ডায়েট ভিডিও নাকি ডিজিটাল ফাঁদ? জেন–জিদের জন্য ইউটিউবের অ্যালগরিদম নিয়ে নতুন গবেষণায় মিলল চাঞ্চল্যকর তথ্য
শেয়ার করুন
ফলো করুন

সুস্থ জীবনযাপন, শরীরচর্চা কিংবা ওজন নিয়ন্ত্রণ এসব বিষয়ে তথ্য পেতে এখন অনেকেই ইউটিউমুখী। কিন্তু কোনো একটি ভিডিও দেখার পর অ্যালগরিদম যখন একই ধরনের আরও ভিডিও সামনে আনতে থাকে, তখন সেই আগ্রহই কখনও কখনও তৈরি করতে পারে বিপজ্জনক এক চক্র। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও উদ্বেগের।

সম্প্রতি ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর কাউন্টারিং ডিজিটাল হেট (সিসিডিএইচ)-এর এক গবেষণায় উঠে এসেছে এমনই তথ্য। যুক্তরাজ্যে ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরীর আদলে তৈরি করা পরীক্ষামূলক অ্যাকাউন্ট দিয়ে কয়েকটি ডায়েট ও শরীরের গঠনসংক্রান্ত ভিডিও দেখার পর ইউটিউব যে ১০০টি ভিডিও সামনে এনেছে, তার প্রতি ১০টির মধ্যে একটি ছিল খাদ্যাভ্যাসজনিত সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে এমন কনটেন্ট।

আগের চেয়ে উন্নতি হলেও উদ্বেগ কাটেনি

গবেষণায় অবশ্য একটি ইতিবাচক দিকও দেখা গেছে। ২০২৪ সালে একই ধরনের পরীক্ষায় প্রতি চারটি ভিডিওর মধ্যে একটি ক্ষতিকর কনটেন্ট হিসেবে সামনে এসেছিল। এবার সেই হার কমে প্রতি ১০টিতে একটিতে নেমেছে।

অর্থাৎ আগের তুলনায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে গবেষকদের আশঙ্কা, ক্ষতিকর কনটেন্টের পরিমাণ কমে এলেও ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয়নি। কারণ একজন কিশোর বা কিশোরীর সামনে বারবার শরীর, খাবার কিংবা ওজন নিয়ে নেতিবাচক বার্তা পৌঁছানো তার নিজের শরীর সম্পর্কে ধারণা ও আত্মবিশ্বাসে প্রভাব ফেলতে পারে।

কী ধরনের ভিডিও সামনে এসেছে?

গবেষণায় পরীক্ষামূলক অ্যাকাউন্টে যেসব ভিডিওর সাজেশন এসেছে, তার মধ্যে ছিল

* অতিরিক্ত রোগা শরীরকে আদর্শ হিসেবে তুলে ধরা ভিডিও

* মাত্র ১৭০ ক্যালরির খাবারের তালিকা অনুসরণের পরামর্শ

* খুব দ্রুত ওজন কমানোর অবৈজ্ঞানিক দাবি

* নিজের শরীর নিয়ে অসন্তুষ্টি তৈরি করতে পারে, এমন নানা বার্তা

সমস্যা হলো, এমন ভিডিও একবার সামনে আসার পর একই ধরনের আরও কনটেন্ট দেখার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। ফলে একজন কিশোর-কিশোরী নিজের শরীর, খাবার কিংবা ওজন নিয়ে অযথা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়তে পারে।

বিজ্ঞাপন

শুধু ফিট থাকার ইচ্ছায় শুরু

এর বাস্তব উদাহরণও রয়েছে। যুক্তরাজ্যের জ্যাজমিন কৌর মাত্র ১৩ বছর বয়সে অ্যানোরেক্সিয়ায় আক্রান্ত হন। চিকিৎসার দীর্ঘ সময়জুড়ে তিনি ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করতেন।

তার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, শুরুটা হয়েছিল সুস্থ ও ফিট থাকার ইচ্ছা থেকেই। কিন্তু ধীরে ধীরে এমন কিছু ভিডিও তার সামনে আসতে থাকে, যা তার অসুস্থ চিন্তাভাবনাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ওঠার পর নিজের মানসিক সুস্থতার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেন তিনি। বর্তমানে শিশু নার্সিংয়ে স্নাতকোত্তর করছেন এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন।
এই অভিজ্ঞতা দেখায়, একটি সাধারণ ফিটনেস ভিডিও থেকে শুরু হওয়া বিষয়টি কখনও কখনও কীভাবে আরও জটিল দিকে এগিয়ে যেতে পারে।

আইন আছে, কিন্তু সুরক্ষা কতটা নিশ্চিত?

