
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বিশ্বরাজনীতির এক প্রভাবশালী নাম। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান, কৌশল কিংবা বক্তব্য প্রায়ই আন্তর্জাতিক শিরোনাম হয়। আর সেই শিরোনাম আজ তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে। এপি নিউজ ও বিবিসি নিউজ বলছে, ইরানের স্টেট মিডিয়া মাত্রই নিশ্চিত করেছে এই মৃত্যু।

তবে কি খামেনি যুগের অবসান হলো? ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যৌথ এয়ারস্ট্রাইকে ইরানের ৮৬ বছর বয়সী সুপ্রিম লিডার খামেনি নিহত হওয়ার খবর দিয়েছিলেন ট্রাম্প তাঁর ট্রুথ সোশ্যালে। এদিকে ইরানের সংবাদ সংস্থা তাসনিম আর মেহর নিউজ বলছিল, তিনি আছেন ও এই সংঘাতে ইরানের হয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এখনও। এর মাঝেই বিবিসি নিউজ ও এপি নিউজ নিশ্চিত করল তাঁর নিহত হওয়ার খবর।
আয়াতুল্লাহ খামেনিকে নিয়ে বিশ্বব্যপী মানুষের কৌতুহল, আগ্রহ আর তাঁকে নিয়ে আলোচনা সবসময়ই ছিল। মাঝে মাঝেই মনে প্রশ্ন জাগে, ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এই মানুষটির ব্যক্তিগত জীবনযাপন আসলে কেমন ছিল? প্রচারের আড়ালে থাকা তার জীবনধারা নিয়ে রয়েছে নানা কৌতূহল। এখানে তুলে ধরা হলো তার জীবনযাপনের ১০টি দিক, যা অনেকেই হয়তো জানে না।

খামেনির জন্ম ১৯৩৯ সালের ১৯ এপ্রিল, ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের শহর মাশহাদে। তাঁর বাবা আয়াতুল্লাহ জাওয়াদ খামেনি ছিলেন একজন শিয়া স্কলার। পরিবারটি আর্থিকভাবে খুব সচ্ছল ছিল না। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে খামেনি উল্লেখ করেছেন, ছোটবেলায় তাঁদের পরিবার সাধারণ জীবনযাপন করত। বাড়িতে ছিল সীমিত সুযোগ-সুবিধা। রুটি আর কিশমিশ ছিল তাঁদের নিত্যদিনের খাবারের মাঝে অন্যতম।
সরল জীবনযাপনের দাবি
খামেনি নিজেকে সাধারণ জীবনধারার অনুসারী হিসেবে তুলে ধরেন। ইরানি রাষ্ট্রীয় প্রচারে প্রায়ই বলা হয়, তিনি বিলাসবহুল প্রাসাদে নয়, বরং তুলনামূলক সাদামাটা বাসভবনে থাকতেন। তাঁর বাসভবন ও কার্যালয় একই কমপ্লেক্সে অবস্থিত। ২০২২ সালে তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসকের বরাত দিয়ে নানা ফিচার ছাপা হয় এ নিয়ে মিডিয়ায়, যে তিনি খুব সংযমী ও সাধারণ যাপনরীতিতে বিশ্বাসী। জানা যায়, তিনি পারিবারিক বিয়ে বা বড় অনুষ্ঠানেও খুব বেশি খাবারের আয়োজন পছন্দ করতেন না।

ব্যক্তিগত সম্পদ নিয়ে রহস্য
তাঁর ব্যক্তিগত জীবন সাদামাটা বলে প্রচার থাকলেও, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়ের অধীনে থাকা বিশাল অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তাঁর ব্যক্তিগত আয়-ব্যয়ের নির্দিষ্ট তথ্য জনসমক্ষে স্পষ্ট নয়।
সময়নিষ্ঠ ও শৃঙ্খলাপূর্ণ রুটিন
ধর্মীয় নেতা হিসেবে তিনি নিয়মিত নামাজ, ধর্মীয় পাঠ ও অধ্যয়নে সময় দিতেন। ঘনিষ্ঠ সূত্র থেকে জানা যায়, তাঁর দিন শুরু হতো নামাজ দিয়ে এবং নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুযায়ী কাজ পরিচালিত হ্তো।
পরিবারকে আড়ালে রাখা
তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের জনসমক্ষে খুব কমই দেখা যায়। পরিবারকে রাজনৈতিক আলোচনার বাইরে রাখার চেষ্টা তাঁর জীবনযাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
বই ও পাঠাভ্যাস
খামেনি বইপ্রেমী হিসেবে পরিচিত। ধর্মীয় সাহিত্য ছাড়াও ইতিহাস, রাজনীতি ও কবিতার বই পড়তেন বলে জানা যায়। তাঁর ব্যক্তিগত লাইব্রেরি সমৃদ্ধ বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ আছে। টুইটারে তাঁর বিভিন্ন বক্তব্যের মাঝে নানা বইয়ের রেফারেন্স মেলে।
সাধারণ পোশাক ও রক্ষণশীল স্টাইল
তিনি সবসময় কালো বা গাঢ় রঙের পোশাক ও পাগড়ি পরতেন,যা শিয়া ধর্মীয় নেতাদের ঐতিহ্যবাহী পরিচয়ের অংশ। পোশাকে বৈচিত্র্য বা আধুনিক ফ্যাশনের ছাপ দেখা যায় নি কখনও তাঁর।
হত্যাচেষ্টা
খামেনির জীবনের এক বড় ঘটনা হচ্ছে তাঁকে হত্যার ব্যর্থ চেষ্টা। ১৯৮১ সালে এক বোমা হামলা করা হয় তাঁকে হত্যা করতে। একটি লেকচারের টেপ রেকর্ডারের ভেতরে লুকানো বোমা বিস্ফোরিত হলে তিনি গুরুতর আহত হন। এই হামলার পরও তিনি রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়াননি।

স্বাস্থ্যগত সীমাবদ্ধতা
১৯৮১ সালের হামলায় আহত হওয়ার পর তাঁর ডান হাত আংশিক অচল হয়ে যায়। বয়সজনিত কারণে জনসমক্ষে তাঁর উপস্থিতি আগের তুলনায় কমে গিয়েছিল বলেও পর্যবেক্ষকরা মনে করেন।
সীমিত সামাজিক মেলামেশা
তিনি সাধারণ জনগণের সঙ্গে সরাসরি মেলামেশা খুব সীমিত রাখতেন। বিশেষ অনুষ্ঠান, ধর্মীয় সমাবেশ বা রাষ্ট্রীয় বৈঠকেই তাঁর উপস্থিতি বেশি দেখা গিয়েছে।
খামেনির জীবনযাপন নিয়ে খুব বেশি কিছু আসলে জানা যায় না। একদিকে ধর্মীয় অনুশাসন, অন্যদিকে কঠোর নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা। ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও তিনি ব্যক্তিগত পরিসরকে দৃশ্যমানতার বাইরে রাখার চেষ্টা করেছেন। ফলে তাঁর জীবন নিয়ে কৌতূহল যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে বহু অজানা অধ্যায়। বিশ্বনেতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন তিনি সবসময়। আর খামেনি যুগের অবসানে তাঁর জীবনের নানা দিক নিয়ে আগ্রহ আরও বেড়ে যাবে এখন তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
সূত্র: এপি নিউজ, বিবিসি নিউজ, ইন্সটাগ্রাম, ইরান ফ্রন্টপেইজ, দ্য গার্ডিয়ান, উইকিপিডিয়া
ছবি: ইন্সটাগ্রাম