খাবার আলাদা, সম্পর্ক নয়: ‘ফুড ডিভোর্স’ আসলে কী
শেয়ার করুন
ফলো করুন

এই পরিকল্পনার ভার অনেক পরিবারেই অদৃশ্যভাবে একজনের কাঁধে গিয়ে পড়ে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সেই মানুষটি একজন নারী।

সাম্প্রতিক সময়ে এই ক্লান্তি থেকেই আলোচনায় এসেছে নতুন একটি শব্দ ‘ফুড ডিভোর্স’। নাম শুনে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার কথা মনে হলেও এর সঙ্গে আসলে বিবাহবিচ্ছেদের কোনো সম্পর্ক নেই। বরং এর অর্থ হলো, পরিবারের সবার জন্য প্রতিদিন রান্না করার বাধ্যবাধকতা থেকে কিছুটা সরে এসে নিজের সময়, পছন্দ এবং স্বস্তিকে গুরুত্ব দেওয়া।

রান্নাঘর থেকে একটু বিরতি

যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলের দুই সন্তানের মা ক্যাথলিন ডোনাহোর অভিজ্ঞতা এই প্রবণতার একটি বাস্তব উদাহরণ। স্বামী দীর্ঘ সময় বাইরে কাজ করতেন, আর তিনি বাড়ি থেকে কাজ করতেন। ফলে ধীরে ধীরে পরিবারের রাতের খাবার তৈরির দায়িত্ব তাঁর ওপরই এসে পড়ে।

শুরুতে রান্না, বাজার করা, সপ্তাহের মেনু ঠিক করা সবই তিনি যত্ন নিয়ে করতেন। কিন্তু সন্তানদের দীর্ঘ সময় বাড়িতে থাকার পরিস্থিতিতে কাজের চাপ বাড়তে থাকে। একবেলার রান্না যেন পরিণত হয় সারাদিনের একের পর এক খাবার তৈরির কাজে। একসময় রাতের খাবার নিয়ে আনন্দের বদলে ক্লান্তিই বেশি অনুভব করতে শুরু করেন তিনি।

তখন ক্যাথলিন সিদ্ধান্ত নেন, সপ্তাহের প্রতিদিন নিয়ম করে রান্না করবেন না। সহজ খাবার, রেডিমেড খাবার কিংবা পরিবারের সদস্যরা নিজেরাই তৈরি করতে পারে। এমন খাবার বেছে নিতে শুরু করেন। কখনো গ্রিলড চিজ, কখনো একেবারে সহজ কোনো খাবার। তাঁর উপলব্ধি ছিল, পরিবারের সবাই যদি সাধারণ একটি খাবারেও সন্তুষ্ট থাকে, তাহলে প্রতিদিন ‘নিখুঁত’ খাবার বানাতে গিয়ে নিজের সব শক্তি শেষ করে ফেলার প্রয়োজন নেই।

বিজ্ঞাপন

রান্নার সঙ্গে থাকে অদৃশ্য মানসিক চাপ

রান্নার কাজ বলতে আমরা অনেক সময় শুধু চুলার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বোঝাই। কিন্তু বাস্তবে কাজটি শুরু হয় তারও আগে।

আজ কী রান্না হবে, কার কী পছন্দ, ফ্রিজে কী আছে, বাজার থেকে কী আনতে হবে, কোন খাবার আগে শেষ করতে হবে, সন্তান কোন খাবার খেতে চাইবে না এসব ভাবনাও রান্নার দায়িত্বের অংশ। অর্থাৎ রান্নাঘরের কাজের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি বড় ‘মানসিক বোঝা’।

ইয়াহু ও ইউগভের মার্চ ২০২৬-এর এক জরিপে ১ হাজার ৬৯৯ জন মার্কিন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে ১৬ শতাংশ জানিয়েছেন, পরিবারের রান্নার দায়িত্ব কীভাবে ভাগ করা হয়েছে তা নিয়ে তারা প্রায়ই বিরক্তি অনুভব করেন। ১১ শতাংশ বলেছেন, কোনো বিষয় বোঝাতে বা প্রতিবাদ জানাতে তারা কখনো রান্না করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
অর্থাৎ ক্লান্তির কারণ শুধু রান্না করা নয়; প্রতিদিন পরিবারের খাবারের পুরো দায়িত্ব মাথায় নিয়ে চলাটাও বড় চাপ।

