প্রবাসের পথে পথে ৩ : গন্তব্যে পৌঁছাতে হলে জীবনের কাছে বশ্যতা স্বীকার করতে হয় না
শেয়ার করুন
ফলো করুন

নাম ব্রুনো, বয়স ৫০ বছর। তিন–তিনবার তাঁকে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। মৃতের রহস্যময় বিশাল জগতে তাঁকে স্থান দেওয়া হয়নি। শেষবার যখন তাঁর সঙ্গে ‘মৃত্যু’ এসে সাক্ষাৎ করেছিল, তখন তিনি পদচারী পারাপার ধরে রাস্তা পার হচ্ছিলেন। একটি দশাসই গাড়ি এসে তাঁকে ধাক্কা দেয়। তারপর তাঁর আর কিছু মনে নেই।

দক্ষিণ ফ্রান্সের পর্যটনবান্ধব তুলুজ শহরের প্রাণকেন্দ্রে ‘প্লাস ক্যাপিতল’, দেশ-বিদেশের পর্যটকেরা ভিড় করেন এই স্থানে
দক্ষিণ ফ্রান্সের পর্যটনবান্ধব তুলুজ শহরের প্রাণকেন্দ্রে ‘প্লাস ক্যাপিতল’, দেশ-বিদেশের পর্যটকেরা ভিড় করেন এই স্থানে
গারোঁন নদীর তীরে তুলুজ শহরের প্রধান রাস্তাটি পথচারী এবং সারি সারি উদয়পদ্ম ফুল গাছের দখলে
গারোঁন নদীর তীরে তুলুজ শহরের প্রধান রাস্তাটি পথচারী এবং সারি সারি উদয়পদ্ম ফুল গাছের দখলে

এর আগেও দুবার মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলেন। তবে তৃতীয়বার, এ–যাত্রায় বোধ হয় আর তাঁর ঘরে ফেরা হবে না। হাসপাতালে নিয়ে যেতে যেতে পথে অ্যাম্বুলেন্সের জরুরি সেবাদানে ব্যতিব্যস্ত চিকিৎসক এবং সেবিকাদের চোখে-মুখে উদ্বেগের চিহ্ন স্পষ্ট। হাসপাতালের বিছানায় আশ্রয় হওয়ার আগে চিকিৎসকেরা নানা কিসিমের ছুরি আর যন্ত্রপাতি দিয়ে তাঁর নশ্বর দেহখানি কাটাকুটি করে। তখনো তিনি অচেতন। রক্ত দিয়ে হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি চালু রাখা হয়েছে। তারপর একদিন সংবিৎ ফিরে পেতেই তিনি বুঝতে পারেন যে এ জীবনে সোজা হয়ে দাঁড়ানো হয়তো তাঁর পক্ষে আর কোনো দিনই সম্ভব হবে না। খুব বিশ্রীভাবে মেরুদণ্ডের বেশ কয়েকটি হাড় ভেঙে গেছে।

বিজ্ঞাপন

ডাক্তাররা ভরসা দিলেন। তবে মেরুদণ্ডে ধাতব দণ্ড বসাতে হবে, আরও কয়েকবার তাঁকে অস্ত্রোপচারের মঞ্চে উঠতে হবে। তা–ই হলো। তবে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যেতে অনেক দিন লেগে যাবে। আবার নতুন করে হাঁটাচলা শিখতে হবে। স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে হবে।

ব্রুনোর দেখা পাওয়া যাবে দক্ষিণ ফ্রান্সের তুলুজ শহরে
ব্রুনোর দেখা পাওয়া যাবে দক্ষিণ ফ্রান্সের তুলুজ শহরে

