শরীরে সোডিয়াম কমে যাওয়া কতটা মারাত্মক
শেয়ার করুন
ফলো করুন

রাতে ঘুমিয়ে আছেন, হঠাৎ পায়ের পেশিতে টান লাগল, কোনোভাবেই পা আর সোজা করতে পারছেন না। কিছু সময় পর আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়। এটিকে ক্র্যাম্পিং বা খিঁচ ধরা বলে। এই সমস্যা মূলত ইলেকট্রোলাইট ঘাটতির জন্য হয়ে থাকে। এই ইলেকট্রোলাইটের মধ্যে সোডিয়াম ঘাটতি একটি বড় কারণ। সেই সঙ্গে যদি হয় দৃষ্টি ঘোলা, মাথা তোলা যাচ্ছে না, শরীর অসাড় হয়ে যাচ্ছে, তখনই বুঝতে হবে এটি বড় বিপৎসংকেত। কারণ, রক্তে সোডিয়ামের স্বাভাবিক মাত্রার [১৩৫–১৪৫ mEq/L (প্রতি লিটারে মিলিইকুইভ্যালেন্ট)] গেলে এমন লক্ষণ দেখা যায়, একে হাইপোনাট্রেমিয়া বলা হয়।

সোডিয়াম শরীরের তরল ভারসাম্য, স্নায়ু ও পেশির কাজ ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
সোডিয়াম শরীরের তরল ভারসাম্য, স্নায়ু ও পেশির কাজ ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ

সোডিয়াম শরীরের তরল ভারসাম্য, স্নায়ু ও পেশির কাজ ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি কমলে শরীরের কোষগুলোয়, বিশেষ করে মস্তিষ্কের কোষে পানি ঢুকে যায়, যা অসমোটিক অসমতুল্যতা তৈরি করে। এ সময় আমাদের একটা ধারণা থেকে প্রচুর পানি পান করার রেওয়াজ আছে, যা পুরোটাই ভুল। যার কারণে অনেক বিপদ হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

কী কারণে শরীরে সোডিয়াম কমে যায়

হাইপোনাট্রেমিয়া মূলত দুভাবে হয়
• শরীরে সোডিয়ামের পরিমাণ কমে যাওয়া (সোডিয়াম হারানো)।
• শরীরে পানির পরিমাণ বেড়ে যাওয়া (পানির কারণে সোডিয়াম পাতলা হয়ে যাওয়া) এটাই সবচেয়ে সাধারণ কারণ।

সোডিয়ামের ঘনত্ব নির্ভর করে শরীরের মোট সোডিয়ামের পরিমাণ ও পানির পরিমাণের ওপর। কিডনি, হরমোন (এডিএইচ বা ভ্যাসোপ্রেসিন) এবং থার্স্ট মেকানিজম এই ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে। এডিএইচ হরমোন কিডনিতে পানি ধরে রাখে। এর অতিরিক্ত কাজ হলে পানি বেশি জমে সোডিয়াম পাতলা হয়।

সোডিয়াম কমে গেলে কেবল মাসল ক্র্যাম নয়, অনেক সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে
সোডিয়াম কমে গেলে কেবল মাসল ক্র্যাম নয়, অনেক সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে

প্রধান কারণগুলো
• হাইপোভোলেমিক হাইপোনাট্রেমিয়া (শরীরে তরল কম):
ডায়রিয়া, বমি, অতিরিক্ত ঘাম, ডাইইউরেটিক ওষুধ (থিয়াজাইড), অ্যাড্রিনাল গ্রন্থির সমস্যা (অ্যাডিসন রোগ)। এতে সোডিয়াম ও পানি দুটিই হারায়, কিন্তু পানির চেয়ে সোডিয়াম বেশি হারায়।
• ইউভোলেমিক হাইপোনাট্রেমিয়া (তরল স্বাভাবিক):
এসআইএডিএইচ (সিনড্রোম অব ইনঅ্যাপ্রোপ্রিয়েট অ্যান্টিডাইইউরেটিক হরমোন) মস্তিষ্কের টিউমার, ফুসফুসের সমস্যা বা ওষুধের কারণে এডিএইচ অতিরিক্ত নিঃসৃত হয়। ফলে কিডনি অতিরিক্ত পানি ধরে রাখে। থাইরয়েড কমে (হাইপোথাইরয়েডিজম), গ্লুকোকর্টিকয়েডের অভাব হয়।
• হাইপারভোলেমিক হাইপোনাট্রেমিয়া (তরল বেশি):
হার্ট ফেইলিওর, লিভার সিরোসিস, কিডনি ফেইলিওর হলে শরীরে পানি জমে, কিন্তু সোডিয়াম বাড়ে না। ফলে রক্তে সোডিয়াম পাতলা হয়।

বিজ্ঞাপন

অন্যান্য কারণ

অতিরিক্ত পানি পান (বিশেষ করে ম্যারাথন দৌড়বিদদের মধ্যে), কিছু ওষুধ (অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট, পেইন কিলার, কার্বামাজেপাইন), অতিরিক্ত অ্যালকোহল, গ্লুকোজের অতিরিক্ত মাত্রা (হাইপারগ্লাইসেমিয়া)।
এসব কারণে শরীরের অসমোলালিটি কমে যায়, যা কোষের বাইরে থেকে ভেতরে পানি টেনে নেয়।

সোডিয়াম কমে গেলে কী ক্ষতি হয়

সোডিয়াম কমে গেলে সেটা জীবনঘাতীও হতে পারে
সোডিয়াম কমে গেলে সেটা জীবনঘাতীও হতে পারে

