
বর্তমান সময়ে মানুষ কেন মানবিক অনুভূতি ও এমপ্যাথি (সহানুভূতি অনুভব করার ক্ষমতা) হারাচ্ছে? এমপ্যাথি মানুষের স্বাভাবিক ক্ষমতা। সেটি এই অস্থির সময়ে কমে যেতে পারে, কিন্তু চর্চা করলে তা আবার শক্তিশালীও হয়। কিন্তু অতিরিক্ত ডিজিটাল এই জীবনে সামাজিক মাধ্যমে এত 'হেট স্পিচ' কেন এই হারে বেড়েছে? মানুষের মৃত্যু বা নিষ্ঠুরতা নিয়ে ট্রল করার প্রবণতা কেন এত এখন?

এসবের পেছনে কয়েকটি গভীর সামাজিক ও প্রযুক্তিগত কারণ কাজ করছে। বিষয়টি শুধু “মানুষ খারাপ হয়ে গেছে” দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। বরং অনলাইন পরিবেশ মানুষের আচরণকে বদলে দিচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে এর পেছনে একক কোনো কারণ নেই। বরং সামাজিক, প্রযুক্তিগত, মানসিক ও অর্থনৈতিক অনেক পরিবর্তন একসঙ্গে কাজ করছে। কয়েকটি বড় কারণ হলো:
১. অতিরিক্ত ডিজিটাল জীবন
সোশ্যাল মিডিয়া, শর্ট ভিডিও, দ্রুত স্ক্রল—এসব আমাদের মনোযোগের ধরন বদলে দিয়েছে। আমরা প্রতিদিন এত বেশি দুঃখ, যুদ্ধ, দুর্ঘটনা বা ট্র্যাজেডির খবর দেখি যে অনেক সময় মস্তিষ্ক অভ্যস্ত হয়ে যায়। এটাকে বলা হয় 'ইমোশনাল নাম্বনেস'। ফলে অন্যের কষ্ট দেখেও আগের মতো অনুভূতি জাগে না।
২. ব্যস্ততা ও টিকে থাকার চাপ
এখনকার জীবনে অর্থনৈতিক চাপ, ক্যারিয়ার নিয়ে দুশ্চিন্তা, প্রতিযোগিতা—এসব এত বেশি যে অনেকেই নিজের মানসিক শক্তিটুকুই ধরে রাখতে হিমশিম খান। তখন অন্যের অনুভূতি বোঝার জায়গা কমে যায়।

৩. অনলাইনে মানুষকে “বাস্তব মানুষ” মনে না হওয়া
স্ক্রিনের আড়ালে থেকে কথা বললে অনেক সময় মানুষ ভুলে যায় যে ওপাশেও একজন বাস্তব মানুষ আছে। তাই অনলাইনে ট্রোলিং, অপমান বা ঘৃণামূলক মন্তব্য সহজ হয়ে গেছে।
৪. ব্যক্তিকেন্দ্রিক সংস্কৃতি
অনেক সমাজে এখন “নিজেকে আগে রাখো”, “নিজের সাফল্যই সব”—এ ধরনের ভাবনা খুব জোরালো। নিজের উন্নতি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু যখন সমাজ পুরোপুরি ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে যায়, তখন সমষ্টিগত দায়িত্ববোধ কমে যেতে পারে।
৫. বাস্তব যোগাযোগ কমে যাওয়া
আগে পরিবার, পাড়া, বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি সময় কাটানোর প্রবণতা বেশি ছিল। এখন যোগাযোগ অনেক হলেও তা ভার্চুয়াল। মুখোমুখি কথা বলা, কারও চোখের ভাষা বোঝা—এসবই এমপ্যাথি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ।
৬. ক্রমাগত স্ট্রেস ও মানসিক ক্লান্তি
মানুষ যখন দীর্ঘদিন চাপের মধ্যে থাকে, তখন তার মস্তিষ্ক সারভাইভাল মোডে চলে যায়। তখন সংবেদনশীলতা কমে যেতে পারে। অনেকেই ইচ্ছাকৃতভাবে নয়, মানসিক ক্লান্তির কারণেই উদাসীন হয়ে পড়েন।

