ম্যানকিপিং: যে কারণে এখন নারীরা ক্লান্ত হয়ে সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন দলে দলে
শেয়ার করুন
ফলো করুন

সঙ্গীর খেয়াল রাখা, তাঁকে সবকিছু মনে করিয়ে দেওয়া, নিজের সবকিছু বাদ দিয়ে তাঁকে সময় দেওয়া, অফিসের চাপ কিংবা ব্যক্তিগত দুশ্চিন্তার কথা মন দিয়ে শোনা, তাঁর সময় ও সুযোগমতো রোমান্টিক সময় কাটানো, তাঁকে সবকিছুতে সাপোর্ট দেওয়া; সম্পর্কে এমন অনেক দায়িত্ব আছে, যেগুলোকে আলাদা করে কাজ বলে মনে হয় না। অথচ এসবের পেছনে প্রচুর সময়, মনোযোগ ও মানসিক শ্রম অর্থাৎ এফোর্ট দিতে হয়। অনেক সম্পর্কেই এই দায়িত্বগুলো নারীর ওপর একতরফাভাবে এসে পড়ে। সেজন্য একসময় এই ক্লান্তিকর শ্রমকে পণ্ডশ্রম মনে হতে থাকে ও নারীরা বেরিয়ে যাওয়ার কথা ভাবেন সম্পর্ক থেকে। সাম্প্রতিক সময়ে একটি নতুন শব্দে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে একে আধুনিক ডেটিং পরিভাষায়।

অনেক সম্পর্কেই এই দায়িত্বগুলো নারীর ওপর একতরফাভাবে এসে পড়ে
অনেক সম্পর্কেই এই দায়িত্বগুলো নারীর ওপর একতরফাভাবে এসে পড়ে

সহজ করে বললে, ম্যানকিপিং হলো পুরুষের আবেগ, সামাজিক যোগাযোগ, সম্পর্ক ও মানসিক সুস্থতা ধরে রাখার জন্য নারীর তরফ থেকে যে অদৃশ্য, বিনা পারিশ্রমিকের এবং একতরফা এফোর্ট দেওয়া হয় সেটি। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের আলোচনায় শব্দটি নতুন করে পরিচিতি পেয়েছে। এর সঙ্গে সমাজবিজ্ঞানের পুরোনো ধারণা কিনকিপিং–এর যোগ আছে যা আসলে পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনের মধ্যে যোগাযোগ ও সম্পর্ক ধরে রাখার যে অদৃশ্য দায়িত্ব, তাকে বলা হয়।

বিজ্ঞাপন

শুধু প্রেম নয়, রিলেশনশিপ ম্যানেজমেন্ট

একটি সম্পর্কে ম্যানকিপিং নানা রূপে দেখা যেতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত আছে ইমোশনাল লেবার বা আবেগগত শ্রম। পুরুষ সঙ্গী অফিসের চাপ, অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তা কিংবা ব্যক্তিগত হতাশার কথা বললে নারী অনেক সময় হয়ে ওঠেন তাঁর প্রধান শ্রোতা ও পরামর্শক।

 ইমোশনাল শ্রমের কোনো দৃশ্যমান হিসাব নেই
ইমোশনাল শ্রমের কোনো দৃশ্যমান হিসাব নেই

তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়া, উৎসাহ দেওয়া, সমস্যার কথা শোনা কিংবা মন ভালো করার চেষ্টা করা এসবও একপর্যায়ে নিয়মিত দায়িত্বে পরিণত হতে পারে। অথচ নারীরা সেটি পান না সেভাবে বিপরীত দিক থেকে। তাছাড়া সমস্যা হলো, এই কাজগুলো বেশির ভাগ সময় দৃশ্যমান নয়। রান্না, কাপড় ধোয়া কিংবা ঘর পরিষ্কার করার মতো কাজের হিসাব করা যায়। কিন্তু ইমোশনাল শ্রমের কোনো দৃশ্যমান হিসাব নেই।

বিজ্ঞাপন

অদৃশ্য শ্রমে ক্লান্তি

ম্যানকিপিং তখনই সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যখন এই দায়িত্ব পারস্পরিক থাকে না। একটি সম্পর্কে দুজনই একে অপরের কথা শুনবেন, প্রয়োজনের সময়ে পাশে দাঁড়াবেন এবং সম্পর্কের দায়িত্ব ভাগ করে নেবেন, এটাই স্বাভাবিক।

এটি অনেকটা মেন্টাল লোড বা মানসিক বোঝার মতো
এটি অনেকটা মেন্টাল লোড বা মানসিক বোঝার মতো
ছবি: এআই

