
আমাদের শরীরের এক অদ্ভুত ক্ষমতা আছে। মন যা ভুলে যেতে চায়, শরীর সেটাই মনে রাখে। একটি গন্ধ, একটি সুর বা হঠাৎ কারও হাঁটার ভঙ্গি মনে করিয়ে দেয় প্রিয় কোনো মানুষ কিংবা পুরোনো কোনো স্মৃতি। কিন্তু হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল অফ নিউরোসায়েন্স ও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ মেন্টাল হেলথ-এর নতুন এক গবেষণা বলছে, নিয়মিত ব্যায়াম শুধু শরীর নয়, মস্তিষ্কের স্মৃতি গঠনের প্রক্রিয়াও পাল্টে দেয়।

মস্তিষ্কের একটি বিশেষ অংশ আছে, যার নাম হিপোক্যাম্পাস যেখানে গড়ে ওঠে স্মৃতি ও আবেগের কেন্দ্র। নিয়মিত ব্যায়ামের ফলে এই অংশে জন্ম নেয় নতুন নিউরন, যা পুরোনো স্নায়ু সার্কিটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নতুন সংযোগ তৈরি করে। এই প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় নিউরোজেনেসিস (ণেউরগেনেসিস)। নতুন কোষের জন্ম মানেই পুরোনো মানসিক ক্ষত ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে যাওয়া। মন খারাপের স্মৃতিগুলো ম্লান হয়ে যায়, ভয় বা ব্যথার স্মৃতিগুলো মস্তিষ্কের অন্ধকার কোণে হারিয়ে যেতে শুরু করে। এর মূল কারণ, ব্যায়ামের সময় দেহ থেকে নিঃসৃত হয় “মস্তিষ্কের স্নায়ু বৃদ্ধিকারী প্রোটিন” - BDNF (Brain-Derived Neurotrophic)। এটি এক ধরনের গ্রোথ ফ্যাক্টর, যা মস্তিষ্কের কোষকে পুষ্টি দেয়, নতুন পথ তৈরি করে এবং স্মৃতিকে পুনর্গঠন করে।

শুধু হিপোক্যাম্পাস নয়, ব্যায়ামের ফলে প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সও আরও সক্রিয় হয়। মস্তিষ্কের এই অংশ মনোযোগ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আবেগের নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই অংশ শক্তিশালী হলে মানুষ নিজের অনুভূতিকে আরও ভালোভাবে সামলাতে পারে, ভয় বা উদ্বেগের সময় দ্রুত পুনরুদ্ধার করতে পারে, ফলে জীবনের ভারসাম্য ফিরে আসে।

যাঁরা মানসিক আঘাত বা ট্রমা পেরিয়ে যাচ্ছেন, তাঁদের জন্য ব্যায়াম শুধু থেরাপি নয়। নিউরোসায়েন্সের ভাষায় এটি এক ধরনের “রেক্লেমেশন” (Reclamation)। অর্থাৎ, শরীর মস্তিষ্ককে শেখায় “সুস্থতা মানে শুধু মনে থাকা নয়, মানসিক ও শারীরিকভাবে সচল থাকা।”

যখন আপনি হাঁটেন, দৌড়ান, যোগব্যায়াম করেন বা ভারোত্তোলন করেন, তখন শুধু শরীরই বদলায় না, আপনার মস্তিষ্কও নতুনভাবে গল্প লেখা শুরু করে। প্রতিটি ঘামের ফোঁটা, প্রতিটি শ্বাস যেন মস্তিষ্কে নতুন কিছু বুনে দেয়। যেখানে ব্যথা থাকে, কিন্তু আর নিয়ন্ত্রণ নেয় না। মনকে শান্ত করার সবচেয়ে সহজ পথ অনেক সময় লুকিয়ে থাকে কার্ডিও বা স্ট্রেন্থ ট্রেনিংয়ের মধ্যে। আমরা প্রায়ই ভাবি, মানসিক সুস্থতার শুরু হয় থেরাপি রুমে বা মেডিটেশনের মধ্যে। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে এটি শুরু হতে পারে আপনার প্রতিটি পদক্ষেপে।
নিজেকে ভালোবাসুন। সামান্য সময় ব্যয় করে নিয়মিত ব্যায়াম করুন দেখবেন, পৃথিবীটা সত্যিই অনেক বেশি সুন্দর মনে হবে।
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি