বাদাম না হয়েও বাদামের চেয়ে ভালো
শেয়ার করুন
ফলো করুন

চিনাবাদামকে আমরা বাদাম বলেই জানি। অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে চিনাবাদাম বাদাম নয়! খটকা লাগছে? আসলেই চিনাবাদাম (পিনাটস বা গ্রাউন্ডনাটস) একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও পুষ্টিকর খাদ্য। এটি লেগিউম (ফেবাসিয়া পরিবারের) উদ্ভিদের ফল, যা দক্ষিণ আমেরিকা (বিশেষ করে ব্রাজিল, পেরু) থেকে উদ্ভূত। বৈজ্ঞানিক নাম ‘আরাসিস হাইপোজিয়া’। এটি প্রাচীনকাল থেকে (প্রায় সাত হাজার বছর আগে) চাষ হয়ে আসছে। চিনাবাদাম মাটির নিচে জন্মায় আর সব বাদাম গাছের মগডালে জন্মায়। এমন একটি সহজ চিহ্ন আমাদের বুঝতে সহায়তা করে।
চিনাবাদাম বাদাম না হয়েও পুষ্টিগুণে আমন্ডের চেয়ে এগিয়ে। আমন্ডকে আমরা দামি বাদাম হিসেবে চিনি। পুষ্টিগুণের বিবেচনায় সস্তা দেশীয় চিনাবাদাম কিন্তু আমন্ডের চেয়ে অনেক দিক দিয়েই এগিয়ে।

বিজ্ঞাপন

আমন্ড বনাম চিনাবাদাম: বোটানিক্যাল ও ট্যাক্সোনমিক্যাল পার্থক্য

আমন্ড
বৈজ্ঞানিক নাম: প্রুনাস ডালসিস
পরিবার: রোজেসিয়া
প্রজাতি: ড্র
উদ্ভিদের প্রকার: গাছ (৪-১০ মিটার)
বৈশিষ্ট্য: এন্ডোকার্পি

চিনাবাদাম
বৈজ্ঞানিক নাম: আরাসিস হাইপোজিয়া
পরিবার: ফেবাসিয়া
প্রজাতি: লেগিউম
বৈশিষ্ট্য: জিওকার্পি

বিজ্ঞাপন

তুলনামূলক বিশ্লেষণ

আমন্ড ও চিনাবাদাম উভয়ই উচ্চ পুষ্টিকর বীজ–জাতীয় খাদ্য, কিন্তু বোটানিক্যালি, রাসায়নিক গঠন, পুষ্টি প্রোফাইল, স্বাস্থ্য প্রভাব ও অর্থনৈতিক দিক থেকে এরা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বৈজ্ঞানিকভাবে (ইউএসডিএ, এনআইএইচ, পাবমেড–ভিত্তিক ডেটা) বিস্তারিত তুলনা দেওয়া হলো।

স্বাস্থ্যগত প্রভাব

আমন্ড ও চিনাবাদাম নিয়ে গবেষণায় যে তথ্য পাওয়া গেছে তা হলো—
• হার্টের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে চাইলে আমন্ড রক্তের এলডিএল কমাতে ৫-১০ শতাংশ কাজ করবে। সেখানে চিনাবাদাম এলডিএল ১০-১৪ শতাংশ কাজ করবে।
• ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য ক্ষুধা কমাতে আমন্ড ২৮ গ্রাম দিনে খেলে মাসে ৬ দশমিক ২ কেজি ওজন কমানো যাবে। সেখানে তিন মাসে চিনাবাদাম ৪২ গ্রাম খেলে এক কেজি কমবে। চিনাবাদাম ধীরে ওজন কমাবে।
• ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে গ্লাইসেমিক ইনডেক্স বা জিআই একটি বড় বিষয়। এটা আমন্ডের ক্ষেত্রে ১৫-২০ ধরা হয়ে থাকে, আর চিনাবাদামে ১৪। এটা কম, যা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য খুব ভালো।
• ত্বকের স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করলে যেহেতু আমন্ড বাদামে ভিটামিন ই বেশি, তাই এর তেলও ত্বকের জন্য ভালো।

চিনাবাদাম দেশীয়। এটা সহজেই পাওয়া যায়। দাম অনেক কম, আপনি চিনাবাদাম খেতে পারেন। আমন্ড বাদাম দাম বেশি এবং বিদেশি, যা আমদানি করা হয়। এর মানের ওপর আপনার কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। আরও একটি কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন, এক কেজি আমন্ড বাদাম উৎপাদন করতে ১২ হাজার লিটার পানির প্রয়োজন হয়। সে ক্ষেত্রে সমপরিমাণ চিনাবাদাম উৎপাদনে মাত্র ২ হাজার ৮০০ লিটার পানির প্রয়োজন হয়। ফলে পরিবেশের জন্য চিনাবাদাম একটি ভালো পছন্দ হতে পারে।

খেতে পারেন উভয়ই
খেতে পারেন উভয়ই

যাঁরা চিনাবাদাম খেতে চান কিংবা আমন্ড বাদাম খেতে চান, তার মধ্যে কত পরিমাণ খেতে পারবেন, সেটা একটি বড় বিষয়! কোনো বাদামই মাত্রাতিরিক্ত খাওয়া উচিত নয়। আমন্ড দিনে ৩৫-৪০ গ্রাম খাওয়া যথেষ্ট আর চিনাবাদাম ৫০-৬০ গ্রাম।
অনেককেই মিশ্র বাদাম খেতে পছন্দ করেন। সে ক্ষেত্রে অনুপাত হওয়া উচিত ৭০:৩০, অর্থাৎ চিনাবাদাম দৈনিক আর আমন্ড সপ্তাহে ২-৩ বার।

সতর্কতা

বাদামে অনেকের অ্যালার্জি হয়, বিশেষ করে বাচ্চাদের। বিশ্বে খাদ্য-অ্যালার্জি বেড়ে গেছে। এর মধ্যে শিশুদের বেড়েছে ১২ শতাংশ। তাই যাঁদের অ্যালার্জিজনিত সমস্যা হয়ে থাকে, তাঁরা বাদাম খাবেন না। আর আমন্ড পুরোনো হলে অ্যাফলাটক্সিন নামের ছত্রাক হয়, যা থেকে বিষাক্ত হয়ে ওঠে আলমন্ড বাদাম। তাই কেনার সময় দেখে কিনতে হবে। এয়ারটাইট কাচের বোয়ামে বাদাম রাখতে হবে।

বাদামে অনেকেরই অ্যালার্জি আছে
বাদামে অনেকেরই অ্যালার্জি আছে

মনে রাখবেন, চিনাবাদাম জাতিগতভাবে বাদাম না হয়েও বাদাম নামেই পরিচিত। সেই সঙ্গে পুষ্টিগুণেও দামি বাদামের সমান অবস্থানেই আছে। বাদাম পুষ্টিগুণে কাছাকাছি, স্বাদে ভিন্নতা আছে, সেই সঙ্গে পরিবেশন ভিন্ন থাকায় এর কদরও বদলে যায়। সেই সঙ্গে দামের পার্থক্য থাকায় মানুষ মনে করেন, বেশি দামের বাদাম বেশি গুণের হবে। কিন্তু বিষয়টা যে ঠিক নয়, তা এ লেখায় স্পষ্ট হয়েছে।

লেখক: খাদ্য ও পথ্যবিশেষজ্ঞ; প্রধান নির্বাহী, প্রাকৃতিক নিরাময় কেন্দ্র

ছবি: এআই ও পেকজেলসডটকম

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৫, ০১: ০০
বিজ্ঞাপন