
চিনি নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। খাবার ও পানীয়কে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে বহু পণ্যে যোগ করা হয় চিনি। আমরা কখনো সরাসরি চিনি খাই, কখনো মিষ্টি, কোমল পানীয়, চা-কফি কিংবা নানা প্রক্রিয়াজাত খাবারের মাধ্যমে। সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন এই ‘মিষ্টি’ স্বাদটি প্রয়োজনের সীমা ছাড়িয়ে প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়।
চিনির স্বাদ আমাদের ভালো লাগতে পারে, সাময়িকভাবে শক্তিও দিতে পারে। কিন্তু অতিরিক্ত চিনি নিয়মিত গ্রহণের সঙ্গে শরীরের ওজন বৃদ্ধি, স্থূলতা, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ এবং দাঁতের ক্ষয়ের মতো নানা স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। তাই চিনি নিয়ে সচেতন হওয়া মানে মিষ্টি স্বাদকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া নয়; বরং পরিমাণ ও উৎস সম্পর্কে সচেতন হওয়া।
চিনি খেলে শরীর দ্রুত শক্তি পেতে পারে। কিন্তু সেই শক্তি দীর্ঘস্থায়ী নয়। মিষ্টি খাবার খাওয়ার পর ভালো লাগার অনুভূতি তৈরি হতে পারে, ফলে অনেকেরই বারবার মিষ্টি খাবারের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয়। বিশেষ করে অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার ও চিনিযুক্ত পানীয় নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস ধীরে ধীরে খাদ্যাভ্যাসের অংশ হয়ে যেতে পারে।
তবে চিনিকে সরাসরি মাদক বা বিষ হিসেবে বিবেচনা করা বৈজ্ঞানিকভাবে যথাযথ নয়। বরং বিষয়টি হলো অতিরিক্ত ও নিয়মিত চিনি গ্রহণের অভ্যাস শরীরের বিপাকীয় স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
চিনি থেকে শরীর দ্রুত ক্যালরি পায়। কিন্তু শুধু চিনি খেলে দীর্ঘ সময় পেট ভরা থাকার অনুভূতি পাওয়া যায় না। বিশেষ করে চিনিযুক্ত পানীয়ের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ—তরল ক্যালরি দ্রুত গ্রহণ করা যায়, কিন্তু তৃপ্তি তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে।
ফলে এক গ্লাস মিষ্টি পানীয় পান করার পরও অনেকের স্বাভাবিক খাবারের ক্ষুধা থেকেই যায়। এ কারণেই নিয়মিত চিনিযুক্ত পানীয় গ্রহণ অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠতে পারে।

