শুধু খাবার থেকে পেটের সমস্যা হয় না, প্রতিদিনের ৮ অভ্যাসই নষ্ট করছে হজমের প্রক্রিয়া
শেয়ার করুন
ফলো করুন

খাওয়ার সময় ফোন দেখা, দিনের শুরুতে না খেয়ে থাকা কিংবা সারাদিন পানি না খেয়ে রাতে একসঙ্গে অনেকটা পানি পান। এমন অভ্যাসগুলো নিয়মিত চলতে থাকলে পেটের স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট ডা. সৌরভ শেঠি সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন আটটি অভ্যাসের কথা তুলে ধরেছেন, যেগুলো নিয়ে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

খাওয়ার সময় ফোনে চোখ

খেতে বসে ফোন দেখা এখন অনেকের দৈনন্দিন অভ্যাস। খাবারের টেবিলে বসেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ক্রল করা কিংবা ভিডিও দেখা যেন স্বাভাবিক হয়ে গেছে। ডা. শেঠির মতে, খাওয়ার সময় ফোনে মনোযোগ আটকে থাকলে মস্তিষ্কের কাছে পেট ভরে যাওয়ার সংকেত ঠিকভাবে পৌঁছাতে সমস্যা হতে পারে। ফলে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খাবার খাওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।

তাই খাবারের সময় ফোনটি কিছুক্ষণের জন্য দূরে রাখা শুধু টেবিলের শিষ্টাচার নয়, সচেতন খাওয়ার অভ্যাস তৈরিরও একটি অংশ।

সকালের খাবার বাদ দেওয়া

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও সকালের খাবার নিয়মিত বাদ দেওয়াকে তার সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ নেই। ডা. শেঠির মতে, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এলোমেলোভাবে খাবার বাদ দেওয়ার অভ্যাস শরীরে চাপ তৈরি করতে পারে এবং হজমের স্বাভাবিক গতিশীলতায় প্রভাব ফেলতে পারে।

অর্থাৎ নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে করা ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং আর শুধু ইচ্ছেমতো সকালের খাবার বাদ দেওয়া, দুটি এক বিষয় নয়।

বিজ্ঞাপন

প্রতিবার খাবারের শেষে মিষ্টি

খাবার শেষ করার পর একটু মিষ্টি খাওয়ার অভ্যাস অনেকেরই রয়েছে। তবে নিয়মিত প্রতিটি খাবারের শেষে অতিরিক্ত মিষ্টি খাওয়ার অভ্যাস অন্ত্রের জীবাণুর ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে বলে সতর্ক করেছেন ডা. শেঠি।

বিশেষ করে অতিরিক্ত চিনি খাওয়ার অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে মিষ্টির প্রতি আকাঙ্ক্ষা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই প্রতিটি খাবারের পর মিষ্টি খাওয়াকে নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত না করাই ভালো।

সামান্য মাথাব্যথায়ও ব্যথার ওষুধ

মাথাব্যথা হলেই ব্যথানাশক ওষুধ খেয়ে নেওয়ার অভ্যাসও পেটের জন্য ভালো নাও হতে পারে। বিশেষ করে আইবুপ্রোফেনের মতো এনএসএআইডি ধরনের ওষুধ অতিরিক্ত বা অনুপযুক্ত ব্যবহারে পাকস্থলীর আবরণে ক্ষতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তাই সামান্য অস্বস্তি হলেই নিজের ইচ্ছায় বারবার ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়ার বদলে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ।

সারাদিন পানি নয়, রাতে একসঙ্গে বেশি

engin akyurt

পর্যাপ্ত পানি পান করা যেমন জরুরি, তেমনি কখন এবং কীভাবে পানি পান করছি, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। সারাদিন পর্যাপ্ত পানি না খেয়ে রাতে একসঙ্গে অনেকটা পানি পান করার অভ্যাস শরীরের স্বাভাবিক পানির চাহিদা পূরণের সবচেয়ে ভালো উপায় নয়।
শরীরকে সারা দিন পর্যাপ্ত তরল দেওয়ার অভ্যাসই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই দিনের বেশির ভাগ সময় পানি না খেয়ে রাতে সেই ঘাটতি পূরণ করার চেষ্টা না করে সারাদিনে নিয়মিত পানি পান করা ভালো।

বিজ্ঞাপন

পায়খানার বেগ চেপে রাখা

প্রকৃতির স্বাভাবিক ডাক উপেক্ষা করার অভ্যাসও পেটের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়। পায়খানার বেগ বারবার চেপে রাখলে ধীরে ধীরে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা তৈরি হতে পারে। ডা. শেঠির মতে, নিয়মিতভাবে শরীরের এই সংকেত উপেক্ষা করলে অন্ত্রের স্বাভাবিক সংকেত দেওয়ার প্রক্রিয়াতেও প্রভাব পড়তে পারে।
তাই ব্যস্ততার কারণে নিয়মিত এই বেগ আটকে রাখার অভ্যাস থাকলে তা পরিবর্তনের চেষ্টা করা জরুরি।

সারাক্ষণ কিছু না কিছু খাওয়া

প্রধান খাবারের মাঝখানে বারবার হালকা কিছু খাওয়ার অভ্যাসও অনেকের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। তবে সারাক্ষণ কিছু না কিছু খেতে থাকলে হজমতন্ত্র খাবার হজমের জন্য বিরতি পাওয়ার সুযোগ কম পায়। ডা. শেঠি মনে করেন, খাবারের মধ্যবর্তী বিরতি হজমতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই ক্ষুধা না থাকলেও অভ্যাসবশত বারবার খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমানো যেতে পারে।

ঘুমানোর ঠিক আগে খাবার

রাতে ঘুমাতে যাওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যে খাবার খাওয়ার অভ্যাসও এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন ডা. শেঠি। তাঁর মতে, ঘুমের সময় শরীরের বিভিন্ন পুনর্গঠনমূলক প্রক্রিয়া চলতে থাকে। ঘুমের খুব কাছাকাছি সময়ে খাবার খেলে হজমের কাজও তখন সক্রিয় থাকে। তাই রাতের খাবার ও ঘুমের মধ্যে যথেষ্ট সময় রাখার অভ্যাস তৈরি করা ভালো।

ছোট অভ্যাসেই বড় পরিবর্তন

পেটের সুস্থতা ধরে রাখার জন্য শুধু কী খাচ্ছি, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ নয়; কীভাবে খাচ্ছি, কখন খাচ্ছি এবং প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় কী ধরনের অভ্যাস অনুসরণ করছি এসবও গুরুত্বপূর্ণ।

খাওয়ার সময় ফোন দূরে রাখা, নিয়মিত পানি পান করা, শরীরের স্বাভাবিক সংকেত উপেক্ষা না করা, অপ্রয়োজনীয় ওষুধের ব্যবহার কমানো এবং ঘুমের আগে খাবার না খাওয়ার মতো ছোট পরিবর্তন দৈনন্দিন রুটিনকে আরও স্বাস্থ্যকর করে তুলতে পারে।
তবে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং, ব্যথানাশক ওষুধের ব্যবহার কিংবা দীর্ঘস্থায়ী হজমের সমস্যা নিয়ে ব্যক্তিভেদে পরামর্শ আলাদা হতে পারে। তাই কোনো নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যসমস্যা থাকলে নিজের মতো সিদ্ধান্ত না নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।

ছবি: এআই ও পেকজেলসডটকম

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬, ০১: ০০
বিজ্ঞাপন