বিশ্বকাপে মধ্যরাতের ম্যাচ, এলোমেলো বডি ক্লক: করণীয় জেনে নিন
শেয়ার করুন
ফলো করুন

বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো প্রায়ই রাতে বা মধ্যরাতে হয় বলে অনেকের ঘুমের সময়সূচি (সার্কাডিয়ান রিদম বা বডি ক্লক) বিপর্যস্ত হয়। সার্কাডিয়ান রিদম হলো আমাদের শরীরের অভ্যন্তরীণ ২৪ ঘণ্টার ঘড়ি, যা ঘুম, হরমোন, মেটাবলিজম ও এনার্জি নিয়ন্ত্রণ করে। রাতের ম্যাচ দেখতে জাগলে এটি শরীরে নানা সমস্যা হয়। যখন আপনার ঘুমে থাকার কথা, তখন রাত জেগে খেলা দেখছেন। এতে বেশি রাত অবধি খেলা দেখার কারণে কাজের সময়েও ঠিকমতো কাজ করতে পারছেন না। দায়িত্বপূর্ণ কাজের সময়ের সঙ্গে আপনার কিছু শারীরিক সমস্যাও হতে পারে। এতে ঘুমের সমস্যা, ক্লান্তি, মেটাবলিজমের গোলমাল, ওজন বাড়া, হজমের সমস্যা ও দীর্ঘ মেয়াদে হার্ট ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে সঠিক কৌশলে এটি ম্যানেজ করা যায়। নিচে বিস্তারিত পরামর্শ আছে, তা মেনে চলতে পারেন।

মাঝরাতে লেখা দেখলে আমাদের বডিক্লক বদলে যায়
মাঝরাতে লেখা দেখলে আমাদের বডিক্লক বদলে যায়

খেলার সময় মধ্যরাতে, ভোরে বা সকালে। ভোরে যে খেলাগুলো দেখবেন, তা সহজেই দেখতে পারবেন। সময়ের তেমন উল্লেখযোগ্য রিদম নষ্ট হবে না; বরং পুরোনো রিদম থেকে এটা ভালো অভ্যাস হতে পারে, যদি নিয়মিত সকালে উঠতে পারেন। সমস্যা হচ্ছে রাত একটা বা দুইটার খেলা দেখা নিয়ে। কারণ, তখন ঘুমানের সময়, কিন্তু আপনি জেগে থাকবেন। সেই সঙ্গে রাত জেগেও দিনের কাজগুলো ঠিকমতো করতে হলেই আপনার রিদম ঠিক রাখা মুশকিল।

বিজ্ঞাপন

বডি ক্লক (সার্কাডিয়ান রিদম) ম্যানেজ করার উপায়

আমাদের শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ি সূর্যের আলো, খাবারের সময়, ব্যায়াম ও ঘুমের ওপর নির্ভর করে। রাত জাগলে এই রিদম নষ্ট হয়।
কী করতে পারেন
আলোর ব্যবস্থাপনা: সকালে ১৫ থেকে ৪৫ মিনিট সূর্যের আলো নিন। এটি বডি ক্লককে রিসেট করে সতর্কতা বাড়ায়। রাতে খেলা দেখার সময় ব্লু লাইট (মুঠোফোন বা টিভি) কমানোর জন্য নাইট মোড বা ব্লু লাইট ব্লকার গ্লাস ব্যবহার করুন। খেলা শেষে ঘর অন্ধকার রাখুন।

খেলার আগে পাওয়ার ন্যাপ নেওয়া যেতে পারে
খেলার আগে পাওয়ার ন্যাপ নেওয়া যেতে পারে

ঘুমের পরিকল্পনা
• খেলার আগে এক থেকে দুই ঘণ্টা ন্যাপ নিন (পাওয়ার ন্যাপ)।
• খেলা শেষে সকালে ঘুমানোর চেষ্টা করুন, কিন্তু টোটাল স্লিপ ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা রাখুন।
• যতটা সম্ভব নিয়মিত ঘুমের সময় বজায় রাখুন। অস্থির ঘুম বডি ক্লক আরও নষ্ট করে।

