স্ক্রিন টাইম ইটিং: স্ক্রিনে ভিডিও দেখতে দেখতে খাওয়া যেভাবে ভীষণ ক্ষতি করছে শিশুদের
শেয়ার করুন
ফলো করুন

এখন আধুনিক জীবনব্যবস্থায় নানা ধরনের পরিবর্তন এসেছে। খাদ্য, খাদ্যাভাস, ঘুমের সময়, ঘুমাতে যাওয়ার সময় ইত্যাদি সবকিছুর পরির্বতনে একটা বিশেষ ভূমিকা রয়েছে স্ক্রিনের। অর্থাৎ সেটা মুঠোফোন হোক বা ডেক্সটপ, ট্যাব হোক বা টেলিভিশন। আমরা স্ক্রিনে চোখ রেখে দিনরাতের একটা বড় অংশ ব্যয় করি। এতে সবচেয়ে বেশি অভ্যস্ত হয়ে উঠছে শিশুরা। মায়েদের এত ধরনের কাজ থাকে যে বাচ্চাকে সময় দিতে না পেরে ডিভাইসের সামনে বসিয়ে দিয়ে নিজের কাজগুলো নিশ্চিন্তে করতে পারেন। আর এই ভাবনায় শিশুদের স্ক্রিনে আসক্ত করে তুলছেন আধুনিক মায়েরা। এখন শিশুদের ডিভাইস দেখানো ছাড়া খাওয়ানো যায় না। বাচ্চারা মুঠোফোন না দেখে খেতেও চায় না। অথচ এটা যে কত বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে, সেটা আমরা, বিশেষত অভিভাবকেরা তা জানি না।

শিশুদের স্ক্রিনের প্রতি আসক্ত করে তুলছেন মায়েরা
শিশুদের স্ক্রিনের প্রতি আসক্ত করে তুলছেন মায়েরা

ডিভাইস (যেমন স্মার্টফোন, ট্যাবলেট ও টিভি) দেখে খাবার খাওয়ার অভ্যাস, যা ‘স্ক্রিন টাইম ইটিং’ বা ‘মাইন্ডলেস ইটিং’ নামে পরিচিত, স্বাস্থ্যের ওপর বিভিন্ন নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এই বিষয়ে বেশ কিছু গবেষণা আছে, যেখানে শারীরিক, মানসিক ও পুষ্টিসংক্রান্ত সমস্যাগুলো তুলে ধরা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

মাইন্ডলেস ইটিংয়ের বিরূপ প্রভাব

• ডিভাইস দেখার সময় খাবার খেলে মনোযোগ খাবারের দিকে কম থাকে। ফলে ‘মাইন্ডফুল ইটিং’ বা সচেতনভাবে খাওয়া ব্যাহত হয়; ফলে মানুষ বেশি খেয়ে ফেলতে পারে। ২০১৩ সালে আমেরিকান জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশনের গবেষণায় দেখা যায়, স্ক্রিনের সামনে খাওয়ার সময় মানুষ খাবারের পরিমাণ সম্পর্কে কম সচেতন থাকে এবং পরবর্তী সময়ে বেশি ক্ষুধা অনুভব করে। এতে অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ করা হয়, যা ওজন বৃদ্ধি বা স্থূলতার কারণ হতে পারে। এটা শিশুদের ক্ষেত্রে এটি দীর্ঘমেয়াদে স্থূলতার ঝুঁকি বাড়ায়। ডিভাইস দেখার সময় ফাস্ট ফুড বা অস্বাস্থ্যকর স্ন্যাকস খাওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে, যা থেকে হজম প্রক্রিয়ার সমস্যা হয়।

স্ক্রিন আসক্তি থেকে শিশুদের বিরত রাখা দরকার
স্ক্রিন আসক্তি থেকে শিশুদের বিরত রাখা দরকার

• স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে খাওয়ার সময় মস্তিষ্ক খাবারের সংকেত সঠিকভাবে প্রক্রিয়া করতে পারে না। এতে হজমের এনজাইম নিঃসরণে ব্যাঘাত ঘটে। একটি গবেষণায় বলা হয়, মনোযোগ বিভ্রান্ত হলে পাকস্থলী ও অন্ত্রের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে, যার কারণে বদহজম, পেট ফাঁপা বা গ্যাসের সমস্যা হয়। খাবার থেকে পুষ্টি শোষণও বাধাগ্রস্ত হয়।

বিজ্ঞাপন

• দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা (বিশেষ করে খাওয়ার সময়) চোখের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এটি ডিজিটাল আই স্ট্রেন বা কম্পিউটার ভিশন সিনড্রোমের কারণ হতে পারে। এতে চোখের শুষ্কতা, জ্বালাপোড়া, দীর্ঘমেয়াদে দৃষ্টিশক্তির ক্ষতি ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব পড়ে।

স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে খাওয়া উচিৎ নয়
স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে খাওয়া উচিৎ নয়

