
সাম্প্রতিক সময়ে ওয়েলনেস দুনিয়ায় আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে ‘হাইড্রোজেন ওয়াটার’। যাকে অনেকেই বলছেন নতুন প্রজন্মের ‘সুপারচার্জড’ পানি। কিন্তু সত্যিই কি শীতকালে ফোকাস বাড়ানো, ক্লান্তি কমানো কিংবা দ্রুত রিকভারি পেতে এটি কার্যকর?

সাধারণ পানির রাসায়নিক গঠন —অর্থাৎ দুইটি হাইড্রোজেন ও একটি অক্সিজেন। হাইড্রোজেন ওয়াটারও মূলত একই পানি, তবে এতে অতিরিক্ত মলিকিউলার হাইড্রোজেন গ্যাস (H₂) মিশিয়ে দেওয়া হয়। এই হাইড্রোজেন অক্সিজেনের সঙ্গে বাঁধা নয়, বরং পানিতে আলাদা অবস্থায় থাকে। গবেষকদের ধারণা, এই অতিরিক্ত হাইড্রোজেন শরীরে গিয়ে শক্তিশালী কিন্তু বিশেষ ধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করতে পারে। যা ক্ষতিকর ফ্রি র্যাডিক্যাল কমায়, কিন্তু শরীরের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করে না।

শীত এলেই আমাদের শরীরে পানিশূন্যতা বাড়ে। ঠান্ডায় তৃষ্ণা কম লাগে, আবার শুষ্ক বাতাস ত্বক ও শরীর থেকে আর্দ্রতা কেড়ে নেয়। এর প্রভাব পড়ে ত্বক, শক্তি ও মানসিক ফোকাসে। গবেষণা বলছে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ সারা বছরই পর্যাপ্ত পানি পান করেন না। শীতে সেই প্রবণতা আরও বাড়ে।
এই জায়গাতেই হাইড্রোজেন ওয়াটার নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। কারণ, এটি শুধু হাইড্রেশন নয়, বরং অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমাতে সাহায্য করতে পারে। যা শীতে ক্লান্তি, জয়েন্টের অস্বস্তি এবং ত্বকের নিষ্প্রভতার সঙ্গে জড়িত।
হাইড্রোজেন ওয়াটার নিয়ে সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, স্পোর্টস ও এক্সারসাইজ সাইকোলজি গ্রুপ (জাপান), ক্লিনিক্যাল রিসার্চ সাইট-এর মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো বেশ কিছু গবেষণা করেছে। যদিও গবেষণাগুলো এখনো চলমান, তবে কিছু ফলাফল আশাব্যঞ্জক।

কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, হাইড্রোজেন ওয়াটার ব্যায়ামের পর পেশির ক্লান্তি ও ব্যথা কমাতে সাহায্য করতে পারে। শীতে যারা নিয়মিত হাঁটা বা হালকা ওয়ার্কআউট করেন, তাঁদের জন্য এটি আকর্ষণীয় হতে পারে। তবে সব গবেষণায় একই ফল পাওয়া যায়নি, তাই বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়।
শীতকালে শরীরের ভেতরে প্রদাহের প্রবণতা বাড়তে পারে। বিশেষ করে যাঁদের জয়েন্ট সমস্যা বা দীর্ঘমেয়াদি অসুখ আছে। হাইড্রোজেনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ভূমিকা এই প্রদাহ কমাতে সহায়ক হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মানসিক ফোকাস ও ব্রেন ফগ কমানো
ঠান্ডা, কম রোদ আর পানিশূন্যতার কারণে শীতে ‘ব্রেন ফগ’ অনেকেরই পরিচিত সমস্যা। কিছু গবেষণা ইঙ্গিত দেয়, হাইড্রোজেন ওয়াটার ব্রেন মেটাবলিজমে সহায়তা করে মানসিক স্বচ্ছতা বাড়াতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদি একটি গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত হাইড্রোজেন ওয়াটার পানকারীদের রক্তে শর্করা ও কোমর-নিতম্ব অনুপাত তুলনামূলক কম ছিল। শীতে যখন খাবার ভারী হয় ও চলাফেরা কমে, তখন এই দিকটি অনেকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা একমত, হাইড্রোজেন ওয়াটার কোনো ম্যাজিক ড্রিংক নয়। অধিকাংশ গবেষণার নমুনা ছোট, সময়কালও সীমিত। দীর্ঘমেয়াদি ও বৃহৎ পরিসরের গবেষণা ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।
আরেকটি বিষয় হলো, বাজারে পাওয়া সব হাইড্রোজেন ওয়াটারের মান এক নয়। হাইড্রোজেন খুবই হালকা গ্যাস, তাই এটি সহজেই বেরিয়ে যায়। সে কারণে সাধারণত অ্যালুমিনিয়াম ক্যানেই এই পানি রাখা হয় এবং খোলার পরপরই পান করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
গবেষণায় সাধারণত দিনে ১ থেকে ১.৫ লিটার হাইড্রোজেন ওয়াটার পানের কথা বলা হয়েছে, যদিও নির্দিষ্ট কোনো অফিশিয়াল গাইডলাইন নেই। অনেক বিশেষজ্ঞ সকালে একবার এবং বিকেলে আরেকবার পান করার কথা বলেন। বিশেষ করে শীতের সকালে, যখন শরীর সবচেয়ে বেশি ডিহাইড্রেটেড থাকে।
হাইড্রোজেন ওয়াটার শীতকালীন ওয়েলনেস রুটিনে একটি ইন্টারেস্টিং অ্যাড-অন হতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা ফিটনেস, স্কিন হেলথ ও মানসিক ফোকাস নিয়ে সচেতন। তবে এটি কখনোই পর্যাপ্ত সাধারণ পানি, পুষ্টিকর খাবার ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের বিকল্প নয়।
শেষ কথা একটাই- পানি যেমনই হোক, শীতে নিজেকে হাইড্রেটেড রাখা সবচেয়ে জরুরি। আর যদি সেই পানিতে সামান্য বাড়তি উপকারের সম্ভাবনা থাকে, তা হলে সেটি নিঃসন্দেহে আলোচনার যোগ্য।
সূত্র: হেনদিউইমেন ও হেলথলাইন
ছবি: এআই