বিজ্ঞাপন

খেলা দেখার সময় কী খাবেন
রাতে খাওয়া শরীরের মেটাবলিজমের জন্য খারাপ। কারণ, রাতে ইনসুলিন সেন্সিটিভিটি কমে এবং গ্লুকোজ প্রসেসিং সঠিক হয় না। নাইট শিফট ওয়ার্কারদের গবেষণায় দেখা গেছে যে রাতে বেশি খাওয়া ওজন বাড়ায়, ডায়াবেটিস ও হার্টের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই লাইট স্ন্যাকস ও সময়মতো খান।

খাওয়া যেতে পারে পপকর্ন
খাওয়া যেতে পারে পপকর্ন

সেরা খাবার
• কয়েক ধরনের বাদাম (বিশেষ করে চিনাবাদাম, কাজুবাদাম রোস্টেড) চিবিয়ে খান। একজনের জন্য ৪০ গ্রাম, যেন অতিরিক্ত না হয়।
• পপকর্ন খেতে পারেন। এটি রাতের জন্য ভালো খাবার।
• এক গ্লাস নাট মিল্ক খেতে পারেন।
• ঘরে বানানো নাড়ু খেতে পারেন।
• পনির খেতে পারেন।
• সেদ্ধ ডিম খেতে পারেন।
• যেকোনো ধরনের স্যুপ খেতে পারেন।
রাতের খাবারে মেইন ডিশ আগেই খাবেন। রাতে খেলা দেখার সময় মেইন ডিশ খাবেন না। রাতের খাবারে প্রোটিন, ফাইবার ও কমপ্লেক্স কার্বসযুক্ত হালকা খাবার হওয়া জরুরি। এগুলো এনার্জি স্থির রাখে, হজম সহজ করে এবং ঘুমে সাহায্য করে।

টিপস
• যদি ওজন কমাতে চান: রাতের কার্ব কমিয়ে দিন (রুটি বা ভাত কম)।
• যদি মাসল বিল্ড করতে চান: প্রোটিন বাড়ান (ডিম, চিকেন, দই)।
• প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ওঠার চেষ্টা করুন, এমনকি ছুটির দিনেও। এতে বডি ক্লক স্থিতিশীল হয়।
• ম্যাচ শেষে সকালে ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমানোর টার্গেট রাখুন। যদি পুরোটা না হয়, তাহলে পাওয়ার ন্যাপ (২০ থেকে ৩০ মিনিট) নিন ম্যাচের আগে বা পরে।
• ধীরে ধীরে সময় অ্যাডজাস্ট করুন: প্রতি তিন থেকে পাঁচ দিনে ১৫–২০ মিনিট করে আগে ঘুমানোর চেষ্টা।
• সকালে: উঠেই ১৫ থেকে ৩০ মিনিট সূর্যের আলো নিন বা ব্রাইট লাইট ব্যবহার করুন। আগেই বলেছি, এটি বডি ক্লক রিসেট করে সতর্কতা বাড়ায়।
• ম্যাচের সময় হালকা প্রোটিনভিত্তিক স্ন্যাকস খান (আগের প্ল্যান অনুসরণ করুন)। রাত ১২টার পর ভারী খাবার এড়িয়ে চলুন।
• ক্যাফেইন: ম্যাচ শুরুর আগে নিন। শেষের দিকে এড়িয়ে চলুন (ঘুমের ছয় ঘণ্টা আগে বন্ধ)।
• ঘুমানোর দুই থেকে তিন ঘণ্টা আগে খাওয়া শেষ করুন।
এড়িয়ে চলুন: চিনিসমৃদ্ধ খাবার (সোডা, মিষ্টি, চিপস, সফট ড্রিংকস, ফাস্টফুড), ভাজা খাবার, ভারী মাংস ও অ্যালকোহল। এগুলো ব্লাড সুগার স্পাইক করে পরে ঘুম ভাঙায় এবং ক্লান্তি বাড়ায়।
এই অভ্যাসগুলো নিয়মিত অনুসরণ করলে ঘুমের মান অনেক উন্নত হবে, ক্লান্তি কমবে এবং বিশ্বকাপ উপভোগ করতে পারবেন। ভালো ঘুম, ভালো স্বাস্থ্য, ম্যাচ দেখুন, কিন্তু শরীরের যত্ন নিন!

লেখক: খাদ্য ও পথ্য বিশেষজ্ঞ, প্রধান নির্বাহী, প্রাকৃতিক নিরাময় কেন্দ্র

ছবি: এআই, পেকেজেলসডটকম

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ০১: ০০
বিজ্ঞাপন