
পটাশিয়াম একটি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদান ও ইলেকট্রোলাইট। এটি শরীরের প্রতিটি কোষে থাকে এবং স্বাভাবিক কাজকর্মের জন্য অত্যন্ত জরুরি। শরীরের মোট পটাশিয়ামের প্রায় ৯৮ শতাংশ কোষের ভেতরে থাকে (বিশেষ করে পেশিতে)। পটাশিয়ামের প্রধান কাজ পেশির সংকোচন-প্রসারণ এবং স্নায়ুর সংকেত প্রেরণে সাহায্য করে, হৃৎপিণ্ডের ছন্দ ও হৃৎস্পন্দন নিয়মিত রাখে, কোষের ভেতরে-বাইরে তরলের ভারসাম্য বজায় রাখে, সোডিয়ামের বিপরীতে কাজ করে, অতিরিক্ত সোডিয়ামের ক্ষতিকর প্রভাব কমিয়ে উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধে সাহায্য করে, কিডনিতে পুষ্টি কোষে প্রবেশ এবং বর্জ্য বের করতে সাহায্য করে। মোট কথা পটাশিয়াম ছাড়া শরীরের পেশি, হৃৎপিণ্ড ও স্নায়ু সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। এটি এমন একটি উপাদান, যা কম হলেও সমস্যা আবার বেশি হলেও সমস্যা।
শরীরে পটাশিয়াম কমে যাওয়া (হাইপোক্যালেমিয়া) কেন হয়, তার ক্ষতি কী এবং কীভাবে পূরণ করবেন, সেটা জানা প্রয়োজন। কারণ, এটা একটা খুব সাধারণ কিন্তু গুরুতর সমস্যা। রক্তে এর মাত্রা সাধারণত ৩.৫–৫.০ মিলিইকুইভ্যালেন্ট/লিটার থাকে।
পটাশিয়ামের জন্য কোনো নির্দিষ্ট আরডিএ খুব বেশি কাজ করে না, মানুষের প্রয়োজন ভিন্নতা থাকে, তাই সুস্থ মানুষের জন্য একটা সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
• পুরুষ: ৩,৪০০ এমজি (এমজি) প্রতিদিন
• মহিলা: ২,৬০০ এমজি (এমজি) প্রতিদিন
• স্তন্যদানকারী মহিলা: ২,৮০০ এমজি
• শিশু (১-৩ বছর): ২,০০০ এমজি
• ৪-৮ বছর: ২,৩০০ এমজি
• ৯-১৩ বছর: ছেলে ২,৫০০ এমজি, মেয়ে ২,৩০০ এমজি
• ১৪-১৮ বছর: ছেলে ৩,০০০ এমজি, মেয়ে ২,৩০০ এমজি

বেশির ভাগ মানুষ (বিশেষ করে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায়) প্রতিদিন যথেষ্ট পটাশিয়াম পায় না, গড়ে ২,০০০–৩,০০০ এমজির কম খায়। ফলে পটাশিয়ামের ঘাটতি (হাইপোক্যালেমিয়া) হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
পটাশিয়াম কম হলে—
• কিডনির সমস্যা থাকলে পটাশিয়াম কমাতে হতে পারে, কারণ অতিরিক্ত পটাশিয়ামও বিপজ্জনক (হাইপারক্যালেমিয়া)।
• সবচেয়ে ভালো উপায়: খাবার থেকে পটাশিয়াম নেওয়া (কলা, আলু, শাক, ডাল, কমলা, দই ইত্যাদি)।
পটাশিয়াম কমার প্রধান কারণগুলো হলো
• অতিরিক্ত পটাশিয়াম হারানো: বমি, ডায়রিয়া, অতিরিক্ত ঘাম (গরমে বা ব্যায়ামে), ল্যাক্সেটিভ বা মূত্রবর্ধক ওষুধ (ডায়ুরেটিকস)।
• কিডনি সমস্যা: কিডনি সঠিকভাবে পটাশিয়াম ধরে রাখতে পারে না।
• কম খাওয়া: খাদ্যে পটাশিয়াম কম থাকলে (যেমন শাকসবজি-ফল কম খেলে)।
• অন্যান্য: অ্যালকোহলের অতিরিক্ত ব্যবহার, খাওয়ার ব্যাধি, কিছু ওষুধ (অ্যান্টিবায়োটিক, ইনসুলিন), ম্যাগনেশিয়ামের ঘাটতি বা শরীরের ভেতরে পটাশিয়াম স্থানান্তরিত হয়ে যাওয়া।
• সাধারণত বমি-ডায়রিয়া বা ওষুধের কারণে এটা হয়।
পটাশিয়াম কমলে কী কী ক্ষতি হতে পারে?
পটাশিয়াম কমলে শরীরের বিভিন্ন অংশ প্রভাবিত হয়। লক্ষণ ও জটিলতা নিম্নরূপ:

