাত্র দুটি উপকরণ সেলফ-রেইজিং ময়দা ও দই দিয়েই সহজে তৈরি করা যায় নরম ব্যাগেল কিংবা বিস্কুট । এয়ার ফ্রায়ার বা ওভেনে মাত্র বিশ মিনিট বেক করলেই প্রস্তুত। দই থাকার কারণে এতে ক্যালসিয়াম ও প্রোটিনও যোগ হয়, যা হাড় ও পেশির জন্য উপকারী।

এক বোতল টমেটো সস কিনে রাখা সহজ। কিন্তু অনেক তৈরি সসে বাড়তি চিনি, ঘন করার উপাদান ও সংরক্ষণকারী থাকে। এর বদলে অলিভ অয়েল বা সামান্য তেলে পেঁয়াজ ও রসুন ভেজে তাতে টমেটো পিউরি বা কুচানো টমেটো দিয়ে কয়েক মিনিট রান্না করলেই তৈরি হয়ে যায় টাটকা সস। শুকনো বা তাজা হার্বস যোগ করলে স্বাদ আরও বেড়ে যায়। শুধু পাস্তা নয়, পিজা, স্যান্ডউইচ কিংবা নানা রান্নাতেও ব্যবহার করা যায় এই সস।

তাজা সবজি আর মুরগি বা টোফু দিয়ে স্বাস্থ্যকর স্টির-ফ্রাই রান্না করলেন। কিন্তু শেষে যদি প্যাকেটজাত সস ঢেলে দেন, তাহলে সেই স্বাস্থ্যকর রান্নায়ও যোগ হতে পারে অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও নানা সংযোজক উপাদান।
এর বদলে সয়া সস, সামান্য মধু, তিলের তেল আর কুচানো রসুন একসঙ্গে মিশিয়ে তৈরি করুন নিজের সস। স্বাদেও থাকবে ভারসাম্য, আবার অপ্রয়োজনীয় উপাদান থেকেও দূরে থাকা যাবে।

কাজের ফাঁকে বা সিনেমা দেখতে বসলে অনেকেই চিপসের প্যাকেট খুলে ফেলেন। তবে ঘরেই যদি ভুট্টার দানা দিয়ে পপকর্ন বানিয়ে নেওয়া যায়, তাহলে তা হতে পারে আরও ভালো বিকল্প। সামান্য তেল বা মাখন দিয়ে ভুট্টার দানা ফাটিয়ে নিলেই তৈরি। পপকর্নে রয়েছে আঁশ ও পলিফেনল, যা হজম ও হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। তবে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের পপকর্ন না দেওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা, কারণ এতে শ্বাসরোধের ঝুঁকি থাকে।

বাজারে প্রোটিন বা গ্র্যানোলা বার কিনতে গেলে স্বাস্থ্যকর মনে হলেও অনেক সময় সেগুলোতেও থাকে অতিরিক্ত চিনি ও সংযোজক উপাদান। অথচ বাড়িতেই সহজে তৈরি করা যায় পুষ্টিকর ওটস বার। ওটসের সঙ্গে কুচানো বাদাম, শুকনো ফল, চিনাবাদামের মাখন, মধু কিংবা চটকানো কলা মিশিয়ে ওভেনে বেক করলেই তৈরি। এটি সকালে নাস্তা, অফিসের টিফিন বা ভ্রমণের সঙ্গী হিসেবেও দারুণ।

আজকের ব্যস্ত জীবনে সম্পূর্ণভাবে আল্ট্রা-প্রসেসড খাবার এড়িয়ে চলা অনেকের পক্ষেই সম্ভব নয়। পুষ্টিবিদদের মতে, লক্ষ্য হওয়া উচিত সবকিছু বাদ দেওয়া নয়, বরং ধীরে ধীরে ভালো খাবারের পরিমাণ বাড়ানো। যেমন—
একদিন আইসক্রিমের বদলে ফল দিয়ে তৈরি ফ্রোজেন ডেজার্ট।
একদিন প্যাকেটের সসের বদলে ঘরে তৈরি সস।
একদিন চিপসের বদলে পপকর্ন।
এই ছোট ছোট পরিবর্তনই দীর্ঘমেয়াদে বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে।

অনেকেই মনে করেন, স্বাস্থ্যকর খাবার মানেই অনেক সময়, অনেক খরচ আর কঠিন রেসিপি। আসলে বিষয়টি ঠিক উল্টো হতে পারে। রান্নাঘরে থাকা কয়েকটি সাধারণ উপকরণ দিয়েই তৈরি করা যায় এমন অনেক খাবার, যেগুলো যেমন সুস্বাদু, তেমনি কম প্রক্রিয়াজাত। শেষ পর্যন্ত সুস্থ জীবন মানে সব প্রিয় খাবারকে বিদায় জানানো নয়। বরং এমন কিছু ছোট সিদ্ধান্ত নেওয়া, যা প্রতিদিনের খাবারকে একটু একটু করে আরও প্রাকৃতিক, আরও পুষ্টিকর এবং আরও নিজের করে তোলে। হয়তো পরিবর্তনের শুরুটা হতে পারে খুব সাধারণ একটি কাজ দিয়ে—আজ বাজার থেকে আরেক বোতল সস না কিনে, নিজের রান্নাঘরেই একটি টাটকা টমেটো সস বানিয়ে ফেলা।
সূত্র: বিবিসি হেলথ