
সমুদ্রের ধারে কাঠ বা বাঁশের তৈরি রিসোর্টে থাকার পরিকল্পনা করলে শুধু ঘরের সৌন্দর্য, সমুদ্রের দৃশ্য কিংবা সুযোগ-সুবিধা দেখে বুকিং দেবেন না। রিসোর্টটি অনুমোদিত কি না, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় কি না এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার ব্যবস্থা রয়েছে কি না, তা জেনে নিন।

সাম্প্রতিক অতিথিদের রিভিউতে কাঠের মেঝে, সিঁড়ি, বাথরুমের পিচ্ছিল ভাব কিংবা নিরাপত্তাকর্মীদের ভূমিকা নিয়ে কোনো অভিযোগ রয়েছে কি না, সেদিকেও নজর দিন। বিশেষ করে সমুদ্রের ওপর তৈরি কটেজ হলে মূল ভবন বা সৈকতে পৌঁছানোর নিরাপদ পথ রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
সমুদ্রের নোনা বাতাস, আর্দ্রতা ও বৃষ্টির কারণে কাঠ বা বাঁশের কাঠামোর নিয়মিত যত্ন নেওয়া প্রয়োজন। কাঠামোর কোনো অংশ দুর্বল হয়ে গেছে কি না, বাঁশে পচন বা পোকামাকড়ের ক্ষতি হয়েছে কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করা জরুরি। বাংলাদেশের জাতীয় বিল্ডিং কোডেও বাঁশের কাঠামোর নকশা, উপকরণের মান ও রক্ষণাবেক্ষণ-সংক্রান্ত বিষয় রয়েছে।

রিসোর্টে পৌঁছে হাঁটার পথ ও সিঁড়িতে আলগা কাঠ, ভাঙা তক্তা, বেরিয়ে থাকা পেরেক কিংবা নড়বড়ে রেলিং আছে কি না, খেয়াল করুন। ভেজা কাঠের মেঝেতে পা পিছলে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে। এমন কিছু চোখে পড়লে ওই অংশ ব্যবহার না করে কর্তৃপক্ষকে জানান।
বিশেষ করে সমুদ্রের ওপর পিলারের সাহায্যে তৈরি কটেজে ওঠানামার সিঁড়ি, হাঁটার পথ ও বারান্দার রেলিং নিরাপদ কি না, তা দেখে নেওয়া ভালো।
কাঠ ও বাঁশের তৈরি স্থাপনায় আগুনের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে নির্মাণ এবং অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হয়। তাই রিসোর্টে ধোঁয়া শনাক্তকরণ অ্যালার্ম, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, জরুরি আলো এবং নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার পথ রয়েছে কি না, খোঁজ নিন।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস ফায়ার অ্যাডমিনিস্ট্রেশন হোটেল ও অবকাশযাপনের ভাড়া করা স্থানে আগুনের ঝুঁকি মোকাবিলায় অতিথিদের ধোঁয়া শনাক্তকরণ অ্যালার্ম, অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা ও জরুরি বহির্গমনপথ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পরামর্শ দেয়।
ঘরে ঢুকেই জরুরি অবস্থায় বেরিয়ে যাওয়ার অন্তত দুটি সম্ভাব্য পথ খুঁজে রাখুন। অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র কোথায় রাখা আছে, সেটিও জেনে নিন। মশা তাড়ানোর কয়েল, মোমবাতি কিংবা অন্য কোনো খোলা আগুন ব্যবহারে সতর্ক থাকুন। বৈদ্যুতিক তার বা মাল্টিপ্লাগ ক্ষতিগ্রস্ত দেখলে নিজে মেরামত না করে কর্তৃপক্ষকে জানান।

জলরাশির ওপর তৈরি কটেজে থাকার অন্যতম আকর্ষণ হলো বারান্দা থেকে সরাসরি সমুদ্রে নামার সুযোগ। তবে পানির গভীরতা, স্রোত ও সাঁতারের দক্ষতা সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে কখনোই পানিতে নামা উচিত নয়।
মালদ্বীপের পর্যটন মন্ত্রণালয়ের পর্যটনস্থাপনার নিরাপত্তা বিধিমালায় অতিথিদের চেক-ইনের চার ঘণ্টার মধ্যে নিরাপত্তাবিষয়ক নির্দেশনা দেওয়া, জরুরি যোগাযোগের নম্বর রাখা এবং পানির ওপরের হাঁটার পথ, জেটি ও নির্ধারিত সাঁতারের স্থানে লাইফ জ্যাকেট ও লাইফবয়া রাখার কথা বলা হয়েছে। নির্ধারিত সাঁতারের স্থান ও জলক্রীড়ার এলাকাগুলোতে কার্যক্রম চলাকালে লাইফগার্ড রাখার বিধানও রয়েছে।
তাই রিসোর্টে পৌঁছে লাইফ জ্যাকেট ও লাইফবয়া কোথায় আছে, জরুরি অবস্থায় কাকে ফোন করতে হবে এবং সাঁতারের নির্ধারিত এলাকা কোনটি, জেনে নিন। সাঁতার না জানলে বা পানিতে স্বচ্ছন্দ না হলে একা নামবেন না।

