
রোজাকে আসলে খেজুর খাওয়ার মৌসুম বলা চলে। ইফতারে খেজুর থাকে চাহিদার শীর্ষে। পুষ্টির দিক থেকে খেজুর একটি উচ্চ পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার। সেই সঙ্গে এখন ধর্মীয়ভাবেও খেজুর গুরুত্বপূর্ণ। প্রাচীনকাল থেকে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান খাদ্য এই খেজুর, যার মিষ্টি স্বাদ এবং অসংখ্য উপকারিতা বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। খেজুর এখন বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় এবং স্মুদি, জুস, নিউট্রিশন বার কিংবা বেকড পণ্যে প্রাকৃতিক মিষ্টি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। প্রিমিয়াম জাতের খেজুর বাদাম বা চিনাবাদাম মাখন দিয়ে ভরা যেতে পারে এবং প্যানকেক বা পরিজে খেজুরের গুড় ছিটিয়ে দেওয়া যেতে পারে।
তাহলে এবার খেজুরের আলাপ করা যাক!

খেজুর প্রাকৃতিক শর্করা, ফাইবার, আয়রন, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম আর ম্যাগনেশিয়ামের চমৎকার উৎস। প্রতিদিন প্রায় চারটি খেজুর খেলে তামা, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও সেলেনিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পদার্থের দৈনিক চাহিদার ১৫ শতাংশের বেশি পূরণ করা যায়। খেজুরে গ্লুকোজ, ফ্রুকটোজ ও সুক্রোজের মতো প্রাকৃতিক শর্করা বেশি থাকে, যা এগুলোকে চমৎকার উৎসে পরিণত হয়ে শরীরে দ্রুত শক্তি জোগায় এবং হজমে সহায়তা করে। খেজুরে থাকা ভিটামিন বি–৬ মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া এতে থাকা প্রয়োজনীয় খনিজ পদার্থ সামগ্রিক সুস্থতায় অবদান রাখে।
দ্রুত শক্তি বৃদ্ধি: খেজুরে থাকা গ্লুকোজ, ফ্রুকটোজ ও সুক্রোজ শরীরে দ্রুত শক্তি সরবরাহ করে। বিশেষত ব্যায়ামের পরে বা ক্লান্তির সময় এটি চমৎকার কাজ করে। সারা দিন রোজা রেখে ইফতারে খেজুর খেলে শরীরে শক্তি ফিরে আসবে।
হজমশক্তি উন্নত করে: খেজুরে প্রচুর খাদ্য আঁশ রয়েছে, যা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে এবং গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল ট্রানজিট উন্নত করতে সাহায্য করে। নিয়মিত খেজুর খাওয়া হজমতন্ত্রকে সক্রিয় রাখে। ব্রিটিশ জার্নাল অব নিউট্রিশন–এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা তিন সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন সাতটি খেজুর খেয়েছেন, তাঁদের মলত্যাগের ফ্রিকোয়েন্সি এবং মলত্যাগে উন্নতি দেখা গেছে, যা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে ফলের কার্যকারিতা তুলে ধরে। ফাইবার গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ (GERD), ডাইভার্টিকুলাইটিস এবং হেমোরয়েডের মতো অবস্থার চিকিৎসায়ও সাহায্য করতে পারে, যা স্বাস্থ্যকর হজম এবং নিয়মিত মলত্যাগে সাহায্য করে।
হৃদ্রোগ প্রতিরোধ: খেজুরে প্রচুর পরিমাণে পলিফেনল, ফ্ল্যাভোনয়েড এবং ডায়েটারি ফাইবার রয়েছে, যা রক্তনালি স্বাস্থ্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং রক্তনালির রোগ কমাতে সাহায্য করতে পারে। এই যৌগগুলো রক্তনালির স্থিতিস্থাপকতা উন্নত করতে, রক্তচাপ কমাতে এবং ধমনিতে প্লাক জমা হওয়া রোধ করতে একসঙ্গে কাজ করে, সামগ্রিক হৃদ্রোগের সুস্থতা বৃদ্ধি করে।
যৌনস্বাস্থ্য উন্নত করে: খেজুরে অ্যালকালয়েড, স্যাপোনিন ও ফ্ল্যাভোনয়েডের মতো যৌগ থাকে যা কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে প্রভাবিত করে এবং ডোপামিন নিঃসরণ বৃদ্ধি করে যৌন ইচ্ছা এবং কার্যকলাপ বৃদ্ধি করতে পারে। খেজুরের প্রাকৃতিক যৌগগুলো কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে সক্রিয় করে, যৌন ইচ্ছা এবং কার্যকলাপ ও উর্বরতা শক্তি বাড়ায়।
অ্যালার্জির প্রতিকার: অ্যালার্জিক রাইনাইটিস উপশমে খেজুর বেশ কার্যকর। খেজুরে থাকা বিটা-গ্লুকান এবং প্রদাহবিরোধী যৌগ অ্যালার্জির লক্ষণ হ্রাস করে। যাঁরা অ্যালার্জিজনিত সমস্যায় ভুগছেন, তাঁরা প্রতিদিন খেজুর খেলে উপকার পাবেন।

