
নিজের ভুল-ত্রুটি নিয়ে স্বাভাবিকভাবে হাসতে পারলে মানসিক স্বস্তি, আত্মবিশ্বাস ও সম্পর্ক সবকিছুর জন্যই ইতিবাচক হতে পারে। তবে এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। মনে রাখতে হবে নিজেকে নিয়ে হাসা আর নিজেকে ছোট করা এক বিষয় নয়।

মানুষ অন্যের ঠাট্টা কীভাবে নেয়, তার সঙ্গে সামাজিক সম্পর্কের গভীর সংযোগ রয়েছে। ৯০-এর দশকে শিশুদের নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা যায়, যেসব শিশু সহপাঠীদের কাছে বিদ্রুপের শিকার হতো, পরবর্তীতে তাদের মধ্যে কেউ আক্রমণাত্মক, আবার কেউ অতিরিক্ত চুপচাপ বা আত্বকেন্দ্রিক হয়ে বেড়ে উঠে। তারা ঠাট্টা বা মজা সহজভাবে কখনই সহজ ভাবে নিতে পারে না। অন্যদিকে, সামাজিকভাবে বেশি স্বচ্ছন্দ শিশুরা পরবর্তীতে একই ধরনের পরিস্থিতিকে হালকা করে নিতে পারে।
অর্থাৎ, নিজের দিকে তাকিয়ে একটু হাসতে পারা কেবল মজার বিষয় নয়; ছোটবেলা থেকেই এটি সামাজিকভাবে মানিয়ে নেওয়ার একটি দক্ষতা হয়ে উঠতে পারে।

দীর্ঘদিন ধরে এ নিয়ে মনোবিজ্ঞান ও দর্শনে বিতর্ক ছিল। প্রাচীন দার্শনিক প্লেটো মনে করতেন, হাসির সঙ্গে অন্যের ওপর শ্রেষ্ঠত্ববোধের সম্পর্ক রয়েছে। পরে আরও অনেক চিন্তাবিদ হাসিকে মূলত সামাজিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখেছেন। ফলে নিজের ভুল বা দুর্বলতাকে নিয়ে মানুষ সত্যিই আনন্দের সঙ্গে হাসতে পারে কি না, সেই প্রশ্নও রয়ে গিয়েছিল।
তবে ২০১১ সালের একটি পরীক্ষায় বিষয়টি কিছুটা পরিষ্কার হয়। গবেষকেরা অংশগ্রহণকারীদের মুখ গোপনে ভিডিও করেন। পরে সেই ভিডিও তাদের দেখিয়ে প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা হয়। ৮০ শতাংশ মানুষ অন্তত হেসেছিলেন, আর প্রায় ৪০ শতাংশ জোরে হেসেছিলেন। অর্থাৎ, নিজের অদ্ভুত বা মজার চেহারা দেখে হাসা যে সম্ভব, তার পরীক্ষামূলক প্রমাণ পাওয়া যায়।

কেউ কেউ অন্যের হাসিকেই ভয় পান। মনোবিজ্ঞানে এমন প্রবণতাকে বলা হয় জেলোটোফোবিয়া। অর্থাৎ, অন্যরা তাকে নিয়ে হাসছে, এই আশঙ্কা বা অস্বস্তি। এমন মানুষ বন্ধুবান্ধবের স্বাভাবিক হাসিকেও ভুলভাবে নিজের প্রতি বিদ্রূপ হিসেবে মনে করেন।
এর পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে। কঠোর ও শাস্তিমূলক অভিভাবকত্ব, ছোটবেলায় অপমানজনক অভিজ্ঞতা বা দীর্ঘদিন উপহাসের শিকার হওয়া। কিছু গবেষণায় সাংস্কৃতিক পার্থক্যের কথাও উঠে এসেছে।
এই প্রবণতার সঙ্গে কম জীবনসন্তুষ্টি, একাকিত্ব, বন্ধুত্ব এড়িয়ে চলা এবং বিষণ্নতার মতো নেতিবাচক অভিজ্ঞতার সম্পর্কও পাওয়া গেছে।