কিন্তু একজন নারী যদি নিয়মিত সঙ্গীর আবেগ সামলান, তাঁর সামাজিক যোগাযোগের কথা মনে রাখেন, পরিবারের সম্পর্কগুলো টিকিয়ে রাখেন, তাঁর দেখভাল করেন এবং একই সঙ্গে নিজের আবেগ আর সামগ্রিক দায়িত্বও সামলাতে থাকেন, তাহলে তৈরি হতে পারে ভয়াবহ মানসিক ক্লান্তি। এটি অনেকটা মেন্টাল লোড বা মানসিক বোঝার মতো। কাজটি শুধু করা নয়; কাজটি করার কথা মনে রাখা, পরিকল্পনা করা এবং প্রয়োজনমতো অন্যকে মনে করিয়ে দেওয়াও এর অংশ।

ডেটিংয়েও বদল আনছে ‘ম্যানকিপিং’

সাম্প্রতিক সময়ে ডেটিংয়ের ক্ষেত্রেও ম্যানকিপিং নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। কিছু নারী মনে করছেন, প্রচলিত সম্পর্কে প্রেমিকার ভূমিকার পাশাপাশি তাঁদের কাছ থেকে আরেকটি দায়িত্বও প্রত্যাশা করা হয়। আর তা হলো সঙ্গীর আবেগের ক্ষেত্রে মূল ভরসা আর তাঁর জীবনের ব্যবস্থাপক হওয়া।

ম্যানকিপিং করতে করতে ডেটিংও এক বোঝা মনে হয় অনেক নারীর কাছে
ম্যানকিপিং করতে করতে ডেটিংও এক বোঝা মনে হয় অনেক নারীর কাছে

ফলে নতুন সম্পর্কে যাওয়ার অর্থ কারও কারও কাছে শুধু একজন সঙ্গী পাওয়া নয়; বরং আরেকজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের আবেগ, বন্ধুত্ব ও সামাজিক সম্পর্কের দায়িত্বও নিজের কাঁধে তুলে নেওয়া। বিশেষ করে সম্পর্কের শুরুতেই যদি বোঝা যায়, আবেগগত যত্নের দায়িত্বটি সমানভাবে ভাগ হবে না, তাহলে ডেটিংও এক বোঝা মনে হয় অনেক নারীর কাছে।

তবে বিতর্কও আছে

‘ম্যানকিপিং’ শব্দটি নিয়ে অবশ্য মতভেদ রয়েছে। কেউ মনে করেন, নারীরা সম্পর্কে যে অদৃশ্য আবেগগত শ্রম দেন, সেটিকে ভাষায় প্রকাশ করার জন্য শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ। এতে সম্পর্কের অসম দায়িত্ব নিয়ে কথা বলা সহজ হয়। আবার সমালোচকদের কেউ মনে করেন, শব্দটি পুরুষদের সামগ্রিকভাবে আবেগগতভাবে অক্ষম বা সামাজিকভাবে অসহায় হিসেবে দেখানোর ঝুঁকি তৈরি করে।

ম্যানকিপিংকে পুরুষবিরোধী কোনো ধারণা হিসেবে দেখা ঠিক নয়
ম্যানকিপিংকে পুরুষবিরোধী কোনো ধারণা হিসেবে দেখা ঠিক নয়

কারণ সব পুরুষ যেমন একই রকম নন, তেমনি সব নারীও ম্যানকিপিংয়ের ভার বহন করেন না। অনেক সম্পর্কেই দুজন সমানভাবে একে অপরের আবেগ ও সামাজিক জীবনের যত্ন নেন। তাই ম্যানকিপিংকে পুরুষবিরোধী কোনো ধারণা হিসেবে দেখার চেয়ে সম্পর্কের অদৃশ্য শ্রম কীভাবে ভাগ হচ্ছে, সেই প্রশ্ন তোলার একটি নতুন প্যারামিটার হিসেবে দেখা যেতে পারে।

ভালোবাসা শুধু অনুভূতির নাম নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে যত্ন, মনোযোগ ও দায়িত্বও
ভালোবাসা শুধু অনুভূতির নাম নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে যত্ন, মনোযোগ ও দায়িত্বও

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নগুলো খুব সহজ। সম্পর্কে কে কাকে কতটা মনে রাখছেন? কে কার মন খারাপ বুঝে পাশে দাঁড়াচ্ছেন? কে কার জন্মদিনের কথা মনে রেখে স্পেশাল কিছু প্ল্যান করছেন, কে বিভিন্ন জরুরি কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই যত্ন কি দুজনের দিক থেকেই আসছে? এই বিষয়গুলোই আসলে ঠিক করে দেয় একজন নারী সম্পর্কে ক্লান্ত হয়ে উঠবেন কিনা। কারণ ভালোবাসা শুধু অনুভূতির নাম নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে যত্ন, মনোযোগ ও দায়িত্বও। সেই দায়িত্ব যদি সব সময় একজনের কাঁধেই থাকে, তাহলে একসময় ভালোবাসার আড়ালে সেটিই হয়ে উঠতে পারে অদৃশ্য শ্রমের আরেক নাম, যাকে আধুনিক ডেটিং ডিকশনারি বলছে ম্যানকিপিং।

সূত্র: থট ক্যাটালগ

ছবি: ইন্সটাগ্রাম, পেকজেলস ও এআই

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬, ০১: ০০
বিজ্ঞাপন