অশান্ত পৃথিবীতে কীভাবে শান্ত রাখবেন আপনার মন
শেয়ার করুন
ফলো করুন

সংযুক্ত আরব আমিরাতে কর্মরত দুই ঘুম-বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ নামির এবং ড. জেসমিন সিউস —বলছেন, এই অস্থিরতার প্রভাব কেবল মানসিক নয়; এটি সরাসরি আমাদের স্নায়ুতন্ত্র ও ঘুমের ছন্দকে বদলে দেয়।

কেন দূরের যুদ্ধও আমাদের ব্যক্তিগত ভয় হয়ে ওঠে?

ড. মোহাম্মদ নামির ব্যাখ্যা সহজ: আমাদের মস্তিষ্ক ‘দূরের বিপদ’ আর ‘আমার বিপদ’—এই পার্থক্য সব সময় স্পষ্ট করে না। বিপদের খবর শুনলেই মস্তিষ্ক ‘অ্যালার্ট মোড’-এ চলে যায়। কর্টিসল বাড়ে, হৃদস্পন্দন দ্রুত হয়, শরীর প্রস্তুত হয় প্রতিক্রিয়ার জন্য।

বাস্তব বিপদের মুহূর্তে এটি দরকারি। কিন্তু ঘুমের জন্য প্রয়োজন একেবারে উল্টো অবস্থা—নিরাপত্তা, শান্ত পরিবেশ, শান্তি। মস্তিষ্ক যদি বারবার হুমকি খুঁজে বেড়ায়, তবে ঘুম আসতে দেরি হয় এবং মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায়।

ড. জেসমিন সিউস যোগ করেন, বারবার দুঃসংবাদ দেখা বা শোনা আমাদের অ্যামিগডালাকে সক্রিয় রাখে। স্নায়ুতন্ত্র কিছুটা ‘ফাইট-অর-ফ্লাইট’ অবস্থায় থেকে যায়। ফলে—

* মাথায় ঘুরতে থাকে একই চিন্তা

* দুঃস্বপ্ন বাড়ে

* গভীর ঘুম কমে যায়

কেন রাত ৩টার চিন্তা বিকেল ৩টার চেয়ে ভারী লাগে?

রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে অনেকেই লক্ষ্য করেন—চিন্তাগুলো যেন আরও ভারী, আরও ভয়ংকর। দিনের আলোয় যে বিষয়টি সামলানো যায়, অন্ধকারে সেটাই অসহ্য মনে হয়।

কারণ রাতে কোনো বিভ্রান্তি নেই—ইমেইল নেই, কথোপকথন নেই, ব্যস্ততা নেই। শুধু একটি অতিসতর্ক মস্তিষ্ক, যা অন্ধকারে বসে বিশ্ব পরিস্থিতির সমাধান খুঁজতে চায়। স্ট্রেসের কারণে এই ক্ষণিক জেগে ওঠা দীর্ঘ সময়ের জেগে থাকার রূপ নেয়।

বিজ্ঞাপন

স্বপ্ন কেন হঠাৎ তীব্র হয়ে ওঠে?

বিশ্বজুড়ে অনিশ্চয়তার সময় মানুষ বেশি জীবন্ত স্বপ্ন বা দুঃস্বপ্ন দেখার কথা বলেন। এর পেছনে রয়েছে রিম (REM) ঘুমের ভূমিকা—এই পর্যায়ে মস্তিষ্ক আবেগপ্রবণ স্মৃতিগুলো প্রক্রিয়াজাত করে।

স্ট্রেস বাড়লে—

* স্বপ্ন হয় বেশি রঙিন ও আবেগঘন

* মাঝরাতে জেগে ওঠার কারণে স্বপ্ন বেশি মনে থাকে

* শিশুদের ক্ষেত্রে রাতের আতঙ্কও বাড়তে পারে

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাঝে মাঝে এমন স্বপ্ন দেখা অস্বাভাবিক নয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে ঘুমের ব্যাঘাত হলে চিকিৎসা পরামর্শ জরুরি।

শিশুরাও কি প্রভাবিত হয়?