৭. অ্যালগরিদম রাগ ও উত্তেজনাকে বেশি ছড়ায়
সোশ্যাল মিডিয়ার প্ল্যাটফর্মগুলো সাধারণত সেই কনটেন্ট বেশি ছড়ায় যেগুলোতে মানুষ দ্রুত রিঅ্যাক্ট করে। রাগ, ঘৃণা, শক, অপমান বা বিতর্ক এসবের ওপর মানুষ বেশি মনোযোগ দেয়। ফলে শান্ত বা সহানুভূতিশীল পোস্টের চেয়ে উসকানিমূলক পোস্ট দ্রুত ভাইরাল হয়।
৮. “স্ক্রিনের আড়াল” মানুষকে কম দায়বদ্ধ করে
বাস্তবে কাউকে অপমান করা কঠিন, কারণ সামনে একজন মানুষকে দেখা যায়। কিন্তু অনলাইনে অনেকেই মনে করেন তারা অদৃশ্য বা দায়মুক্ত। এতে সহানুভূতির অনুভূতি কমে যায় এবং নিষ্ঠুর মন্তব্য সহজ হয়ে পড়ে।
৯. ট্রল এখন অনেকের কাছে “এন্টারটেইনমেন্ট”
মিম কালচার ও ভাইরাল হওয়ার সংস্কৃতিতে অনেকেই মনে করেন সবকিছু নিয়েই “জোক” করা যায়। ধীরে ধীরে মৃত্যু, দুর্ঘটনা বা ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডিও কনটেন্টে পরিণত হচ্ছে। এতে বাস্তব কষ্টকে মানুষ কম অনুভব করছে।

১০. দীর্ঘদিনের সামাজিক হতাশা ও রাগ
অর্থনৈতিক চাপ, রাজনৈতিক বিভাজন, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা—এসব কারণে অনেক মানুষের ভেতরে জমে থাকা রাগ থাকে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম সেই রাগ বের করার সহজ জায়গা হয়ে গেছে।
১১. বারবার সহিংস কনটেন্ট দেখলে সংবেদনশীলতা কমে যায়
যখন মানুষ প্রতিদিন যুদ্ধ, দুর্ঘটনা, হত্যা বা অপমানের ডিটেইল্ড ও স্ট্র্যাটেজিকভাবে নির্মিত ভিডিও দেখে, তখন মস্তিষ্ক একধরনের আত্মরক্ষামূলক দূরত্ব তৈরি করে। এতে অন্যের কষ্ট কম বাস্তব মনে হতে পারে।
১২. দলগত পরিচয়ের রাজনীতি
এখন অনেক মানুষ “আমার দল বনাম তোমার দল” মানসিকতায় আটকে যায়। তখন প্রতিপক্ষকে মানুষ হিসেবে না দেখে “শত্রু” হিসেবে দেখা শুরু হয়। এই ডিহিউম্যনাইজেশন থেকেই নিষ্ঠুরতা বাড়ে।

১৩. সামাজিক স্বীকৃতির লোভ
কখনো কখনো সবচেয়ে নির্মম বা কটূক্তিপূর্ণ মন্তব্য পোস্টই বেশি লাইক, শেয়ার বা মনোযোগ পায়। ফলে কিছু মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে সীমা ছাড়ায়, কারণ এতে তারা দৃশ্যমান হয়।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অনলাইনের সবচেয়ে জোরে শোনা কণ্ঠগুলো সবসময় সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়। অনেক মানুষ এখনো সহানুভূতিশীল, কিন্তু ঘৃণামূলক কনটেন্ট সাধারণত বেশি চোখে পড়ে এবং বেশি ছড়ায়। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু আইন বা প্ল্যাটফর্ম নীতিমালা যথেষ্ট নয়। পরিবার, শিক্ষা, মিডিয়া এবং অনলাইন সংস্কৃতি—সব জায়গায় “মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখা” শেখানোর প্রয়োজন আছে।
সূত্র: থট ক্যাটালগ
ছবি: পেকজেলস