
ফুটবলের মাঠে একটি নিখুঁত হেড অনেক সময় ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেয়। কিন্তু সেই হেডই কি দীর্ঘ মেয়াদে খেলোয়াড়দের মস্তিষ্কের জন্য বিপদের কারণ হতে পারে? বছরের পর বছর বারবার বল হেড করার কারণে ফুটবলারদের মধ্যে ডিমেনশিয়া, আলঝেইমারসহ বিভিন্ন নিউরোডিজেনারেটিভ (মস্তিষ্কের ক্ষয়জনিত) রোগের ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। যদিও প্রতিটি হেড সরাসরি বড় ধরনের আঘাত তৈরি করে না, তবে ক্যারিয়ারজুড়ে জমে থাকা অসংখ্য ছোট আঘাত ভবিষ্যতে মস্তিষ্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে মাত্র ২৫ বছর বয়সে এক তরুণ বিজ্ঞানী শুরু করেছিলেন এমন এক গবেষণা, যা ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়েই নতুন ভাবনা তৈরি করেছে।
যুক্তরাজ্যের ড. আইয়ুয়ান ফিলিপস চেষ্টা করছেন এমন একটি ফুটবল তৈরি করতে, যা খেলোয়াড়দের মস্তিষ্কের জন্য আরও নিরাপদ হবে। তাঁর গবেষণা হয়তো একদিন ফুটবলে বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।
করোনা লকডাউনের সময় ঘরে বসেই তাঁর মাথায় আসে এই চিন্তা। তিনি বিভিন্ন গবেষণায় দেখেছিলেন, সাবেক ও বর্তমান ফুটবলারদের মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে নিউরোডিজেনারেটিভ রোগ বা মস্তিষ্কের ক্ষয়জনিত সমস্যার ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তখন তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে, ফুটবলাররা যখন বারবার বল হেড করেন, তখন আসলে তাদের মস্তিষ্কের ভেতরে কী ঘটে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই যুক্তরাজ্যের লাফবরো বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি শুরু করেন পিএইচডি গবেষণা। পাঁচ বছর পর তাঁর গবেষণার ফলাফল ফুটবলবিজ্ঞানীদের মধ্যেও আলোচনার জন্ম দেয়।

ড. ফিলিপস জানান, গবেষণার শুরুতে অনেকেই তাঁর ধারণা নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। কারণ, তিনি এমন একটি বিষয় নিয়ে কাজ করছিলেন, যা আগে কেউ গুরুত্ব দিয়ে ভাবেনি। তাঁর মতে, ‘মানুষের সন্দেহ কখনো আমাকে থামাতে পারেনি। আমি নিজের ধারণার ওপর বিশ্বাস রেখে কাজ করতে পছন্দ করি।’
নিজের প্রিয় ক্লাব লিভারপুলের সাবেক কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপের একটি জনপ্রিয় মন্তব্যের মতোই তিনি চেয়েছিলেন ‘সন্দিহানদের বিশ্বাসী করে তুলতে’। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। তিনি বিশ্বাস করেন, খেলাধুলা মানুষের জীবনকে সমৃদ্ধ করে। তবে একই সঙ্গে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা জরুরি।

ফুটবলে একটি হেডিং সাধারণত এক সেকেন্ডের কম সময়ের ঘটনা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এটি সরাসরি কনকাশন বা বড় ধরনের আঘাত তৈরি করে না। কিন্তু সমস্যা হতে পারে দীর্ঘ সময় ধরে বারবার হওয়া ছোট ছোট আঘাতে।
ফিলিপস বলেন, একজন খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ারে অসংখ্যবার হেড করার ঘটনা ঘটে। প্রতিটি আঘাতের প্রভাব হয়তো খুব সামান্য, কিন্তু বছরের পর বছর এই ছোট আঘাতগুলো জমতে জমতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ফুটবলারদের মস্তিষ্কের ক্ষতির ধরন অনেক ক্ষেত্রে মাথার সামনের অংশ বা ফ্রন্টাল অঞ্চলের দিকে বেশি দেখা যায়। আর এখান থেকেই ফিলিপসের মনে প্রশ্ন আসে, বল মাথায় লাগার সময় কি এমন কোনো চাপ তৈরি হয়, যা আগে কেউ লক্ষ করেনি? তাঁর গবেষণার মূল বিষয় ছিল এই ‘প্রেশার ওয়েভ’ বা চাপতরঙ্গ।

এই ধারণা পরীক্ষা করতে ফিলিপস ও তাঁর দল তৈরি করেন একটি বিশেষ ধরনের পরীক্ষামূলক ব্যবস্থা। তাঁরা একটি উন্নত মানের কৃত্রিম মাথা তৈরি করেন, যার মধ্যে ছিল চাপ পরিমাপের সেন্সর। এরপর একটি বিশেষ ‘বল ক্যানন’ ব্যবহার করে বিভিন্ন গতিতে ফুটবল ছোড়া হয় সেই কৃত্রিম মাথা লক্ষ্য করে।
পরীক্ষায় বলের গতি রাখা হয়েছিল বিভিন্ন পর্যায়ে—
• সাধারণ পাসের মতো প্রায় ৪৭ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা
• কর্নারের মতো প্রায় ৬৪ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা
• শক্তিশালী শটের মতো প্রায় ৮২ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা
গবেষণায় দেখা যায়, বলের গতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শক্তি স্থানান্তরের ধরনও পরিবর্তিত হয়। ফিলিপস ব্যাখ্যা করেন, মাথায় বল লাগার পর যে চাপতরঙ্গ তৈরি হয়, সেটি মাথা নড়ার আগেই মস্তিষ্কের ভেতর দিয়ে ছড়িয়ে পড়ে।
ফিলিপস বিষয়টি বোঝাতে একটি উদাহরণ দেন, টেবিলে আঘাত করলে তার ওপর রাখা পানির গ্লাসে যেমন ঢেউ তৈরি হয়, তেমনই বলের আঘাতেও মাথার ভেতরে চাপের ঢেউ তৈরি হতে পারে।