অবশ্যই। শিশুরা হয়তো সংবাদ বোঝে না, কিন্তু বড়দের কণ্ঠের টান, আচরণের পরিবর্তন, ঘরের আবহ—সবকিছু তারা অনুভব করে।

লক্ষণগুলো হতে পারে—

* একা ঘুমাতে না চাওয়া

* বারবার আশ্বাস চাওয়া

* পেটব্যথা বা মাথাব্যথা

* বিরক্তি বা মনোযোগে ঘাটতি

শিশু ভয়কে ভাষায় না বললেও, তার শরীর সেই সংকেত বহন করে।

গভীর রাতের স্ক্রলিং: দ্বিগুণ ক্ষতি

আমরা ভাবি, সমস্যা শুধু স্ক্রিনের নীল আলো। কিন্তু বিষয়টি আরও গভীর।

১. আবেগগত উদ্দীপনা—খবরের উত্তেজনা মস্তিষ্ককে সতর্ক রাখে।

২. জৈবিক উদ্দীপনা—নীল আলো মেলাটোনিন কমিয়ে দেয়, ফলে ঘুম কমে যায়।
শোবার ঘর, যা বিশ্রামের স্থান, তা হয়ে ওঠে আপডেট দেখার নিয়ন্ত্রণকক্ষ। মস্তিষ্ক শিখে ফেলে—এই জায়গায় সতর্ক থাকতে হবে।

কীভাবে ফিরিয়ে আনবেন নিরাপত্তার অনুভূতি?

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘুম মানে শুধু বিশ্রাম নয়—নিরাপত্তা। তাই ঘুম ফেরাতে বা গভীর করতে হলে স্নায়ুতন্ত্রকে জানাতে হবে: “এখন আমি নিরাপদ।”

ছোট কিন্তু কার্যকর কিছু টিপস

* শোবার এক ঘণ্টা আগে আলো কমিয়ে দিন

* বই পড়ুন

* মৃদু আওয়াজে গান শোনা

* ঘর রাখুন শীতল, অন্ধকার ও নীরব

* ঘুমের অন্তত ৬০-৯০ মিনিট আগে সংবাদ ও সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধ করুন

বিজ্ঞাপন

ড. সিউস একটি সহজ অনুশীলনের কথা বলেন—ঘুমের আগে লিখে ফেলুন আগামী দিনের তিনটি কাজ। এতে মস্তিষ্কে ‘দুশ্চিন্তার ঘূর্ণি’ কমে।

এমনকি একটি ছোট বাক্যও লিখতে পারেন:

“সকালের আগে আমি আর কিছুতেই মনোযোগ দিচ্ছি না।”

শ্বাস-প্রশ্বাস: দ্রুততম জৈবিক রিসেট

উদ্বেগের মুহূর্তে যুক্তি নয়, শ্বাসই বেশি কার্যকর।

একটি সহজ পদ্ধতি:

৪ সেকেন্ড ধরে শ্বাস নিন, সামান্য থামুন, ৬ সেকেন্ড ধরে ছাড়ুন।
দীর্ঘ নিঃশ্বাস স্নায়ুতন্ত্রকে ‘রেস্ট অ্যান্ড রিস্টোর’ অবস্থায় নিয়ে যায়। মাত্র ৫-১০ মিনিটেই হৃদস্পন্দন ও পেশির টান কমতে শুরু করে।

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন?

যদি—

* অনিদ্রা তিন-চার সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয়

* দুঃস্বপ্নে দিনের কাজ ব্যাহত হয়

* বারবার আতঙ্ক নিয়ে ঘুম ভাঙে

তবে পেশাদার সহায়তা জরুরি। স্বল্পমেয়াদি চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে আচরণগত পরিবর্তনই সবচেয়ে কার্যকর।

অনিশ্চিত পৃথিবীতে ছন্দই ওষুধ

বিশ্ব রাত ১০টায় থেমে যাবে না। খবর আসতেই থাকবে। কিন্তু আপনার ঘরের ভেতর, শোবার আগের শেষ এক ঘণ্টা—আপনি অন্যরকম এক পরিবেশ তৈরি করতে পারেন।
নরম আলো, ধীর শ্বাস, নির্দিষ্ট রুটিন—এই ছোট অভ্যাসগুলো মস্তিষ্ককে মনে করিয়ে দেয়: এই মুহূর্তে আপনি নিরাপদ।

মনে রাখতে হবে কখনও কখনও, ঘুমের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট।

সূত্র: গালফ নিউজ, ছবি: এআই

প্রকাশ: ০৪ মার্চ ২০২৬, ১০: ০৭
বিজ্ঞাপন