এর বিপরীত প্রবণতাকে বলা হয় জেলোটোফিলিয়া বা অন্যরা হাসলে সেটিকে ইতিবাচকভাবে নিতে পারা বা এমন পরিস্থিতিতে আনন্দ খুঁজে পাওয়া। গবেষণায় দেখা গেছে ছোটবেলায় যারা সামাজিকভাবে পরিবার, আত্বীয় বা বন্ধুদের সাথে বেশি সংযুক্ত ছিল তারাই এমন পরিস্থিতিতে মানিয়ে নিতে পার। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ‘প্লেফুলনেস’ বা জীবনের সাধারণ ঘটনাগুলোকে একটু হালকা চোখে দেখার ক্ষমতা।
ধরা যাক, কোনো একঘেয়ে কাজ করতে হচ্ছে। একজন মানুষ সেটিকে বিরক্তিকর হিসেবেই নিলেন। আরেকজন সেই একই কাজের মধ্যে মজার কিছু খুঁজে নিলেন। পরিস্থিতি বদলায়নি, কিন্তু পরিস্থিতিকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেছে। গবেষণায় দেখা যায়, যারা খেলাচ্ছলে জীবনকে উপভোগ করতে পারে তাদের আত্মসম্মান ও ব্যক্তিগত সন্তুষ্টি যে কোন পরিস্থিতিতে অনেক বেশি থাকে।

এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি দেখা যায়। নিজেকে নিয়ে হাসা মানেই সবসময় আত্মবিশ্বাসের লক্ষণ নয়। ২০০৩ সালে কানাডিয়ান গবেষকেরা মানুষের হাসির ধরনকে চারটি ভাগে পর্যবেক্ষন করেন।
১. অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির হাস্যরস।
২. নিজেকে ইতিবাচকভাবে সামলে নেওয়ার হাস্যরস।
৩. আক্রমণাত্মক হাস্যরস।
৪. নিজেকে ছোট করে হাস্যরস তৈরি করা।
এর মধ্যে নিজের সমস্যা নিয়ে হালকা রসিকতা করে পরিস্থিতি সামলে নেওয়া ইতিবাচক হতে পারে। যেমন, কোনো কাজ খারাপ হয়ে গেলে ‘সব শেষ’ ভাবার বদলে ঘটনাটির মজার দিকটি দেখতে পারা। এতে মানসিক চাপ সামলানো সহজ হতে পারে।
কিন্তু অন্যকে খুশি করার জন্য বারবার নিজের দুর্বলতা, ভুল কিংবা ত্রুটি নিয়ে নিজেকেই ছোট করা খুবই খারাপ একটি বিষয়। একসময় এটি আত্মসম্মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

মজার বিষয় হলো, পরবর্তী গবেষণাগুলো আগের কিছু ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। মনোবিজ্ঞানী সোনজা হাইন্টজের গবেষণায় দেখা যায়, যারা নিজেদের নিয়ে রসিকতা করেন, তারা মানসিকভাবে খুব বেশি সমস্যাগ্রস্ত নন। বরং কিছু ক্ষেত্রে তাদের আত্মসম্মান ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক বেশ ভালো।
তবে গবেষক এখানে একটি শর্ত জুড়ে দিয়েছেন। তা হচ্ছে, নিজের প্রতি রসিকতা থেকে যদি ঘৃণা, তিক্ততা বা গভীর অস্বস্তি তৈরি হয় তবে তা ইতিবাচক নয়। বিশেষজ্ঞরা তাই রসিকতা ও আত্মসমালোচনার মাঝে একটি সীমারেখার কথা বলছেন।