এত দিন অনেকের ধারণা ছিল, পুরোনো দিনের ভারী চামড়ার ফুটবলই খেলোয়াড়দের মস্তিষ্কের ক্ষতির অন্যতম কারণ। কারণ, চামড়ার বল পানি শুষে নিয়ে অনেক ভারী হয়ে যেত। কিন্তু ফিলিপসের গবেষণা সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। তাঁর দল ফুটবলের ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ের ২০ ধরনের বল পরীক্ষা করেছে। পুরোনো চামড়ার বল থেকে শুরু করে আধুনিক ডিজাইনের বল, সবই ছিল এই পরীক্ষায়।

শুকনা অবস্থায় পুরোনো চামড়ার বল আধুনিক কিছু বলের তুলনায় প্রায় ৫৫ গুণ কম শক্তি স্থানান্তর করেছে। তবে আধুনিক ফুটবলগুলোও যে পুরোপুরি নিরাপদ, এমন নয়। কারণ, মাথার ঝুঁকি শুধু সময় বা ব্র্যান্ডের ওপর নির্ভর করে না, বরং বল কীভাবে তৈরি হয়েছে, তার ওপর নির্ভর করে।

ফিলিপস জানান, আধুনিক ফুটবলে সাধারণত অনেকগুলো স্তর থাকে। যেমন ব্লাডার, টেক্সটাইল স্তর, ফোমসহ আরও কয়েকটি স্তর। এই স্তরগুলো একসঙ্গে যুক্ত হয়ে বলকে অনেক শক্ত ও স্থিতিশীল করে তোলে। ফলে আধুনিক বলের কাঠামো অনেক সময় বেশি শক্ত হয়ে যায় এবং আঘাতের সময় ভিন্ন ধরনের শক্তি তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে পুরোনো চামড়ার বল ছিল তুলনামূলকভাবে সরল গঠনের।

ফিলিপস আরও বলেন, বল মাথায় লাগার সময় তৈরি হওয়া চাপতরঙ্গ অনেকটা অন্য ধরনের পুনরাবৃত্তিমূলক চাপের সঙ্গে তুলনীয়। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে বারবার ছোট ছোট চাপ মস্তিষ্কে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে ফিলিপস সতর্ক করে বলেন, এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না যে ল্যাব পরীক্ষায় পাওয়া এই চাপ সরাসরি মানুষের মস্তিষ্কে একই ধরনের ক্ষতি করে কি না। এর জন্য আরও নিউরোসায়েন্স গবেষণা প্রয়োজন।
গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সব মানুষের মাথার গঠন এক নয়। বর্তমান পরীক্ষায় ব্যবহার করা হয়েছিল একজন প্রাপ্তবয়স্ক জাপানি পুরুষের এমআরআই তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি মাথার মডেল। ফিলিপস মনে করেন, নারী ও পুরুষের মাথার গঠনের কিছু পার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে নারীদের মাথার খুলি বা স্কালের পুরুত্ব ও আকৃতির পার্থক্য বলের আঘাতের প্রভাব পরিবর্তন করতে পারে। তাই নারী ফুটবলারদের নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

ফিলিপসের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন হলো এমন একটি ফুটবল তৈরি করা, যা খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা বাড়াবে, কিন্তু খেলার সৌন্দর্য নষ্ট করবে না। তাঁর মতে, নতুন বল তৈরির ক্ষেত্রে এমন উপাদান ও স্তর ব্যবহার করতে হবে, যা আঘাতের শক্তি কমাবে, কিন্তু বলের গতি, বাউন্স ও খেলার স্বাভাবিক অনুভূতি ঠিক রাখবে।
ফিলিপস চান আরও বড় পরিসরে বল পরীক্ষা করা হোক, যাতে মা–বাবা, কোচ এবং দলগুলো খেলোয়াড়দের ঝুঁকি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পায়। ফিলিপস বলেন, লকডাউনের সময় তাঁর মাথায় একটি চিন্তার জন্ম হয়েছিল—‘আরও নিরাপদ একটি ফুটবল কি তৈরি করা সম্ভব?’
ফিলিপসের বিশ্বাস, সঠিকভাবে কাজ করা গেলে খেলাটির মূল সৌন্দর্য না বদলিয়েই খেলোয়াড়দের আরও নিরাপদ রাখা সম্ভব। কারণ, ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, এটি কোটি মানুষের ভালোবাসা। আর সেই ভালোবাসাকে আরও নিরাপদ করাই হতে পারে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন।
ছবি: এএফপি ও রয়টার্স
সূত্র: বিবিসি