
সম্পর্ক ভেঙে গেলে মানুষটি হয়ে যান ‘প্রাক্তন’। কিন্তু সম্পর্কের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতিগুলো কি এত সহজে প্রাক্তন হয়ে যায়? একই শহর, একই বন্ধুদের আড্ডা, একই কর্মক্ষেত্র কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম; কোথাও না কোথাও হঠাৎ দেখা হয়ে যেতে পারে পুরোনো মানুষটির সঙ্গে। কখনো আবার বিচ্ছেদের পরও তাঁর কাছ থেকে আসতে পারে একটি ছোট্ট মেসেজ। সচেতন বা অবচেতনভাবেই যোগাযোগ হতে পারে সাবেক স্বামী-স্ত্রী বা প্রেমিক-প্রেমিকার।

প্রাক্তনের সঙ্গে সম্পর্কের সমীকরণে তখন কী করবেন? উত্তর দেবেন, নাকি এড়িয়ে যাবেন? প্রাক্তনের সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখা সম্ভব, নাকি পুরোপুরি দূরে থাকাই ভালো? এর কোনো একক উত্তর নেই। কারণ প্রতিটি সম্পর্কের গল্প আলাদা। তবে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর নিজের মানসিক শান্তি, আত্মসম্মান ও বর্তমান জীবনকে গুরুত্ব দিয়ে প্রাক্তনের সঙ্গে আচরণের কিছু বিষয় মনে রাখা যেতে পারে।
সম্প্রতি টালিউডের সর্বকালের জনপ্রিয় জুটি দেব-শুভশ্রীর পুনর্মিলনকে ঘিরে এসব প্রসঙ্গ বেশ আলোচনায় আছে। রিয়েল নয়, রিল লাইফে তাঁরা এক হচ্ছেন কাজের প্রয়োজনে। নতুন সিনেমা করছেন একসঙ্গে। তার প্রচারণায় একসঙ্গে দেখা দিচ্ছেন নানা ইভেন্টে আর ফটোশুটে। আর সেখানে তাঁদেরকে দেখে সবাই বলছে, এই কাপলের দুর্দান্ত কেমিস্ট্রিতে এতটুকু ভাটা পড়েনি।

বহুদিন সম্পর্কে থেকে তাঁরা মুভ অন করেছেন। নতুন কারও সঙ্গে সাজিয়েছেন জীবন। তারপরেও এই মুহূর্তে ভক্তদের আদর করে ডাকা ''দেশু'' নামের এই জুটি সবস্ময় স্পটলাইটে থাকেন। একসঙ্গে দেখা দিলেই তাঁদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, একে অপরের প্রতি আচরণ আর তাঁদেরকে একসঙ্গে কেমন লাগছে এসব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে যায়।

অনেকেই বলছেন, এসব নিছক প্রচারণা কৌশল। দেব-শুভশ্রী ব্যাপারগুলো বেশ ম্যাচিউরভাবেই হ্যান্ডেল করছেন। আসলে এসব ক্ষেত্রে আমাদেরকে প্রাক্তনের সঙ্গে সম্পর্কের সমীকরণে মনে রাখতে হবে ৫টি 'ডু' আর ৫টি 'ডোন্ট'-এর কথা।
যা করবেন
১. নিজের অনুভূতিকে গুরুত্ব দিন
সম্পর্ক শেষ হওয়ার পরপরই আমরা এখন বন্ধু এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন নেই। বিচ্ছেদের পরও যদি কষ্ট, রাগ, অভিমান কিংবা পুরোনো সম্পর্কের প্রতি টান থেকে থাকে, তাহলে কিছুটা দূরত্ব নেওয়াই ভালো। নিজেকে সময় দেওয়া দুর্বলতার লক্ষণ নয়; বরং সম্পর্ক থেকে বের হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে এটি প্রয়োজনীয় একটি ধাপ।
২. যোগাযোগের সীমা ঠিক করুন
প্রাক্তনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেই হলে কতটা কথা বলবেন, কখন কথা বলবেন—সেটির একটি সীমা নিজের জন্য ঠিক করে নিতে পারেন। বিশেষ করে বিচ্ছেদের পরপরই নিয়মিত চ্যাট, গভীর রাতে ফোনকল কিংবা প্রতিদিনের খোঁজখবর পুরোনো আবেগকে আবারও উসকে দিতে পারে। প্রয়োজনের বাইরে যোগাযোগ কমিয়ে আনা অনেক সময় দুজনকেই সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। দেব-শুভশ্রীও কিন্তু তাই করেছিলেন।
৩. সামনাসামনি দেখা হলে সংযত আচরণ করুন
একই কর্মক্ষেত্র, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বন্ধুমহলে থাকলে প্রাক্তনের সঙ্গে দেখা হতেই পারে। এমন পরিস্থিতিতে অতীতের হিসাব কষার বদলে স্বাভাবিক ও ভদ্র আচরণ করাই ভালো। একটি ‘হাই’ কিংবা ‘কেমন আছ?’ বলা নিছক সৌজন্য। এর অর্থ আবার সম্পর্কে ফিরে যাওয়া নয়।