যুক্তরাজ্যে ২০২৫ সালে কার্যকর হওয়া অনলাইন নিরাপত্তা আইনে ১৮ বছরের কম বয়সীদের আত্মক্ষতি, আত্মহত্যা কিংবা খাদ্যাভ্যাসজনিত ব্যাধিকে উৎসাহিত করে। এমন কনটেন্ট থেকে সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর আইনি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অ্যালগরিদম কী ধরনের ভিডিও কিশোর-কিশোরীদের সামনে নিয়ে আসছে, সেটিও পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

তবে নতুন গবেষণার ফল বলছে, নিয়ম ও নীতিমালা থাকার পরও বাস্তবে কিশোর ব্যবহারকারীদের সামনে ক্ষতিকর কনটেন্ট পৌঁছে যাওয়ার ঝুঁকি এখনও পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি।

ইউটিউবের বক্তব্য কী?

ইউটিউবের মালিক প্রতিষ্ঠান গুগল জানিয়েছে, খাদ্যাভ্যাসজনিত ব্যাধিকে উৎসাহিত করে এমন কনটেন্ট তাদের নীতিমালার পরিপন্থী। গবেষণায় চিহ্নিত ভিডিওগুলোও ইতোমধ্যে সরিয়ে ফেলা হয়েছে বলে জানিয়েছে তারা।

গুগলের দাবি, কিশোর ব্যবহারকারীরা মানসিক স্বাস্থ্য, হতাশা কিংবা খাদ্যাভ্যাসজনিত সমস্যা নিয়ে খোঁজ করলে এখন বিশেষজ্ঞদের তৈরি নির্ভরযোগ্য তথ্য ও সহায়তামূলক ভিডিও সামনে আনার ব্যবস্থা রয়েছে।

তবে গবেষণাটি দেখাচ্ছে, শুধু ক্ষতিকর ভিডিও সরিয়ে ফেলাই যথেষ্ট নয়। ব্যবহারকারীর আগের দেখার অভ্যাসের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী ভিডিও কীভাবে সাজেশন হিসেবে আসছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

বিজ্ঞাপন

শুধু প্ল্যাটফর্ম নয়, সচেতনতাও জরুরি

Anna Avilova

এক বাক্যে বলা যাবে না সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভালো বা খারাপ। এখানে যেমন মানসিক স্বাস্থ্য, শরীরচর্চা ও সুস্থ জীবনযাপন নিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া যায়, তেমনই ভুল বা ক্ষতিকর ধারণাও দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

তাই কিশোর-কিশোরী ও অভিভাবকদেরও কিছু বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি। অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সময় নির্দিষ্ট করে নেওয়া, অস্বস্তিকর বা ক্ষতিকর কনটেন্টে ‘নট ইন্টারেস্টেড’ বাটন ক্লিক করা এবং প্রয়োজন হলে কোনো অ্যাকাউন্ট ব্লক বা রিপোর্ট করা যেতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা কোনো ডায়েট, দ্রুত ওজন কমানোর পদ্ধতি বা শরীরচর্চার পরামর্শকে নিজের জন্য চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ধরে না নেওয়া।

সৌন্দর্যের সংজ্ঞা বদলানোও জরুরি

ডিজিটাল দুনিয়ায় সৌন্দর্যের একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ড তৈরি করার প্রবণতা এখন আরও দৃশ্যমান। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বারবার একই ধরনের শরীর বা চেহারাকে ‘আদর্শ’ হিসেবে দেখানো হলে কিশোর-কিশোরীদের মনে নিজের শরীর নিয়ে অস্বস্তি বা ভুল ধারনা তৈরি হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সুস্থ শরীরের কোনো নির্দিষ্ট আকৃতি নেই। প্রত্যেক মানুষের শরীর আলাদা, আর সেই স্বাভাবিক বৈচিত্র্যই প্রকৃত সৌন্দর্যের অংশ।

তাই ডায়েট কিংবা ফিটনেসের লক্ষ্য হওয়া উচিত সুস্থ থাকা, শক্তি ও আত্মবিশ্বাস বাড়ানো। নিজের শরীরকে কোনো নির্দিষ্ট সৌন্দর্যের ছাঁচে ফেলে না দেওয়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম আমাদের সামনে কী আনবে, তার পুরো নিয়ন্ত্রণ হয়তো আমাদের হাতে নেই। কিন্তু কোন কনটেন্ট দেখব, কোনটিকে গুরুত্ব দেব আর কোনটি থেকে দূরে থাকব। সেই সিদ্ধান্তের জায়গাটা এখনও আমাদের হাতেই।

সূত্র: বিবিসি

ছবি: পেকজেলসডটকম

প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬, ১৫: ০০
বিজ্ঞাপন