
মনোচিকিৎসক ও লাইফ কোচদের মতে, এর পেছনে ব্যক্তিগত মানসিকতার পাশাপাশি কাজের সংস্কৃতিও বড় ভূমিকা রাখে। কম ঘুম, অতিরিক্ত কাজ আর ব্যস্ততাকে এখন অনেক সময় সাফল্যের প্রতিক বা মূল্য হিসেবে দেখা হয়। ফলে ক্লান্তি শরীরের সতর্কবার্তা না হয়ে ব্যক্তিগত দুর্বলতা বলে মনে হতে পারে।

বিশ্রাম নিতে অপরাধবোধে ভোগা যে শুধু ব্যক্তিগত অভ্যাস নয়, সাম্প্রতিক কিছু গবেষণাতেও তার ইঙ্গিত মিলেছে। ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপের গবেষকদের একটি গবেষণায় ‘লেজার গিল্ট’ বা অবসর কাটানোর সময় অপরাধবোধকে আলাদা একটি মানসিক প্রবণতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। চারটি গবেষণায় দেখা যায়, অবসর সময়েও অনেকের মনে হয় তাঁরা যথেষ্ট ‘প্রোডাক্টিভ’ বা কর্মক্ষম নন। এই অপরাধবোধ বেশি থাকলে বিশ্রামে থেকেও মানসিক স্বস্তি পাওয়া সম্ভব নয়।

২০২১ সালের আরেকটি গবেষণাতেও প্রায় একই চিত্র উঠে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের রাটগার্স ইউনিভার্সিটি, ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটি ও হার্ভার্ডের গবেষকেরা দেখেছেন, অবসরকে ‘সময় নষ্ট’ বা কম গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করলে সেই সময়টুকু উপভোগ করাও কঠিন হয়ে পড়ে। অর্থাৎ বিশ্রাম বা ছুটির সময় মনে হতে পারে, সময়টা বুঝি অন্য কোনো কাজে দেওয়া উচিত ছিল।
জার্মান মনোবিজ্ঞানী সাবিনে জোনটাগের দীর্ঘদিনের গবেষণায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। কাজ শেষে শুধু অফিস থেকে বেরিয়ে আসাই যথেষ্ট নয়; কাজের চিন্তা থেকেও মানসিকভাবে কিছুটা দূরে সরে আসতে হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, কাজের চাপ বাড়লে মানসিকভাবে কাজ থেকে দূরে থাকা সম্ভব হয় না। ফলে ক্লান্তি ও মানসিক চাপ বাড়ে। এখানেই তৈরি হয় এক ধরনের বৈপরীত্য। অতিরিক্ত কাজের সময়েই শরীর ও মনের বেশি বিশ্রাম প্রয়োজন। অথচ তখনই কাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া সবচেয়ে কঠিন হয়ে পড়ে। ফোনের নোটিফিকেশন, ই-মেইল, ম্যাসেজের মাধ্যমে কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকা। অর্থাৎ সবসময় হাতের ব্যস্ত থাকা বা কাজের সব আপডেট নিয়ে সচেতন থাকার ফলে এই সমস্যা আরও বেড়ে যায়।

তাই ক্লান্ত বোধ করা বা বিশ্রাম নিতে চাওয়া মানেই কেউ অলস, বিষয়টি এমন নয়। এর পেছনে এমন একটি কর্মসংস্কৃতিও কাজ করতে পারে, যেখানে অতিরিক্ত ব্যস্ততাকে গুরুত্বের লক্ষণ এবং সবসময় কাজের জন্য প্রস্তুত থাকাকে দায়িত্বশীলতার প্রমাণ হিসেবে দেখা হয়। ফলে একটু থামলেই মনে হয়, এই বুঝি পিছিয়ে পড়ছি।