‘আমি রান্না ভালোবাসতাম, তারপর আর ভালো লাগেনি’

মিনিয়াপোলিসের লেখক ও দুই সন্তানের মা এরিন হোয়াইটের অভিজ্ঞতাও অনেকের কাছে পরিচিত মনে হতে পারে। একসময় রান্না করা তাঁর সত্যিই ভালো লাগত। রান্নার বই সংগ্রহ করা, নতুন রেসিপি খোঁজা কিংবা পরিবারের জন্য নতুন পদ তৈরি করা ছিল আনন্দের বিষয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই আনন্দ একসময় হারিয়ে যায়।

পরিবারে সন্তানদের সংখ্যা কমে আসার পর তিনি ধীরে ধীরে প্রতিদিনের নির্দিষ্ট ‘পারিবারিক রাতের খাবার’ ব্যবস্থা থেকে সরে আসেন। এখন পরিবারের সবাইকে একই সময়ে একই খাবার খেতেই হবে, এমন নিয়ম নেই। কেউ আগে খান, কেউ পরে। প্রয়োজন হলে যে যার মতো সহজ কিছু তৈরি করে নেন।

কখনো বড় হাঁড়ি ভরে স্যুপ বা স্টু রান্না হয়, কখনো সালাদ, ডিম, স্যামন কিংবা অন্য কোনো সহজ খাবার। রান্নাঘর বন্ধ হয়নি, কিন্তু প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে সবার জন্য খাবার তৈরি করার চাপটাও আর নেই।

এরিনের কাছে সবচেয়ে বড় স্বস্তির মুহূর্তগুলোর একটি হলো। বিকেল সাড়ে পাঁচটা বাজলেও তাঁকে যখন রাতের খাবারের কথা ভাবতে হয় না। সেই সময় তিনি ব্যায়াম করতে পারেন, বই পড়তে পারেন, কাজ শেষ করতে পারেন কিংবা কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকতে পারেন।

বিজ্ঞাপন

তাহলে কি পরিবারের সবাই আলাদা আলাদা খাবে?

‘ফুড ডিভোর্স’ মানেই পরিবারের সবাই নিজেদের খাবার নিয়ে আলাদা হয়ে যাওয়া নয়। এর মূল কথা হলো, খাবারের দায়িত্ব যেন একজন মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি না করে।

কেউ কোনো দিন রান্না করতে চাইলে করবেন। আবার কারও রান্না করার ইচ্ছা না থাকলে সেদিন সহজ খাবার হতে পারে। প্রয়োজন হলে বাইরে থেকে খাবার আনা যেতে পারে। পরিবারের অন্য সদস্যরাও রান্নাঘরের দায়িত্ব নিতে পারেন। আর বিশেষ দিনগুলোতে সবাই একসঙ্গে বসে খাওয়ার আনন্দ তো থাকবেই।

অর্থাৎ এটি খাবারের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করার ট্রেন্ড নয়; বরং খাবারকে ঘিরে তৈরি হওয়া অতিরিক্ত চাপ কমানোর একটি উপায়।

বাংলাদেশি পরিবারে কতটা প্রাসঙ্গিক?

বাংলাদেশি পরিবারে খাবারের সঙ্গে আবেগের সম্পর্ক খুব গভীর। মায়ের রান্না, ছুটির দিনের দুপুর, ঈদের বিশেষ পদ কিংবা প্রিয় মানুষের হাতে রান্না এসব শুধু খাবার নয়, আমাদের স্মৃতি ও সম্পর্কেরও অংশ।

তবে এই আবেগের আড়ালে রান্নার দায়িত্বটি যেন স্বাভাবিকভাবেই একজন নারীর কাজ হয়ে না যায়, সেটিও ভাবার সময় এসেছে। একজন নারী চাকরি করেন, সংসার সামলান, সন্তান দেখাশোনা করেন, নিজের জন্য সময় বের করার চেষ্টা করেন। তার সঙ্গে যদি প্রতিদিন পরিবারের সবার খাবারের পছন্দ-অপছন্দের হিসাবটাও তাঁকেই রাখতে হয়, তাহলে ক্লান্তি আসাটাই স্বাভাবিক।

তাই ‘ফুড ডিভোর্স’কে শুধু বিদেশি জীবনযাপনের নতুন একটি শব্দ হিসেবে দেখলে হয়তো বিষয়টির গুরুত্ব পুরোপুরি বোঝা যাবে না। এর ভেতরে আছে একটি খুব সাধারণ প্রশ্ন সংসারের খাবারের দায়িত্ব কি সত্যিই একজনের একার?

