
হাঁটাকে অনেকেই হালকা ব্যায়াম মনে করেন কিন্তু সঠিকভাবে এবং নিয়মিত হাঁটলে এটি দৈনিক ক্যালরি খরচ বাড়াতে, শরীরকে সক্রিয় রাখতে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণের যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সবচেয়ে বড় বিষয় হাঁটা এমন একটি অভ্যাস যা দীর্ঘদিন ধরে চালিয়ে যাওয়া তুলনামূলক সহজ।

আমরা দিনের বড় একটা সময় বসে কাটাই। অফিসের ডেস্ক, গাড়ি, বাসা কিংবা দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহারের কারণে দৈনন্দিন স্বাভাবিক চলাফেরাও অনেক কমে গেছে ফলে শরীরের মোট শক্তি খরচ কমে যায়। দিনের মধ্যে নিয়মিত হাঁটাহাঁটি করলে শুধু ব্যায়ামের সময় নয়, পুরো দিনজুড়েই শরীরকে সক্রিয় রাখা যায়। বাজারে যাওয়া, অফিসে কিছুটা হেঁটে যাওয়া, ফোনে কথা বলার সময় হাঁটা কিংবা সন্ধ্যায় একটু বের হওয়া, সবকিছুই দিনের মোট চলাফেরার অংশ। তবে লক্ষ্যহীনভাবে মাঝে মাঝে হাঁটার বদলে একটি নির্দিষ্ট দৈনিক পদক্ষেপের লক্ষ্য রাখা অভ্যাস তৈরি করতে সাহায্য করতে পারে। সূত্রটির পরামর্শ অনুযায়ী, অনেকে প্রতিদিন ১০ হাজার পদক্ষেপকে একটি বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হিসেবে ধরতে পারেন। শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী কেউ চাইলে ধীরে ধীরে এর পরিমাণ বাড়াতেও পারেন।

১০ হাজার স্টেপ শুনে অনেকেরই মনে হতে পারে, এতটা হাঁটার সময় কোথায়? অনেকের ভুল ধারনা যে এক টানা হেঁটে স্টেপ পূর্ন করতে হবে। সকালে কিছুটা, দুপুরে কিছুটা এবং সন্ধ্যায় আরও কিছুটা হাঁটলেই দিনের মোট স্টেপের সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব। অফিসে যাওয়ার সময় একটু দূরে গাড়ি পার্ক করা, লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করা, ফোনে কথা বলার সময় বসে না থেকে হাঁটা কিংবা রাতে খাবারের পর অল্প সময় হাঁটা, ছোট ছোট এসব পরিবর্তন দিনের শেষে বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে।

আমরা অনেক সময় ধরে নিই যে প্রতিদিন যথেষ্ট হাঁটছি। কিন্তু ধারণা আর বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে। মোবাইল ফোন, স্মার্টওয়াচ কিংবা ফিটনেস ট্র্যাকার দিয়ে প্রতিদিনের স্টেপের সংখ্যা দেখা যায়। নিজের হাঁটার হিসাব রাখলে কোথায় বেশি সময় বসে থাকছেন এবং দিনের কোন সময়ে আরও একটু হাঁটার সুযোগ তৈরি করা যায়, সেটি বোঝা সহজ হয়। সংখ্যাটা দেখার মধ্যেও একটা মজার ব্যাপার আছে। গতকাল পাঁচ হাজার স্টেপ হলে আজ ছয় হাজার করার ছোট্ট লক্ষ্য তৈরি হতে পারে এভাবেই হাঁটা ধীরে ধীরে দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়।

যারা নিয়মিত স্ট্রেন্থ ট্রেনিং করেন, তাদের জন্য ব্যায়ামের পর হালকা হাঁটা ভালো একটি সংযোজন হতে পারে। ওজন তোলার পর শরীরকে আরও ক্লান্ত করে ফেলার বদলে ২০ মিনিটের মতো হালকা হাঁটা শরীরকে সক্রিয় রাখে এবং রক্তসঞ্চালন বাড়াতে সাহায্য করতে পারে, এখানে মূল বিষয় হলো গতি। ব্যায়ামের পর এমনভাবে হাঁটতে হবে যাতে শরীর নড়াচড়া করে, কিন্তু পরবর্তী বিশ্রাম বা রিকাভারিতে সমস্যা না হয়।

হাঁটাকে একটু চ্যালেঞ্জিং করতে চাইলে ঢালু পথে হাঁটা যেতে পারে। ট্রেডমিলে হালকা ইনক্লাইন ব্যবহার করা যায়, আবার বাইরে কোনো ঢালু রাস্তাও বেছে নেওয়া যায়। ঢালু পথে হাঁটার সময় পায়ের পেশি, নিতম্ব ও পেছনের পায়ের অংশকে বেশি কাজ করতে হয়। ফলে একই সময়ের সমতল হাঁটার তুলনায় শরীরকে বেশি পরিশ্রম করতে হয় তবে শুরুতেই বেশি ঢাল বা দীর্ঘ সময় বেছে নেওয়া ঠিক নয়। নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী ধীরে ধীরে বাড়ানোই বুদ্ধিমানের কাজ।

খাওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে শুয়ে পড়ার বদলে একটু হাঁটার অভ্যাস করা যেতে পারে। বিশেষ করে ১০ থেকে ১৫ মিনিটের হালকা হাঁটা খাবারের পর রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে এবং হজমের প্রক্রিয়াতেও সাহায্য করতে পারে,এটি কোনো কঠিন ব্যায়াম নয়। রাতের খাবারের পর পরিবারের কারও সঙ্গে একটু হাঁটা, বন্ধুর সঙ্গে গল্প করতে করতে কয়েক চক্কর দেওয়া কিংবা একা নিজের মতো হাঁটা, সবই হতে পারে দিনের সুন্দর একটি বিরতি।

প্রতিদিন একই গতিতে হাঁটার বদলে মাঝেমধ্যে কিছুটা দ্রুত হাঁটার চেষ্টা করা যায়। যেমন দুই মিনিট দ্রুত হাঁটার পর তিন মিনিট স্বাভাবিক গতিতে হাঁটা এরপর আবার দ্রুত হাঁটা। এভাবে গতি পরিবর্তন করলে হাঁটা আরও গতিশীল হয় এবং শরীরকে ভিন্ন মাত্রার পরিশ্রম করতে হয় তবে দ্রুত হাঁটা মানেই দৌড়ানো নয়। এমন গতি বেছে নিতে হবে যাতে শরীরের ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি হলো, শুধু হাঁটলেই পেটের মেদ গলে যাবে, এমনটা ভাবা ঠিক নয়। ওজন কমানোর ক্ষেত্রে খাবার, মোট ক্যালরি গ্রহণ, পর্যাপ্ত প্রোটিন, ঘুম এবং নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ সবকিছুর ভূমিকা রয়েছে। হাঁটা দৈনিক ক্যালরি খরচ বাড়াতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু খাদ্যাভ্যাস যদি শরীরের প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ক্যালরি দেয়, তাহলে শুধু হাঁটার ওপর নির্ভর করে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন তাই হাঁটার সঙ্গে পরিমিত ও পুষ্টিকর খাবার রাখাটাও জরুরি।
হাঁটার সময় ওজনযুক্ত ভেস্ট বা ভারী ব্যাগ ব্যবহার করলে শরীরের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয় এবং শক্তি খরচও বাড়তে পারে কিন্তু এটি সবার জন্য প্রয়োজনীয় নয়। বিশেষ করে নতুন যারা হাঁটা শুরু করছেন, তাদের প্রথমেই বাড়তি ওজন নিয়ে হাঁটার দরকার নেই। আগে স্বাভাবিক হাঁটার অভ্যাস তৈরি হোক। শরীর সেই চাপের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পর প্রশিক্ষকের পরামর্শ নিয়ে বাড়তি প্রতিরোধ যোগ করা যেতে পারে।

ওজন কমানোর পথে আমরা প্রায়ই দ্রুত ফল চাই। কয়েক সপ্তাহ কঠিন ব্যায়াম করি, খাবার কমিয়ে দিই, তারপর ক্লান্ত হয়ে আগের অভ্যাসে ফিরে যাই। কিন্তু শরীর বদলানোর ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে করা যায় এমন অভ্যাসই বেশি গুরুত্বপূর্ণ আর হাঁটার সৌন্দর্য এখানেই। এটি শরীরকে অতিরিক্ত ক্লান্ত না করেও প্রতিদিনের চলাফেরা বাড়াতে পারে। মানসিক চাপ কমাতে, নিজের জন্য কিছুটা সময় বের করতে এবং শরীরকে সচল রাখতে হাঁটা একটি সহজ উপায় হতে পারে তাই ওজন কমানোর জন্য আরও কঠিন কিছু করার আগে হাঁটার অভ্যাসটাই রপ্ত করুন।
প্রথমে পাঁচ হাজার, কাল সেটি হতে পারে ছয় হাজার। তারপর সাত হাজার। ধীরে ধীরে হাঁটাটা আর শুধু ওজন কমানোর একটি কৌশল থাকবে না এটি হয়ে উঠবে নিজের শরীরের প্রতি প্রতিদিনের ছোট্ট যত্ন। কারণ সুস্থ শরীর সব সময় বড় কোনো সিদ্ধান্ত থেকে তৈরি হয় না। অনেক সময় প্রতিদিনের কয়েক হাজার ছোট পদক্ষেপই সেই পরিবর্তনের শুরু।
সূত্র: স্ট্রাভা হেলদি লাইফ
ছবি: এআই