ইফতারে চাঙা রাখে এই মরোক্কান স্যুপ
শেয়ার করুন
ফলো করুন

এখন রোজা চলছে। দীর্ঘ সময় উপবাস শেষে ইফতারে এমন কিছু খাওয়া দরকার, যা কম পরিমাণ খেয়ে পুষ্টির ঘাটতি পূরণ হয়ে যায়। তেমনই একটি খাবারের সঙ্গে পরিচিত করাব আজ।

হারিরা সুপ
হারিরা সুপ

আসলে এটি একটা স্যুপ। বৈচিত্র্যময় ও পুষ্টিগুণে ভরপুর হারিরা স্যুপ! এটি মরক্কোর একটি জনপ্রিয় ডিশ। রোজার সময় ইফতারে তাদের অন্যতম পছন্দ এই খাবার। পুষ্টিকর এই স্যুপ, বিশেষ করে পবিত্র রমজানে ইফতারের জন্য আদর্শ। এতে মসুর ডাল, ছোলা, টমেটো, মাংস, তাজা হার্বস, মসলা (হলুদ, দারুচিনি, জিরা, আদা ইত্যাদি) দিয়ে রান্না হয়ে থাকে। এই উপকরণগুলো একসঙ্গে একটি সুষম পুষ্টি প্রোফাইল তৈরি করে। কারণ, এটি প্রোটিন, ফাইবার, কার্বোহাইড্রেট, ভিটামিন ও মিনারেলসমৃদ্ধ।
হারিরা স্যুপের অথেনটিক রেসিপি (৬ থেকে ৮ জনের জন্য)।

বিজ্ঞাপন

উপকরণ

গরু বা মুরগির মাংস ৩০০-৪০০ গ্রাম
মসুর ডাল ১ কাপ (ধুয়ে ভিজিয়ে রাখা)
ছোলা ৪০০ গ্রাম বা ১ কাপ ভেজানো বা সেদ্ধ (খোসা ছাড়ানো)
টমেটো ৪–৬টি বড় ব্লেন্ড করা
পেঁয়াজ ১–২টি বড় (কুচি বা গ্রেট করা)
ধনেপাতা বা পুদিনাপাতা ২–৩ ডাঁটা বা কুচি
গাজর ১টি (কুচি)
রসুন ৩–৪ কোয়া (কুচি)
আদা ১–২ চা–চামচ বাটা বা কুচি
সাদা তেল বা অলিভ অয়েল ৩–৪ টেবিল চামচ
মসলা প্রয়োজন অনুযায়ী
হলুদ ১ চা–চামচ
দারুচিনিগুঁড়া ১ চা–চামচ
জিরাগুঁড়া ১ চা–চামচ
গোলমরিচের গুঁড়া ১ চা–চামচ
আদা তাজা ১/২ চা–চামচ
লবণ স্বাদ অনুযায়ী (১–২ চা–চামচ)
মোটা সেমাই (ভাঙা) ১/২ কাপ (ঐচ্ছিক, অনেক রেসিপিতে থাকে)
ময়দা ২–৩ টেবিল চামচ (পানিতে গুলে ঘন করার জন্য)
লেবু ১–২টি (পরিবেশনের সময়)
পানি বা স্টক ৮–১০ কাপ (চিকেন স্টক হলে আরও ভালো)

বিজ্ঞাপন

প্রণালি

একটা বড় পাত্রে তেল গরম করে পেঁয়াজ, রসুন ও আদা দিয়ে ৫ থেকে ৭ মিনিট ভাজুন, যতক্ষণ না নরম ও সোনালি হয়।
মাংস দিন, লবণ, হলুদ, গোলমরিচ, দারুচিনি ও জিরা দিয়ে ৫ থেকে ৮ মিনিট ভালোভাবে ভাজুন, যাতে মাংসের রং বদলে যায়। টমেটো দিন, আরও ৫ মিনিট রান্না করুন।

রোজায় পরিবারের সসদ্যরা পায় সুষম পুষ্টি
রোজায় পরিবারের সসদ্যরা পায় সুষম পুষ্টি

মসুর ডাল, ছোলা, পানি বা স্টক দিন। ফুটে উঠলে আঁচ কমিয়ে ঢেকে ৩০–৪০ মিনিট সেদ্ধ করুন, যতক্ষণ না মাংস ও ডাল নরম হয়।
সেমাই দিন (যদি ব্যবহার করেন), আরও ৮–১০ মিনিট রান্না করুন।
ময়দা পানিতে গুলে ধীরে ধীরে ঢেলে নাড়ুন স্যুপ ঘন ও সিল্কি হবে (খুব বেশি ঘন করবেন না)।

শেষ ৫ মিনিটে তাজা ধনেপাতা বা পুদিনাপাতার কুচি দিন। চুলার আঁচ বন্ধ করে লেবুর রস দিয়ে দিন (অথবা প্রতি বাটিতে লেবু দিয়ে পরিবেশন করুন)।
খাওয়ার নিয়ম
ইফতারে প্রথমে খেজুর ও পানি খাওয়ার পর গরম–গরম হারিরা স্যুপ খান।

উপকারিতা

রোজা ভাঙার পর আদর্শ ও দ্রুত এনার্জি দেয়: কমপ্লেক্স কার্ব, প্রোটিন রক্তে শর্করা ধীরে ধীরে বাড়ে, হাইপোগ্লাইসেমিয়া (লো সুগার) প্রতিরোধ করে।

দ্রুত হজম হয়, পেটে চাপ পড়ে না: লিকুইডভিত্তিক স্যুপ দ্রুত গ্যাস কমায় এবং ১৫ থেকে ৩০ মিনিটে হজম শুরু হয়, অ্যাসিড রিফ্লাক্স বা ব্লোটিং কমায়। ফাইবার (ডাল, ছোলা) ও হার্বস হজমশক্তি বাড়ায়, গ্যাস, অ্যাসিডিটি ও কোষ্ঠকাঠিন্য কমায়। এ ছাড়া পানির ঘাটতি পূরণ করে ইলেকট্রোলাইটের মাত্রা বজায় রাখে। স্যুপের জলীয় অংশ, লবণ (সোডিয়াম), সবজি, ডাল থেকে পটাশিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম মেলে, যা ডিহাইড্রেশন দূর করে, মাংসপেশির ক্র্যাম্প ও ক্লান্তি কমায়। পটাশিয়াম ও সোডিয়াম পানির ঘাটতি পূরণ করে।

প্রোটিনসমৃদ্ধ: মসুর ডাল, ছোলা ও মাংস সম্পূর্ণ অ্যামিনো অ্যাসিডসমৃদ্ধ। মাংসপেশি রক্ষা করে, দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখে (রোজার পরের খাবারের আগে ভালো)।
উচ্চ ফাইবারসমৃদ্ধ হওয়ায় হজমশক্তি বাড়ায়, কোলেস্টেরল কমায়, ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখে, ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। ভিটামিন ও মিনারেল রোজার ক্লান্তি কমায়, টমেটো, লেবু ও ভিটামিন সি ইমিউনিটি বাড়ায় ও আয়রন শোষণে সহায়তা করে। গাজর ও টমেটোর ভিটামিন এ ও ফোলেট রক্ত তৈরি ও কোষের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।

অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট ও অ্যান্টি–ইনফ্ল্যামেটরি: টমেটো (লাইকোপিন), হলুদ (কারকিউমিন), আদা ইনফ্ল্যামেশন কমায়, ইমিউনিটি বাড়ায়।

হার্ট হেলথ: কম স্যাচুরেটেড ফ্যাট, উচ্চ পটাশিয়াম, ফাইবার রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

হারিরা স্যুপ শুধু সুস্বাদু নয়, রমজানে শরীরের জন্য একটা ‘সুপারফুড’। এর পুষ্টি দিনের ক্লান্তি দূর করে! পুষ্টিমান রেসিপিভেদে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পরিবর্তন হতে পারে। রেসিপিতে মাংস বেশি বা অতিরিক্ত তেল থাকলে ক্যালরি বাড়তে পারে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ থাকলে লবণ কমিয়ে লেবু বেশি দিয়ে খান। এই রেসিপি কিডনির রোগীদের জন্য ভালো নয়।

বৈচিত্র্যময় জীবনে বৈচিত্র্যময় খাবার পরিবেশন করে আত্মীয়স্বজনদের তাক লাগিয়ে দিন। আর মজার এই স্যুপ উপভোগ করুন। রমজানে রোজা রেখে সুস্থ থাকুন।

লেখক: খাদ্যপথ্য ও আকুপ্রেশার বিশেষজ্ঞ, প্রধান নির্বাহী, প্রাকৃতিক নিরাময় কেন্দ্র।

ছবি: এআই ও পেকজেলসডটকম

প্রকাশ: ০৬ মার্চ ২০২৬, ০১: ০০
বিজ্ঞাপন