শুধু রান্না নয়, ভাগ হোক পুরো দায়িত্ব

স্বামী সপ্তাহে একদিন রান্না করলেন আর স্ত্রী বাকি ছয় দিন করলেন, এটিকে সবসময় সমান দায়িত্ব ভাগ বলা যায় না। কারণ খাবারের কাজ শুধু রান্না নয়। মেনু ঠিক করা, বাজারের তালিকা করা, প্রয়োজনীয় উপকরণ আছে কি না দেখা, বাজার করা, রান্না, পরিবেশন এবং পরে রান্নাঘর গুছিয়ে রাখা সবই এর অংশ।

তাই পরিবারের খাবারের দায়িত্ব ভাগ করার অর্থ হলো পুরো প্রক্রিয়াটিই ভাগ করে নেওয়া। আর কেউ যদি কোনো দিন বলেন, ‘আজ রান্না করতে ইচ্ছা করছে না’, সেটিকে অলসতা না ভেবে বিশ্রামের প্রয়োজন হিসেবেও দেখা যেতে পারে।

ভালোবাসার জন্য প্রতিদিন নিখুঁত ডিনার দরকার নেই

আমরা অনেক সময় একটি আদর্শ পরিবারের ছবি কল্পনা করি সবাই একই টেবিলে বসে সুন্দর করে রাতের খাবার খাচ্ছে। বাস্তব জীবন অবশ্য এতটা গোছানো নয়। কখনো সন্তান আগে খেয়ে ঘুমিয়ে যায়। কেউ অফিস থেকে দেরিতে ফেরেন। কারও শরীর খারাপ। কারও কাজের চাপ বেশি। আবার কারও সেদিন রান্না করার মতো মানসিক শক্তিই নেই।

সেদিন রাতের খাবার যদি হয় ডিমভাজি আর রুটি, তাতেও সংসার খারাপ হয়ে যায় না। বরং কোনো কোনো দিন রান্নার পেছনে সময় না দিয়ে পরিবারের মানুষ একসঙ্গে গল্প করতে পারে। কেউ ব্যায়ামের ক্লাসে যেতে পারে, কেউ নিজের কাজ শেষ করতে পারে, কেউ একটু আগে ঘুমাতে যেতে পারে। কারণ একটি পরিবারের সুখ শেষ পর্যন্ত খাবারের পদসংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না।

‘ফুড ডিভোর্স’-এর আসল শিক্ষা

‘ফুড ডিভোর্স’ আসলে সম্পর্ক থেকে দূরে সরে যাওয়ার গল্প নয়। বরং এটি মনে করিয়ে দেয়, ভালোবাসার সম্পর্কের মধ্যেও দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া যায়, নিজের জন্য সময় রাখা যায় এবং সবকিছু নিখুঁত না হলেও একটি সংসার সুন্দর থাকতে পারে।

প্রতিদিন ‘আজ কী রান্না হবে?’ এই প্রশ্নের উত্তর একজন মানুষকেই দিতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। পরিবারের সবার খাবারের পছন্দও এক হতে হবে না। কেউ ভাত পছন্দ করবেন, কেউ হালকা খাবার, কেউ আলাদা খাদ্যাভ্যাস মেনে চলবেন এই ভিন্নতাকে সম্মান করাও সম্পর্কেরই অংশ।

কখনো সহজ খাবার, কখনো বাইরে থেকে আনা খাবার, আবার কখনো আলাদা সময়ে খাওয়া এসবের মাঝেও সম্পর্কের উষ্ণতা অটুট থাকতে পারে। আধুনিক ‘ফুড ডিভোর্স’-এর আসল বার্তাটি তাই খুব সহজ—খাবারকে ভালোবাসুন, নিজের পছন্দকেও গুরুত্ব দিন; তবে খাবারের দায়িত্বের চাপে যেন নিজেকে হারিয়ে না ফেলেন।

তথ্য: ইয়াহু লাইফস্টাইল

ছবি: এআই

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ১৫: ০০
বিজ্ঞাপন