অনেক কর্মক্ষেত্রে কাজের ফলাফলের চেয়ে একজন কর্মী কতক্ষণ অনলাইনে থাকছেন, কত রাত পর্যন্ত কাজ করছেন বা কত দ্রুত বার্তার উত্তর দিচ্ছেন সেটাই বেশি দেখা হয়। এতে দক্ষতার সঙ্গে কাজ শেষ করেও সময়মতো কাজ গুটিয়ে নেওয়া মানুষটির মনে হতে পারে, তিনি বুঝি যথেষ্ট করছেন না। এই চাপ থেকেই তৈরি হয় এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতা। অন্যরা কাজ করছে, তাই আমাকেও করতে হবে। এমন ভাবনা ধীরে ধীরে বিশ্রামের জায়গাটুকুও সংকুচিত করে।

আগে অফিস থেকে বেরিয়ে বাড়ি ফেরা মানেই ছিল কর্মদিবসের সমাপ্তি। কিন্তু এখন এই ডিজিটাল যুগে সময়ের সেই সীমারেখা পাল্টে গেছে। ল্যাপটপ, ফোন আর নোটিফিকেশন কাজকে ঘরের ভেতরও নিয়ে আসে। রাতের খাবারের সময় ই-মেইল দেখা কিংবা ছুটির দিনেও অফিসের কল ধরা, এসব অভ্যাস মস্তিষ্ককে দীর্ঘ সময় ধরে কাজের মধ্যেই রাখে। ফলে শরীর বিশ্রামে গেলেও মন পুরোপুরি কাজ থেকে বের হতে পারে না।

চাকরির নিরাপত্তা নিয়েও অনিশ্চয়তা অনেককে বেশি সময় কাজ করতে বাধ্য করে। স্বল্পমেয়াদি চুক্তি, হঠাৎ ছাঁটাই কিংবা পদোন্নতির সঙ্গে অতিরিক্ত সময় দেওয়ার সংস্কৃতি কর্মীদের মনে তৈরি করতে পারে এক ধরনের স্থায়ী চাপ। তখন বিরতি নেওয়া মানেই মনে হতে পারে, অন্যরা যখন এগিয়ে যাচ্ছে, আমি তখন থেমে আছি। বিশ্রামের প্রয়োজন থাকলেও তাই অপরাধবোধ সহজে পিছু ছাড়ে না।

‘মাত্র চার ঘণ্টা ঘুমিয়েছি’ বা ‘সকাল থেকে একটানা কাজ করছি’ এ ধরনের কথা ব্যস্ততাকে গৌরবান্বিত করার অংশ হয়ে ওঠেছে। কতটা বিশ্রাম পেয়েছি, তার বদলে কতটা ব্যস্ত ছিলাম, সেটিই যেন সাফল্যের মাপকাঠি হয়ে দাড়িয়েছে। এই মানসিকতার কারণে ক্লান্তি স্বীকার করতেও অনেকে অস্বস্তি বোধ করেন। অথচ দীর্ঘদিন ধরে বিশ্রামহীন থাকা মানেই বড় কোনো অর্জন নয়; বরং শরীর ও মনের সীমা পেরিয়ে মানসিক ক্লান্তি তৈরি ইঙ্গিত।

গবেষকদের মতে, শুধু নিজের ইচ্ছাশক্তি বাড়ানো বা কাজের আরও গোছানো তালিকা তৈরি করলে বা কাজ পুরোপুরি শেষ করলেই এই সমস্যা বদলাবে না। এর জন্য প্রয়োজন কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ বদলানো। অর্থাৎ কর্মক্ষেত্রে কতক্ষণ উপস্থিত ছিলেন, তার বদলে কী কাজ করেছে। সেদিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হওয়া প্রয়োজন। কর্মক্ষেত্রের নিতীনির্ধারকদের এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে বিশ্রামকে অলসতার প্রতীক হিসেবে নয়। কাজেরই একটি প্রয়োজনীয় অংশ হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। কর্মীর শরীর-মন যখন থামতে চায়, তখন তাকে সেই সুযোগ দেওয়া মানে সময় নষ্ট করা নয়। বরং দীর্ঘ পথ চলার জন্য প্রয়োজনীয় বিরতি ও কাজেরই অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
সূত্র: হেলথলাইন
ছবি: পেকজেলসডটকম