সমুদ্র শান্ত দেখালেই যে পানিতে নামা নিরাপদ, এমন নয়। কখনো কখনো তীর থেকে গভীর সমুদ্রের দিকে টেনে নেওয়া শক্তিশালী স্রোত তৈরি হতে পারে, যা অভিজ্ঞ সাঁতারুকেও বিপদে ফেলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনওএএ) লাইফগার্ড-নিয়ন্ত্রিত সৈকতে সাঁতার কাটা, সতর্কতামূলক পতাকা ও নির্দেশনা মেনে চলা এবং একা সাঁতার না কাটার পরামর্শ দেয়। সৈকতের জেটি বা পিয়ারসংলগ্ন স্থানেও বিপজ্জনক স্রোত তৈরি হতে পারে।
ঝোড়ো হাওয়া, বজ্রপাত, উত্তাল ঢেউ কিংবা আবহাওয়ার সতর্কবার্তা থাকলে সমুদ্রের ধারের খোলা বারান্দা ও ওয়াকওয়েতে অবস্থান এড়িয়ে চলুন। প্রয়োজনে কর্মীদের নির্দেশনা অনুসারে নিরাপদ জায়গায় সরে যান।

কাঠের বারান্দা, খোলা ডেক, পানির ওপরের হাঁটার পথ ও সিঁড়ি শিশুদের জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই শিশুদের কখনো একা বারান্দা, সুইমিং পুল বা সমুদ্রসংলগ্ন এলাকায় যেতে দেবেন না।
রেলিংয়ের ওপর বসা, রেলিংয়ের ফাঁক দিয়ে ঝুঁকে পড়া কিংবা অজানা গভীরতার পানিতে লাফ দেওয়া থেকে বিরত রাখুন। শিশু পানিতে নামলে অভিভাবককে হাতের নাগালে থাকতে হবে। শুধু লাইফ জ্যাকেট পরানোই যথেষ্ট নয়<bha>;</bha> পানিতে সার্বক্ষণিক নজরদারিও প্রয়োজন।

সমুদ্রের ওপর কাঠের ওয়াকওয়ে কিংবা বাঁশের সেতু দিয়ে রাতে হাঁটতে হলে পর্যাপ্ত আলো থাকা জরুরি। ঘর থেকে মূল ভবন বা নিরাপদ স্থানে যাওয়ার পথে আলো জ্বলছে কি না, সিঁড়ি ও বাঁকগুলো স্পষ্ট দেখা যায় কি না, তা পরীক্ষা করে নিন।
রিসোর্টের জরুরি যোগাযোগের নম্বর ফোনে সেভ করুন। মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল হলে বিকল্প যোগাযোগের ব্যবস্থা কী, সেটিও জেনে নিন। জরুরি পরিস্থিতিতে কোথায় জড়ো হতে হবে, তা জানা থাকলে দ্রুত নিরাপদ জায়গায় পৌঁছানো সহজ হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস ফায়ার অ্যাডমিনিস্ট্রেশনও অতিথিদের জরুরি বহির্গমনপথ ও নিরাপদে জড়ো হওয়ার স্থান আগে থেকে জেনে রাখার পরামর্শ দেয়।

হাঁটার সময় কাঠের তক্তা অতিরিক্ত দুলে ওঠা, কোনো অংশ বসে যাওয়া, বাঁশের সংযোগস্থল আলগা দেখা কিংবা রেলিং নড়বড়ে মনে হওয়াকে ছোটখাটো সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যাবেন না। এমন লক্ষণ সব সময় বড় বিপদের ইঙ্গিত না হলেও পরীক্ষা না করে ওই অংশ ব্যবহার করা ঠিক নয়।
সমস্যাটি রিসোর্টের কর্মীদের জানান এবং প্রয়োজনে অন্য কটেজ বা নিরাপদ পথ ব্যবহার করুন। কাঠামো দুর্বল মনে হলে নিজের উদ্যোগে সেটি পরীক্ষা বা মেরামত করার চেষ্টা করবেন না।
বাংলাদেশের জাতীয় বিল্ডিং কোড ২০২০-তে বাঁশের কাঠামোর নকশার জন্য পৃথক অধ্যায় রয়েছে। নির্মাণে কাঠামোগত নিরাপত্তা, অগ্নিনিরাপত্তা ও উপকরণের মান বজায় রাখার বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ, কাঠ বা বাঁশের ব্যবহার নিজে থেকেই কোনো স্থাপনাকে অনিরাপদ করে না; সঠিক নকশা, উপযুক্ত উপকরণ ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ।

কাঠ বা বাঁশের তৈরি সমুদ্রপাড়ের রিসোর্টে থাকার অভিজ্ঞতা হতে পারে দারুণ। তবে নান্দনিক স্থাপনা ও প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার আনন্দ যেন নিরাপত্তার ঝুঁকিতে পরিণত না হয়। বুকিংয়ের আগে রিসোর্টের ব্যবস্থা যাচাই, পৌঁছে জরুরি পথ ও উদ্ধারসামগ্রীর অবস্থান জেনে নেওয়া এবং সমুদ্র ও আবহাওয়ার সতর্কতা মেনে চলাই নিরাপদ ভ্রমণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস।
তথ্যসূত্র: মালদ্বীপের পর্যটন মন্ত্রণালয়ের নিরাপত্তা বিধিমালা, যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস ফায়ার অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, এনওএএ এবং বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড ২০২০।
ছবি: পেকজেলসডটকম ও বিকিংডায়ারি