সুরের মাধ্যমে মনের অসুখ নিরাময় করেন দীপ্তি চৌধুরী
শেয়ার করুন
ফলো করুন

স্বয়ম্ভুর প্রতিষ্ঠাতা ও মিউজিক থেরাপিস্ট দীপ্তি অরণি চৌধুরী। তিনি কাজ করেন মিউজিক থেরাপি নিয়ে। এর মাধ্যমে তিনি মানসিক প্রশান্তি ফিরিয়ে আনার কাজ করনে। দীপ্তির যাত্রা শুরু হয়েছিল নিজের জীবনধারা থেকেই। বললেন, ‘আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংগীতে স্নাতকোত্তর করেছি।

কিছু যোগিক মুদ্রা আছে এর মধ্যে , যা হাজার বছরের প্রাচীন চর্চার অংশ।
কিছু যোগিক মুদ্রা আছে এর মধ্যে , যা হাজার বছরের প্রাচীন চর্চার অংশ।

ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি ভালোবাসা এবং গান শুনে বড় হওয়াটাই আমার প্রাথমিক প্রেরণা। সংগীত শেখার মূল কারণ ছিল শুধু ভালো লাগা। আমি চাইতাম সেটা ধরে রাখতে। কিন্তু তখন আমি জানতাম না যে একদিন আমি এমন এক জগতে প্রবেশ করব, যেখানে সংগীত হিলিং টুল হিসেবে কাজ করবে।’

বিজ্ঞাপন

দেখতে দেখতে প্রায় ছয় বছর পার করে ফেলেছেন দীপ্তি এই মিউজিক থেরাপিতে। এই সময়ে তিনি দেখেছেন যে সংগীত কেবল শব্দ নয়, এটা মানসিকভাবে সুস্থ রাখার এক শক্তিশালী মাধ্যমও।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সঙ্গীতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করেছেন অরণী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সঙ্গীতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করেছেন অরণী।

‘সময় নিয়ে আমি বুঝতে পারি, জীবনে সুস্থ থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো এমন একটি জায়গা খুঁজে পাওয়া, যেখানে নিজের ভালো লাগা কাজ করবে। আমি সেই জায়গা পেয়েছি সংগীতের মাধ্যমে,’ বললেন দীপ্তি। তিনি বলেন, ‘আমি আমার ভালো লাগার অনুভূতি শেয়ার করলে মানুষও জানায়, এই ভালো লাগাটা তাদেরও বিশেষ অনুভূতি দেয়।’

বিজ্ঞাপন

দীপ্তির কাজের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষকে শুধু গান, সুর বা সংগীত শোনানো নয়; বরং এর মধ্য দিয়ে তাকে ধ্যানমগ্ন করা। অন্য এক জগতে নিয়ে যাওয়া। কারণ, এটা একধরনের মেডিটেশনও।

স্বয়ম্ভুর সেশনে অন্যতম বাদ্যযন্ত্র হলো বাঁশি
স্বয়ম্ভুর সেশনে অন্যতম বাদ্যযন্ত্র হলো বাঁশি

তাই তো দীপ্তি যোগ করলেন, সংগীত ও শব্দতরঙ্গের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা সক্রিয়ভাবে অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে ওঠে। এটা আদতে কোনো পারফরম্যান্স নয়, অলটারনেটিভ ওয়েলবিয়িংয়ের ভাষায় হিলিং টুল।

দীপ্তি আরও জানালেন, ‘আমরা প্রাচীন শাস্ত্রীয় রাগ ব্যবহার করি। কিছু যোগিক মুদ্রা আছে এর মধ্যে, যা হাজার বছরের প্রাচীন চর্চার অংশ। আমার সেশনে যা করানো হয়, তা হলো নাদযোগ। নাদযোগ হলো সংগীতের যোগ। এটি শুধু শোনার জন্য নয়, এটি শোনার মাধ্যমে মানসিক প্রশান্তি দেয়। অংশগ্রহণকারীরা কেবল শ্রোতা নয়; তারা সক্রিয়ভাবে এই অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে ওঠে। নিজের পথ ধরে হাঁটা, নিজের অনুভূতি গ্রহণ করা—এটাই মূল হিলিং।’

সঙ্গীত মানুষের স্নায়ু এবং মানসিক অবস্থাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে
সঙ্গীত মানুষের স্নায়ু এবং মানসিক অবস্থাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে

এর আধ্যাত্মিক দর্শন নিয়েও কথা বলেন দীপ্তি, নাদযোগ হলো প্রাচীন ভারতীয় এক দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক ‘শব্দযোগ’, যা শরীরের শক্তি সমন্বয়, ধ্যানের গভীরতা বাড়ানো এবং অন্তরের আনন্দ অর্জনের জন্য শব্দের কম্পন, মন্ত্র ও সংগীত ব্যবহার করে। এতে বাইরের শব্দ (আহাত) থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে অভ্যন্তরীণ, নীরব শব্দের (অনাহত) দিকে যাত্রা করা হয়, যা মনকে শান্ত করে এবং মহাজাগতিক চেতনার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে সাহায্য করে।