চোখের স্বাস্থ্যরক্ষা: ভিটামিন এ এবং ক্যারোটিনয়েডে সমৃদ্ধ খেজুর দৃষ্টিশক্তি উন্নত করে এবং রাতের অন্ধত্ব প্রতিরোধে সহায়তা করে।
প্রসবকালীন সহায়ক: গর্ভবতী নারীদের প্রসবকালীন স্বাভাবিক কায়িক পরিশ্রমে সাহায্য করতে খেজুর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি প্রসবকালীন জটিলতা কমিয়ে সুস্থ সন্তান প্রসবে সহায়তা করে। গর্ভবতী মায়ের বেশি পরিমাণ শক্তির প্রয়োজন হয়, মাকে দুটি জীবনের জন্য খেতে হয়, তাই খেজুর একটি আদর্শ খাবার, যদি গর্ভকালীন ডায়াবেটিস না থাকে।

খেজুর আমরা এমনিতে চিবিয়ে খেতে পারি; কিন্তু পুষ্টি বিবেচনায় খেজুর দুটি ভিন্নরূপে খেলে বেশি উপকার পাবেন।
১. খেজুর প্রোটিন ও ফাইবারসমৃদ্ধ হওয়ায় দুধ ও দইয়ের সঙ্গে মিশিয়ে অথবা ভিজিয়ে খেতে পারেন; যা আপনার রোজা রাখার কারণে ক্লান্তি দূর করার জন্য সবচেয়ে বেশি পুষ্টি জোগান দিতে পারে।
২. খেজুর ফালি করে কেটে এতে বাটার বা মাখন মিশিয়ে খান। এতে উচ্চমাত্রার ব্লাডসুগার যাঁদের আছে, তাঁদের সুগারস্পাইক কম হবে। তবে চারটির বেশি খেজুর খাওয়া উচিত নয়।
খেজুর প্রকৃতির এক অনন্য উপহার, যা পুষ্টি ও স্বাদের অনন্য মিশ্রণ। নিয়মিত ও পরিমিত খেজুর খাওয়া সুস্থ জীবনধারা বজায় রাখতে সহায়ক। তাই আপনার খাদ্যতালিকায় খেজুর যোগ করুন এবং উপভোগ করুন এর অসংখ্য স্বাস্থ্য–উপকারিতা!

যদিও খেজুর অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর, তবে এটি পরিমিত পরিমাণে খাওয়াই ভালো। কারণ, এতে চিনি ও ক্যালোরি বেশি থাকে। অতিরিক্ত খেলে ওজন বৃদ্ধি এবং রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যেতে পারে।
লেখক: খাদ্য ও পথ্যবিশেষজ্ঞ; প্রধান নির্বাহী, প্রাকৃতিক নিরাময় কেন্দ্র
ছবি: পেকজেলসডটকম, সেলিনা শিল্পী