
এক মাসেরও বেশি সময় ধরে রাতের ঘুম, দিনের রুটিন আর অবসর সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু ছিল ফুটবল। মাঝরাতে অ্যালার্ম দিয়ে ম্যাচ দেখা, বন্ধুদের সঙ্গে ওয়াচ পার্টি, প্রিয় দলের জয়ে উচ্ছ্বাস, হারে মন খারাপ সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ যেন জীবনেরই একটি অংশ হয়ে উঠেছিল।
কিন্তু শেষ বাঁশি বাজতেই বদলে যায় দৃশ্যপট। স্টেডিয়ামের আলো নিভে যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কমে আসে ফুটবলের আলোচনা, আর প্রতিদিনের সেই নির্দিষ্ট ম্যাচের সময়টা হঠাৎ করেই ফাঁকা হয়ে যায়। তখন অনেকের মনেই তৈরি হয় এক ধরনের শূন্যতা।

মনোবিজ্ঞানে এই অনুভূতিকে বলা হয় ‘পোস্ট-ইভেন্ট ব্লুজ’। দীর্ঘদিন ধরে কোনো আনন্দঘন আয়োজনের সঙ্গে আবেগের বন্ধন তৈরি হলে সেটি শেষ হওয়ার পর এমন অনুভূতি হওয়া খুবই স্বাভাবিক। সুখবর হলো, এটি সাধারণত সাময়িক। কয়েকটি সহজ অভ্যাসই আপনাকে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে পারে।
বিশ্বকাপ শেষ হয়ে মন খারাপ লাগছে? নিজেকে দোষ দেবেন না। যে টুর্নামেন্ট আপনাকে এত আনন্দ দিয়েছে, সেটি শেষ হলে মন খারাপ হওয়াটাই স্বাভাবিক। অনুভূতিকে গ্রহণ করুন, চাপা দেওয়ার চেষ্টা করবেন না।

বারবার পুরো ম্যাচ দেখার প্রয়োজন নেই। বরং প্রিয় গোল, দুর্দান্ত সেভ, কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে বিশ্বকাপ দেখার ছবিগুলো দেখুন। স্মৃতিগুলোকে হারানোর কষ্ট নয়, বরং আনন্দের অংশ হিসেবে মনে রাখুন।
বিশ্বকাপ দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছেন? এবার নিজেই খেলুন। সপ্তাহে অন্তত একদিন বন্ধুদের নিয়ে ফুটবল খেলুন। শরীরচর্চা মন ভালো রাখার হরমোন এন্ডোরফিন বাড়াতে সাহায্য করে।

বিশ্বকাপের কারণে যেসব কাজ পিছিয়ে গিয়েছিল, এবার সেগুলো শুরু করার সময়। বই পড়া, রান্না শেখা, ছবি তোলা, সাইকেল চালানো কিংবা নতুন কোনো দক্ষতা অর্জন সবই হতে পারে নতুন আনন্দের উৎস।

রাত জেগে ম্যাচ দেখার কারণে অনেকের ঘুমের সময় বদলে গেছে। ধীরে ধীরে আগের রুটিনে ফিরুন। পর্যাপ্ত ঘুম শুধু শরীর নয়, মনকেও সতেজ রাখে।
একই ম্যাচের ক্লিপ, বিতর্ক বা ট্রল বারবার দেখলে শূন্যতার অনুভূতি আরও বাড়তে পারে। কয়েকদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সময় কমিয়ে নিজের জন্য কিছু সময় রাখুন।

যাদের সঙ্গে বিশ্বকাপ দেখেছেন, তাঁদের সঙ্গে আবার দেখা করুন। তবে এবার শুধু ফুটবল নয়, জীবন, কাজ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কিংবা ভ্রমণের গল্পও হোক আড্ডার বিষয়।
নিয়মিত হাঁটুন, ব্যায়াম করুন, পর্যাপ্ত পানি পান করুন এবং পুষ্টিকর খাবার খান। সুযোগ থাকলে কাছাকাছি কোথাও ছোট্ট একটি ভ্রমণও মনকে অনেকটা সতেজ করে দিতে পারে।

বিশ্বকাপ শেষ মানেই ফুটবলের গল্প শেষ নয়। সামনে রয়েছে বিভিন্ন দেশের লিগ, মহাদেশীয় প্রতিযোগিতা, ক্লাব ফুটবল এবং নতুন তারকাদের উত্থান। প্রিয় খেলোয়াড়দের খেলা দেখার সুযোগ থাকছেই।
বিশ্বকাপকে যে সময় দিয়েছেন, তার একটি অংশ এবার নিজের জন্য রাখুন। নতুন কিছু শেখা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, ভ্রমণের পরিকল্পনা বা ব্যক্তিগত কোনো লক্ষ্য পূরণের যাত্রা শুরু করুন। জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলো অনেক সময় মাঠের বাইরেই তৈরি হয়।

বিশ্বকাপ আমাদের আনন্দ দেয়, আবেগ দেয়, স্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দেয়। আবার শেখায়, প্রতিটি উৎসবেরই একদিন সমাপ্তি আছে। তবে সেই সমাপ্তিই নতুন শুরুর দরজা খুলে দেয়।
হয়তো আজ আর মাঝরাতে ম্যাচ দেখার অ্যালার্ম বাজবে না। তবু জীবন নতুন গল্প নিয়ে অপেক্ষা করছে। ফুটবল যেমন আবার ফিরে আসবে, তেমনি ফিরে আসবে নতুন স্বপ্নও। আর এই বিরতির সময়টুকুই হতে পারে নিজের যত্ন নেওয়ার, প্রিয় মানুষদের আরও কাছে আসার এবং জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচটির জন্য প্রস্তুত হওয়ার সময়।
তথ্য: এন এইচ এস ইউ কে
ছবি: এআই