নিয়মটি খুবই সহজ। আপনি যে বিষয়টি নিয়ে মজা করছেন, তাতে আপনি নিজে কতটা স্বস্তি বা শান্তি অনুভব করছেন। ধরা যাক, আপনি নিয়মিত একই ধরনের ভুল করেন। সেটি নিয়ে হেসে বলা ‘আবারও একই কাণ্ড করলাম!’ এটি এক ধরনের হালকা আত্ম-রসিকতা। কিন্তু একই বিষয় নিয়ে এভাবে বারবার বলা, ‘আমি কিছুই পারি না’, ‘আমি আসলেই ব্যর্থ’। তখর সেটি আর রসিকতা থাকে না; ধীরে ধীরে আত্মঅপমানে পরিণত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিজের কোনো দুর্বলতা বা ভুল নিয়ে রসিকতা করার আগে সেটির সঙ্গে মানসিকভাবে কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্য তৈরি হওয়া জরুরি। কারণ, অস্বস্তি থেকে করা রসিকতা অন্যদের কাছেও অস্বস্তিকর মনে হতে পারে।

জীবনে ভুল হবেই। কোনো কাজ ঠিকমতো না হওয়া, কোথাও অপ্রস্তুত হয়ে যাওয়া, ছোটখাটো ভুল এসব এড়ানোর উপায় নেই। কিন্তু প্রতিটি ভুলকে ব্যর্থতা হিসেবে দেখার বদলে একটু দূর থেকে দেখতে পারলে মানসিকভাবে নিজেকে সামলানো সহজ হতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, নিজের ভুলকে অতিরিক্ত গুরুত্ব না দিয়ে তা হালকা ভাবে দেখতে পারলে। জীবনে বড় ধাক্কা সামলাতে সাহায্য করতে পারে। একই সঙ্গে এটি রাগ বা হতাশার বদলে তুলনামূলক ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী তৈরি করতে পারে।

শুরুতেই নিজের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাকে নিয়ে রসিকতা করার দরকার নেই। বরং খুব ছোট বিষয় থেকে শুরু করা যায়।
আপনার ফ্যাশন নিয়ে খুব একটা আগ্রহ না থাকলে বলতে পারেন, ‘আজও সেই পুরোনো জিনসটাই পরলাম।’ কোনো কাজে আবার একই ভুল করেছেন? বিরক্ত না হয়ে নিজের কাছেই ঘটনাটিকে একটু মজার করে দেখুন।
আরও সহজ একটি পদ্ধতি হতে পারে ‘প্লেফুলনেস ডায়েরি’। প্রতিদিন রাতে ১০ মিনিট সময় নিয়ে দিনের সবচেয়ে মজার তিনটি মুহূর্ত লিখে রাখুন। সেটা হতে পারে আপনার নিজের কোনো মজার ভাবনা, পথে দেখা কোনো দৃশ্য কিংবা ছোট্ট কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনা।

গবেষনায় দেখা গিয়েছে, এক সপ্তাহ এমন অভ্যাস করার পর অনেকের মধ্যেই দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ইতিবাচক মানসিকতার প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। পাশাপাশি বিষণ্নতার অনুভূতি কমেছে এবং আনন্দের মাত্রা বেড়েছে।
নিজেকে নিয়ে হাসতে পারা মানে নিজেকে ছোট করা নয়। বরং অনেক সময় এর অর্থ, নিজের অসম্পূর্ণতাকে মেনে নেওয়া, ভুলকে জীবনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে দেখা এবং সবকিছুকে অতিরিক্ত ভারী করে না তোলা। তাই পরেরবার কোনো ছোট ভুল করে মন খারাপ হওয়ার বদলে একবার নিজের দিকেই তাকিয়ে হাসুন। হয়তো সমস্যাটা একই থাকবে, কিন্তু সেটিকে সামলানোর ক্ষমতাটা একটু বদলে যাবে।
সূত্র: বিবিসি
ছবি: এআই