• ডিভাইসে সোশ্যাল মিডিয়া বা খবর দেখার সময় খাওয়া মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। নেতিবাচক কনটেন্ট (যেমন খারাপ খবর বা তুলনামূলক পোস্ট) মনকে অস্থির করে। স্ক্রিন টাইম ও উদ্বেগের মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে। খাওয়ার সময় শান্তি বা আনন্দের পরিবর্তে মানসিক অস্থিরতা। দীর্ঘমেয়াদে ডিপ্রেশন বা উদ্বেগজনিত সমস্যা দেখা দেয়, যাতে খাওয়ার আনন্দ হ্রাস পায়।

• খাবারের স্বাদ, গন্ধ ও টেক্সচার উপভোগ করার জন্য মনোযোগ প্রয়োজন। স্ক্রিনে মনোযোগ থাকলে খাবারের সঙ্গে মানসিক সংযোগ কমে যায়। যার ফলে খাবার থেকে তৃপ্তি কম পাওয়া। খাওয়ার অভ্যাসে অসন্তুষ্টি থেকে যায়। পুষ্টিসংক্রান্ত প্রভাব দেখা দেয়।

• স্ক্রিনের সামনে খাওয়ার সময় মানুষ সাধারণত ফাস্ট ফুড, চিপস, কোল্ড ড্রিংকস বা প্রক্রিয়াজাত খাবার বেছে নেন। টিভি বা ডিভাইস দেখার সময় অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার আশঙ্কা ৬৫ শতাংশ বেশি বেড়িয়ে দেয়, যার কারণে শিশুর পুষ্টির ঘাটতি হতে থাকে, বেশি চিনি, লবণ ও চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণ, যা ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ বা উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ায়। স্ক্রিনে মনোযোগ থাকলে মস্তিষ্কের স্যাটিয়েশন সিগন্যাল (পেট ভরার সংকেত) দুর্বল হয়। ফলে মানুষ প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত খান।

স্ক্রিন আসক্তিশিশুদের জন্য বিশেষ ক্ষতিকর
স্ক্রিন আসক্তিশিশুদের জন্য বিশেষ ক্ষতিকর

• পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে খাওয়ার সময় ডিভাইস ব্যবহার সামাজিক সংযোগ কমায়। যৌথভাবে খাওয়ার সময় স্ক্রিন ব্যবহার করলে পারিবারিক সম্পর্ক দুর্বল হয়। সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, শিশুদের মধ্যে সামাজিক দক্ষতা বিকাশে বাধা, শিশুদের ওপর বিশেষ প্রভাব পড়ে।

• শিশুদের ক্ষেত্রে ডিভাইস দেখে খাওয়ার অভ্যাস বিশেষভাবে ক্ষতিকর। এটি শিশুদের খাবারের প্রতি স্বাস্থ্যকর সম্পর্ক গড়ে তুলতে বাধা দেয়। খাবারের প্রতি বাছবিচার বাড়ে (picky eating)। পুষ্টির ঘাটতি ও বৃদ্ধির সমস্যায় মানসিক বিকাশে বাধা।

পরামর্শ ও সমাধান

• মাইন্ডফুল ইটিং প্র্যাক্‌টিস করুন: খাওয়ার সময় ডিভাইস বন্ধ রাখুন এবং খাবারের স্বাদ, গন্ধ ও টেক্সচারের দিকে মনোযোগ দিন।
• নির্দিষ্ট খাওয়ার জায়গা: ডাইনিং টেবিলে খাবার খান, যেখানে স্ক্রিন নেই।
• পরিবারের সঙ্গে খাওয়া: পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে খাওয়ার সময় কথোপকথন বাড়ান, যা সামাজিক সংযোগ বাড়ায়।
• স্ক্রিন টাইম সীমিত করা: খাওয়ার সময় ডিভাইস ব্যবহারের পরিবর্তে বই পড়া বা অন্য ক্রিয়েটিভ কাজে মনোযোগ দিন।
• শিশুদের জন্য নিয়ম: শিশুদের খাওয়ার সময় স্ক্রিন ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করুন এবং তাদের খাবারের গল্প বা গেমের মাধ্যমে আকর্ষণ করুন।

ডিভাইস দেখে খাবার খাওয়া শারীরিকভাবে ওজন বৃদ্ধি, হজম সমস্যা, চোখের ক্ষতি ও পুষ্টির ঘাটতির কারণ হতে পারে। মানসিকভাবে এটি উদ্বেগ, অসন্তুষ্টি ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বাড়ায়। শিশুদের ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে ক্ষতিকর। বিজ্ঞান মাইন্ডফুল ইটিং ও স্ক্রিনমুক্ত খাওয়ার পরিবেশের পরামর্শ দেয়। এটা বড়দের জন্য প্রযোজ্য!

লেখক: খাদ্য ও পথ্য বিশেষজ্ঞ; প্রধান নির্বাহী, প্রাকৃতিক নিরাময় কেন্দ্র

ছবি: পেকজেলসডটকম

প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৫, ০৬: ২১
বিজ্ঞাপন