সাধারণ লক্ষণ
• পেশির দুর্বলতা, ক্র্যাম্প বা খিঁচুনি
• অতিরিক্ত ক্লান্তি ও দুর্বলতা
• কোষ্ঠকাঠিন্য
• হৃৎস্পন্দন অনিয়মিত (পালপিটেশন বা ধড়ফড়)
গুরুতর ক্ষতি
• হার্টের ছন্দের মারাত্মক সমস্যা (অ্যারিদমিয়া), যা হার্ট ফেলিওর বা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ায়
• পেশির প্যারালাইসিস (অবশ হয়ে যাওয়া)
• শ্বাসকষ্ট বা শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা
• রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া
• কিডনির ক্ষতি বা দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা
খুব গুরুতর ক্ষেত্রে এটা জীবনঘাতী হতে পারে। তাই লক্ষণ দেখলেই ডাক্তার দেখানো জরুরি।

প্রতিদিন প্রায় ৩৫০০–৪৭০০ এমজি পটাশিয়াম দরকার। পটাশিয়াম-সমৃদ্ধ সাধারণ খাবার (প্রতি সার্ভিংয়ে আনুমানিক পরিমাণ):
• কলা: ১টি মাঝারি কলা ৪২০–৫২০ এমজি (সবচেয়ে সহজ উপায়)
• মিষ্টি আলু (সেদ্ধ): ১টি মাঝারি ৫৭০–৯২৫ এমজি কলার চেয়ে বেশি তবে ক্ষতি কম।
• পালংশাক: ১ কাপ রান্না করা ৮৪০ এমজি, শুধু শীতকালে।
• অন্যান্য সবুজ শাক, মৌসুম বুঝে খেতে হবে এতে ৭০০ থেকে ৮০০ এমজি পাওয়া যায়।
• কমলা/কমলার রস-১ কাপ রস ৫০০ এমজি
• মসুর ডাল: ১ কাপ রান্না করা ৭০০ এমজি
• দই/দুধ: ১ কাপ ৩৭০–৪০০ এমজি
• টমেটো/টমেটোর রস—ভালো উৎস
• অন্যান্য: খেজুর, কিশমিশ, তরমুজ, বিট, মাশরুম, বিনস ইত্যাদি।
প্রতিদিন চার–পাঁচটি পটাশিয়াম-সমৃদ্ধ খাবার রাখুন (যেমন: সকালে কলা, দই, দুপুরে ডাল-শাক-আলু)।
সতর্কতা: কিডনির সমস্যা থাকলে বা ওষুধ খেলে অবশ্যই ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে খাবার নির্বাচন করুন, অতিরিক্ত পটাশিয়ামও ক্ষতিকর হতে পারে।
পটাশিয়াম একটি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদান ও ইলেকট্রোলাইট। এটি শরীরের প্রতিটি কোষে থাকে এবং স্বাভাবিক কাজকর্মের জন্য অত্যন্ত জরুরি। যার জন্য এটা প্রতিদিন হিসাব করে খেতে হবে।
লেখক: খাদ্য ও পথ্যবিশেষজ্ঞ, প্রধান নির্বাহী, প্রাকৃতিক নিরাময় কেন্দ্র
ছবি: পেকেজলসডটকম