চিনির রাসায়নিক নাম সুক্রোজ। এটি একটি কার্বোহাইড্রেট, যা মূলত কার্বন, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন দিয়ে গঠিত। আখ কিংবা বিট থেকে পাওয়া রস বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পরিশোধন করে সাদা চিনি তৈরি করা হয়।
পরিশোধনের সময় আখ বা বিটের রসে থাকা বিভিন্ন উপাদান আলাদা হয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত মূলত সুক্রোজই অবশিষ্ট থাকে। তাই সাদা চিনি থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভিটামিন, খনিজ বা অন্যান্য পুষ্টি পাওয়ার সুযোগ নেই।
এ কারণেই চিনিকে অনেক সময় ‘খালি ক্যালরি’র উৎস বলা হয়—অর্থাৎ ক্যালরি আছে, কিন্তু প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান খুব সামান্য।
চিনি নিজে কোনো বিষ নয়। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত চিনি নিয়মিত গ্রহণ করলে সেটি খাদ্যাভ্যাসের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। বিশেষ করে চিনিযুক্ত পানীয় ও অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার থেকে সহজেই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ক্যালরি গ্রহণ করা সম্ভব।
দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত চিনি গ্রহণের সঙ্গে যেসব স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—
• ওজন বৃদ্ধি ও স্থূলতা
• টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি
• হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বৃদ্ধি
• নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার
• দাঁতের ক্ষয়
• কিছু ক্ষেত্রে গাউটসহ অন্যান্য বিপাকীয় সমস্যা
শিশুদের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের জায়গা দখল করতে পারে। তাই ছোটবেলা থেকেই অতিরিক্ত মিষ্টি খাবারের অভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করা গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিদিনের খাবারে কতটা চিনি থাকা উচিত—এ প্রশ্নের উত্তরও জানা জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউ) সুপারিশ অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুদের ক্ষেত্রে ‘ফ্রি সুগার’ দৈনিক মোট ক্যালরির ১০ শতাংশের কম রাখা ভালো। আরও স্বাস্থ্যকর ফলাফলের জন্য তা ৫ শতাংশের নিচে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়, যা প্রায় ২৫ গ্রাম বা ছয় চা-চামচের সমান।
এখানে ‘ফ্রি সুগার’ বলতে খাবারে যোগ করা চিনি ছাড়াও মধু, সিরাপ এবং ফলের রসের মতো উৎসের চিনি বোঝানো হয়।
তাই শুধু চায়ের কাপে কত চামচ চিনি দিচ্ছেন, সেটি হিসাব করলেই হবে না। প্যাকেটজাত খাবার, সস, মিষ্টি পানীয়, ডেজার্ট ও অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত খাবারের মধ্যেও যোগ করা চিনি থাকতে পারে।
চিনি কমানোর কথা বললে প্রথমেই নজর দেওয়া উচিত পানীয়র দিকে। সফট ড্রিংক, মিষ্টি চা, মিষ্টি কফি কিংবা বিভিন্ন চিনিযুক্ত পানীয় খুব সহজেই দৈনিক চিনি গ্রহণের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে পারে।

সমস্যা হলো একটি পানীয় থেকে পাওয়া ক্যালরি অনেক সময় পূর্ণ খাবারের মতো তৃপ্তি দেয় না। ফলে পানীয় থেকে ক্যালরি গ্রহণের পরও স্বাভাবিক খাবার খাওয়া হয়।
তাই চিনি কমানোর সহজ একটি উপায় হতে পারে—প্রথমে নিয়মিত চিনিযুক্ত পানীয়র পরিমাণ কমানো।

চিনি নিয়ে সচেতন হওয়ার অর্থ এই নয় যে জীবনে আর কখনো মিষ্টি খাওয়া যাবে না। বরং মূল বিষয় হলো পরিমাণ, নিয়মানুবর্তিতা ও উৎস।
মাঝেমধ্যে অল্প পরিমাণ মিষ্টি খাওয়া এবং প্রতিদিন অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ—দুটি বিষয় এক নয়। তাই বাস্তবসম্মত খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
চিনির ব্যবহার কমাতে কয়েকটি সহজ অভ্যাস করা যেতে পারে—
• চিনিযুক্ত পানীয়র বদলে পানি বা চিনি ছাড়া পানীয় বেছে নেওয়া
• প্রক্রিয়াজাত মিষ্টি খাবার কমানো
• খাবারের লেবেলে ‘Added Sugar’ বা ‘Free Sugar’ আছে কি না দেখা
• ফলের রসের বদলে পুরো ফল খাওয়া
• চা বা কফিতে ধীরে ধীরে চিনির পরিমাণ কমানো
• প্রতিদিনের খাবারে শাকসবজি, শস্য, বাদাম ও পুরো ফলের মতো পুষ্টিকর খাবার বাড়ানো
শেষ পর্যন্ত বিষয়টি চিনি খাওয়া না খাওয়ার সরল সমীকরণ নয়। আসল প্রশ্ন হলো—আমরা কতটা চিনি খাচ্ছি এবং কোথা থেকে তা আসছে।
মিষ্টি স্বাদ জীবনের আনন্দের অংশ হতে পারে। কিন্তু সেই স্বাদ যেন প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা না করে—সচেতনতার জায়গাটি সেখানেই।
লেখক: খাদ্য ও পথ্যবিশেষজ্ঞ; প্রধান নির্বাহী, প্রাকৃতিক নিরাময় কেন্দ্র
ছবি: পেকজেলসডটকম