সোডিয়াম কমলে রক্তের অসমোলালিটি কমে, পানি কোষে ঢোকে, কোষ ফুলে যায় (সেলুলার এডিমা)। মস্তিষ্কের খুলিতে জায়গা কম থাকায় এটি সবচেয়ে বিপজ্জনক।
লক্ষণ
• হালকা (১৩০–১৩৪ mEq/L): মাথাব্যথা, ক্লান্তি, বমি বমি ভাব, অবসাদ ও পেশি দুর্বলতা।
• মাঝারি: বিভ্রান্তি, অস্থিরতা, মাথা ঘোরা ও পেশি খিঁচুনি।
• গুরুতর (<১২০ mEq/L, বিশেষ করে দ্রুত কমলে): খিঁচুনি, কোমা, শ্বাসকষ্ট ও মৃত্যু।
ক্ষতি
• সেরিব্রাল এডিমা (মস্তিষ্ক ফুলে যাওয়া), অ্যাকিউট হাইপোনাট্রেমিয়ায় দ্রুত হয়, হার্নিয়েশন (মস্তিষ্কের অংশ সরে যাওয়া) ও মৃত্যু হতে পারে।
• দীর্ঘমেয়াদি হলে: হাড় ভঙ্গুরতা, পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
• চিকিত্সায় অতিরিক্ত দ্রুত সোডিয়াম বাড়ালে অসমোটিক ডিমাইলিনেশন সিনড্রোম (ওডিএস) হয়, মস্তিষ্কের সাদা পদার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, পক্ষাঘাত, কথা বলতে না পারা ইত্যাদি স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে।

চিকিৎসা কারণ, মাত্রা ও গতির ওপর নির্ভর করে। লক্ষ্য: সোডিয়াম ৪–৬ mEq/L প্রথম ১–২ ঘণ্টায় বাড়ানো (গুরুতর লক্ষণে), ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৮–১০ mEq/L। আবার অতিরিক্ত দ্রুত বাড়ানো যাবে না। তাতে কিডনি বিকল হয়ে যেতে পারে।
• তরল গ্রহণ সীমিত করা (৫০০–১০০০ মিলি/দিন)। লবণযুক্ত খাবার বাড়ানো (টেবিল সল্ট বা সল্ট ট্যাবলেট)। মূল রোগের চিকিত্সা (হার্ট/কিডনি/লিভারের ওষুধ সামঞ্জস্য)।
• হাইপারটনিক স্যালাইন (৩ শতাংশ NaCl) শিরায় দেওয়া, এটি রক্তের অসমোলালিটি দ্রুত বাড়িয়ে পানি কোষ থেকে বের করে। হাসপাতালে ঘন ঘন সোডিয়াম পরীক্ষা করে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।
• ভ্যাপটান ওষুধ (টলভ্যাপটান বা কনিভ্যাপটান), এডিএইচের কাজ বন্ধ করে কিডনি থেকে অতিরিক্ত পানি বের করে (এসআইএডিএইচ–এ কার্যকর)।
• লুপ ডাইইউরেটিক (ফুরোসেমাইড) সঙ্গে স্যালাইন, পানি বের করে সোডিয়াম বাড়ায়।
প্রতিরোধের উপায়
• অতিরিক্ত পানি পান না করা (বিশেষ করে ব্যায়ামের সময় ইলেকট্রোলাইট ড্রিংক পান করা)।
• ডাইইউরেটিক বা অন্য ওষুধ খেলে নিয়মিত সোডিয়াম পরীক্ষা।
• গরমে বা ব্যায়ামের সময় লবণযুক্ত খাবার খাওয়া।
• তাজা সবজি–ফল, ভিটামিন বি–সমৃদ্ধ খাবার (মাছ, ডিম), মাশরুম, নারকেল তেল বা দুধ, অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি হরমোন নিয়ন্ত্রণে তরল ভারসাম্য রক্ষা করে।
• খাবারে সামান্য সমুদ্রের লবণ (সি সল্ট বা পিংক সল্ট) যোগ করুন, এতে অন্যান্য খনিজও পাবেন। অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলুন।

গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

এটি সাধারণ তথ্য। হাইপোনাট্রেমিয়া জীবনঘাতী হতে পারে। লক্ষণ দেখলে অবিলম্বে ডাক্তার বা হাসপাতালে যান। নিজে চিকিৎসা করবেন না, ভুল চিকিৎসায় মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। রক্ত পরীক্ষা (সিরাম সোডিয়াম, অসমোলালিটি, ইউরিন সোডিয়াম বা অসমোলালিটি) করে কারণ নির্ণয় করা জরুরি। প্রত্যেকের শরীর ভিন্ন, তাই কখনো নিজে ওষুধ বন্ধ বা পরিবর্তন করবেন না। যদি আপনি কোনো ওষুধ নিয়মিত খান এবং সোডিয়াম কমার লক্ষণ থাকে, তাহলে অবিলম্বে আপনার ডাক্তার বা এন্ডোক্রাইনোলজিস্টের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। রক্ত পরীক্ষা (সিরাম সোডিয়াম, অসমোলালিটি ও ইউরিন টেস্ট) করে কারণ নির্ণয় করা জরুরি।

লেখক: খাদ্য ও পথ্য বিশেষজ্ঞ, প্রধান নির্বাহী, প্রাকৃতিক নিরাময় কেন্দ্র

ছবি: পেকজেলসডটকম

প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২৬, ০১: ০০
বিজ্ঞাপন