হাসপাতালের রাতগুলো অনেক দীর্ঘ হয়। মানুষ একা থাকলে অনেক বেশি কথা বলে, মনে মনে নিজের সঙ্গে। একাকিত্ব মানুষকে অতীতচারী করে। ১৬ বছর বয়স থেকেই জীবনযুদ্ধ শুরু করেছিল ব্রুনো। নির্দিষ্ট একটি পেশা বেছে নেওয়ার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা গ্রহণ করার সুযোগ কখনোই তাঁর হয়নি।

বিজ্ঞাপন

একসময় মজাদার এবং সুদৃশ্য সব কেক, পেস্ট্রি বানিয়েছেন, বিক্রি করেছেন। কারও কাছে কখনোই করুণার পাত্র হতে হয়নি তাঁকে। এবার পরিস্থিতি অনেকটা ভিন্ন। কোমরের হাড় ভেঙে গেলেও জীবনের কাছে হার মানা চলবে না। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শুয়ে ঠিক করলেন, মানুষের ব্যবহত চামচ, কাঁটাচামচ ও ছুরি দিয়ে নানা রকম জিনিসপত্র বানাবেন।একসময় মজাদার এবং সুদৃশ্য সব কেক, পেস্ট্রি বানিয়েছেন, বিক্রি করেছেন।

ব্রুনো তাঁর ভ্রাম্যমাণ বুটিকে বসেই একের পর এক রচনা করে চলেন অলংকারের শিল্পময় সুষমা
ব্রুনো তাঁর ভ্রাম্যমাণ বুটিকে বসেই একের পর এক রচনা করে চলেন অলংকারের শিল্পময় সুষমা

কারও কাছে কখনোই করুণার পাত্র হতে হয়নি তাঁকে। এবার পরিস্থিতি অনেকটা ভিন্ন। কোমরের হাড় ভেঙে গেলেও জীবনের কাছে হার মানা চলবে না। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শুয়ে ঠিক করলেন, মানুষের ব্যবহত চামচ, কাঁটাচামচ ও ছুরি দিয়ে নানা রকম জিনিসপত্র বানাবেন। নিজের মধ্যে শিল্পীসত্তা আছে, তা তিনি কাজে লাগাবেন। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে ফিরে পাওয়া জীবনকে নতুন করে সাজাতে প্রস্তুতি নেন।

তখন ২০১৯ সাল। শৌখিন মানুষদের পরিত্যক্ত তৈজসপত্র জমা হয় পুরোনো সব জিনিসপত্রের সঙ্গে অনেকের বাড়িতে। অনেকেই বিজ্ঞাপন দিয়ে নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে দেন তা। ব্রুনো সেসব বিজ্ঞাপন দেখে রুপার পুরোনো চামচ, কাঁটাচামচ, ছুরি এবং অন্যান্য বাসনকোসন কিনে আনেন। এককালের জৌলুশের সেসব ব্যবহার্য জিনিসপত্র দীপ্তি ছড়াত, আজ তাদের পুরোনো বলে অবজ্ঞায়, অবহেলায় ঘরের কোনায় ফেলে রাখা হয়েছে। ব্রুনো তা সংগ্রহ করে এসব উপকরণকে নতুন জীবন দিতে শুরু করলেন।

ব্রুনোর নিজের বুটিকেই রয়েছে শিল্পশালা
ব্রুনোর নিজের বুটিকেই রয়েছে শিল্পশালা

যেন ঠিক নিজের জীবনের মতোই। তাঁর হাতের ছোঁয়ায় সেসব হয়ে ওঠে অলংকার, কানের দুল, গলায় পরার লকেট, আরও আছে ব্রোচ, মাথার কাঁটা, জামা আটকানোর অলংকার। বাদ পড়ে না ভালোবাসার স্মারক অঙ্গুরীয়। কাঁটা চামচের মাথায় একটি মার্বেল বসিয়ে বানিয়ে ফেলেন নৃত্যরতা নর্তকী, বাদ্যযন্ত্র হাতে গায়ক অথবা গাড়িচালক কিংবা সাগর থেকে উঠে আসা জলকন্যা।