দীপ্তি বলেন, ‘যখন আপনি নিজের যাত্রায় অংশ নেন, নিজের পথ ধরে হাঁটেন, তখন এটা আপনার সুস্থতা বাড়ায়। আপনি নিজের তৈরি পথ অনুসরণ করতে পারেন। এটি শুধু শারীরিক নয়, মানসিকভাবে অনেক শক্তিশালী করে।’
মিউজিক থেরাপি বিশেষভাবে কার্যকর ক্যানসারে আক্রান্ত রোগী ও সারভাইভারদের জন্য। কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে শুধু শরীর দুর্বলই হয় না, রোগীর মানসিক অবস্থাও ভেঙে পড়ে। এমন অবস্থায় সঠিক সংগীত ও যন্ত্রসংগীত ব্যবহার মানুষের অবসাদ, হতাশা ও মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।

স্বয়ম্ভুর প্রতিষ্ঠাতা এবং মিউজিক থেরাপিস্ট দীপ্তি অরণি চৌধুরী
স্বয়ম্ভুর প্রতিষ্ঠাতা এবং মিউজিক থেরাপিস্ট দীপ্তি অরণি চৌধুরী

মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, যখন মানুষ শারীরিক ও মানসিকভাবে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় থাকে, তখন যদি তাকে জীবনের সুন্দর স্মৃতি মনে করিয়ে দেওয়া যায়, সে নিজের ভালো অনুভূতি ফিরে পায়। ক্যানসারের রোগীদের ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে কার্যকর বলে মনে করেন দীপ্তি।

দীপ্তি নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে বলেন, ‘এক ক্যানসার আক্রান্ত রোগী আমাকে বলেছিলেন যে তিনি অনেক দিন ধরেই কাঁদেননি। আমার একটি সেশনের পর তিনি অঝোর ধারায় কেঁদেছিলেন, এটা ছিল আমার জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা।’
‘আমার সেশনগুলো কেবল থেরাপি নয়, এটি একটি অভিজ্ঞতা। মানুষ রাগ, শব্দ ও নাদযোগের মাধ্যমে নিজের মধ্যে প্রবেশ করে, নিজেকে আবিষ্কার করে। এতে তারা মানসিক শান্তি খুঁজে পায় এবং মানসিক ভার হ্রাস পায়। এভাবে মানুষ শুধু সুস্থ নয়, তারা আনন্দ ও প্রশান্তিও অনুভব করে,’ বলেন তিনি।

এটি একটি মেডিটেশন, যেখানে সঙ্গীত এবং শব্দ তরঙ্গের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা সক্রিয়ভাবে অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে ওঠে।
এটি একটি মেডিটেশন, যেখানে সঙ্গীত এবং শব্দ তরঙ্গের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা সক্রিয়ভাবে অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে ওঠে।

দীপ্তি বলেন, ‘সংগীত কেবল শোনার জন্য নয়। এটি আপনাকে কোনো সময়কে মনে করায়, গন্ধ বা উপস্থিতি অনুভব করতে সাহায্য করে, এমনকি পরিবেশকেও মনে করায়। সংগীত মানুষের স্নায়ু ও মানসিক অবস্থাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। দীর্ঘ মেয়াদে নির্দিষ্ট শব্দতরঙ্গ এবং শাস্ত্রীয় রাগের মাধ্যমে চিকিৎসা করলে শরীর ও মন—উভয়ই সুস্থ থাকে।’ তিনি আরও জানালেন, ‘শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রভাব আমাদের স্নায়ুতে বিজ্ঞানসম্মতভাবে পরীক্ষিত। যেমন “আশাভরী” রাগ উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। আর “মারু বেহাগ” মানসিক প্রশান্তি এনে দেয়। স্বরের গতিবিধি ও মানুষের সঙ্গে তার প্রয়োগ মনের শক্তি বাড়ায় এবং মানুষকে সুস্থ রাখে।’

দীপ্তি অরণি চৌধুরীর শেষ কথা, ‘সংগীত কেবল শিল্প নয়, এটি একটি শক্তিশালী মানসিক নিরাময় মাধ্যম। আমার অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, সঠিক সুর, রাগ ও নাদযোগের মাধ্যমে মানুষ পুনরায় খুঁজে পায় নিজের শান্তি, আনন্দ ও মানসিক ভারসাম্য।’

ছবি: সয়ম্ভু ও হাল ফ্যাশন

প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১: ২৩
বিজ্ঞাপন