বিমানযুগের জয়যাত্রা শুরু হয়েছিল ফ্রান্সের এই তুলুজ শহর থেকেই। তাই ব্রুনোর শিল্পসৃষ্টির তালিকায় রয়েছে বিমান, রুপার চামচকে রূপ দিয়েছেন উড়োজাহাজে। আরও কত কী! সৃষ্টি সুখের উল্লাসে একের পর এক রচনা করে চলেন অলংকারের শিল্পময় সুষমা। দূরদূরান্ত থেকে পর্যটকেরা আসেন রাস্তার ধারে ব্রুনোর ভ্রামমাণ বুটিকে। তাঁদের বিস্মিত চোখের সামনে তিনি ফুটিয়ে তোলেন বিভিন্ন শৈল্পিক অবয়ব। অনেকেই কিনে নিয়ে যান দূরের দেশে তাঁদের প্রিয়জনদের উপহার দেওয়ার জন্য অখ্যাত এই শিল্পীর চারুময় কারুকলার কাজ।

ব্রুনোর হাতের ছোঁয়ায় প্রাণ পায় অবহেলিত,পরিত্যক্ত পুরোনো চামচ, কাঁটাচামচ, খাবার কাটার ছুরি। সৃষ্টি হয় নান্দনিক শিল্পসামগ্রী
ব্রুনোর হাতের ছোঁয়ায় প্রাণ পায় অবহেলিত,পরিত্যক্ত পুরোনো চামচ, কাঁটাচামচ, খাবার কাটার ছুরি। সৃষ্টি হয় নান্দনিক শিল্পসামগ্রী
কাঁটাচামচের মাথায় একটি মার্বেল বসিয়ে বানিয়ে ফেলেন নৃত্যরতা নর্তকী, বাদ্যযন্ত্র হাতে গায়ক অথবা গাড়িচালক কিংবা সাগর থেকে উঠে আসা জলকন্যা
কাঁটাচামচের মাথায় একটি মার্বেল বসিয়ে বানিয়ে ফেলেন নৃত্যরতা নর্তকী, বাদ্যযন্ত্র হাতে গায়ক অথবা গাড়িচালক কিংবা সাগর থেকে উঠে আসা জলকন্যা

এই বিস্ময়কর মানুষটির দেখা পাওয়া যাবে দক্ষিণ ফ্রান্সের তুলুজ শহরে। পর্যটনবান্ধব এই সুন্দর লোকালয়ের কেন্দ্রবিন্দু, ক্যাপিতল চত্বরের ঠিক পেছনে। গারোঁন নদীর তীরে এই শহরের প্রধান রাস্তাটি নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়ানো পথচারী এবং সারি সারি উদয়পদ্ম ফুলগাছের দখলে। যান্ত্রিক গাড়ি চলাচল নিয়ন্ত্রিত। এখানেই পাতালরেল ঘেঁষে একটি খোলা স্থানে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আনাগোনা। এখানেই হরেক রকমের ভ্রামমাণ বুটিকের সঙ্গে আছে ব্রুনোর বুটিক এবং শিল্পশালা।

চোখে–মুখে দীপ্তির স্ফুরণ, ব্রুনোর সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগে। কারণ, অপারেশনের মঞ্চ থেকে জীবন নিয়ে ফিরে আসা এই মানুষটি নিজের সাফল্যের কথা বলতে বলতে নিজেই হয়ে যান জীবনের রঙ্গমঞ্চে লড়াকু এক রাজপুত্র। স্মিত হাসি ছড়িয়ে বলেন, ‘জীবনকে পথ দেখাতে হয়। গন্তব্যে পৌঁছাতে হলে জীবনের কাছে বশ্যতা স্বীকার করতে হয় না।’

মইনুল হাসান: ফ্রান্স প্রবাসী লেখক।

ছবি: লেখক

প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৬: ৫২
বিজ্ঞাপন