৪. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের সীমা বুঝুন
প্রাক্তনের প্রতিটি পোস্ট, স্টোরি কিংবা নতুন ছবি নিয়মিত দেখার অভ্যাস থাকলে নিজেকে প্রশ্ন করুন—এতে কি আপনি ভালো থাকছেন? উত্তর যদি ‘না’ হয়, তাহলে আনফলো, মিউট কিংবা প্রয়োজন হলে ব্লক করাও স্বাভাবিক। এটি প্রতিশোধ নয়; বরং নিজের মানসিক শান্তির জন্য একটি সীমারেখা তৈরি করা।
৫. পুরোনো সম্পর্ক থেকে শিক্ষা নিন
প্রাক্তনকে শুধু ‘ভুল মানুষ’ হিসেবে দেখলে সম্পর্ক থেকে শেখার সুযোগটিও হারিয়ে যেতে পারে। কী ভালো ছিল, কোথায় সমস্যা হয়েছিল, নিজের কোন আচরণ বদলানো দরকার—এসব নিয়ে ভাবুন। অতীতের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের সম্পর্ককে আরও পরিণত করে তুলতে পারে।
যা করবেন না
১. একাকিত্বের মুহূর্তে বারবার যোগাযোগ করবেন না
একাকী লাগলে প্রাক্তনকে মেসেজ করতে ইচ্ছে করতেই পারে। বিশেষ করে রাতের বেলা এই প্রবণতা আরও বাড়তে পারে। মেসেজ পাঠানোর আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন, সত্যিই কি তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চাইছেন, নাকি এই মুহূর্তের একাকিত্ব থেকে বের হতে চাইছেন? মনে রাখা ভালো, একাকিত্ব আর ভালোবাসা এক জিনিস নয়।
২. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজরদারি করবেন না
প্রাক্তন কোথায় যাচ্ছেন, কার সঙ্গে ছবি দিচ্ছেন, কাকে অনুসরণ করছেন—এসব জানার চেষ্টা যত বাড়বে, ততই নিজের বর্তমান জীবন থেকে মন সরে যেতে পারে। বিশেষ করে নতুন কারও সঙ্গে প্রাক্তনের ছবি দেখে নিজের সঙ্গে তুলনা করা থেকে বিরত থাকুন। এতে আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়ার পাশাপাশি পুরোনো কষ্টও ফিরে আসতে পারে।
৩. নতুন সঙ্গীর সঙ্গে প্রাক্তনের তুলনা করবেন না
‘ও এটা করত’, ‘ওর মতো তুমি নও’—এ ধরনের তুলনা নতুন সম্পর্কের জন্য অন্যায্য। প্রত্যেক মানুষ আলাদা, প্রতিটি সম্পর্কও আলাদা। তাই নতুন সম্পর্ককে পুরোনোটির ছায়া থেকে বের করে আনতে সময় দিন।

৪. প্রাক্তনের নতুন সম্পর্ক নিয়ে মন্তব্য করবেন না
প্রাক্তন কার সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছেন, কেন জড়িয়েছেন, নতুন মানুষটি কেমন—এসব নিয়ে বন্ধুদের কাছে আলোচনা করা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইঙ্গিতপূর্ণ পোস্ট দেওয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। প্রাক্তনের ব্যক্তিগত জীবন এখন তাঁর নিজের বিষয়। সেখানে অযাচিত হস্তক্ষেপ না করাই ভালো।
৫. শুধু বন্ধুত্বের নামে পুরোনো ঘনিষ্ঠতা ধরে রাখবেন না
‘আমরা তো বন্ধু’—এই কথার আড়ালে যদি একজন এখনো অন্যজনকে ফিরে পাওয়ার আশা করেন, তাহলে সেই বন্ধুত্ব দুজনের জন্যই কষ্টের হয়ে উঠতে পারে। বন্ধুত্ব তখনই সম্ভব, যখন দুজনেই অতীতের সম্পর্ককে মেনে নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে পারেন। একজন যদি এখনো পুরোনো সম্পর্কে আটকে থাকেন, তাহলে দূরত্বই হয়তো ভালো সমাধান।
৬. নতুন সম্পর্কে যাওয়ার আগে নিজেকে সময় দিন
প্রাক্তনের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ হওয়ার পরপরই নতুন সম্পর্কে জড়ানোর তাড়া অনেক সময় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। নতুন মানুষটিকে পুরোনো সম্পর্ক ভুলে যাওয়ার ‘উপায়’ হিসেবে ব্যবহার করাও ঠিক নয়। নিজেকে কিছুটা সময় দিন। আপনি সত্যিই নতুন সম্পর্কে প্রস্তুত কি না, নাকি শুধু পুরোনো সম্পর্কের শূন্যতা পূরণ করতে চাইছেন, সেটি বোঝার চেষ্টা করুন।
সব সম্পর্ক বন্ধুত্বে রূপ নেওয়ার জন্য তৈরি নয়। প্রাক্তনের সঙ্গে যোগাযোগ যদি আপনাকে বারবার কষ্ট দেয়, পুরোনো ক্ষত উসকে দেয় কিংবা আপনার ব্যক্তিগত সীমারেখাকে সম্মান করা না হয়, তাহলে যোগাযোগ বন্ধ রাখাই ভালো হতে পারে। বিশেষ করে সম্পর্কটি যদি বিষাক্ত বা নির্যাতনমূলক হয়ে থাকে, তাহলে নিজের নিরাপত্তা ও মানসিক সুস্থতাকে সবার আগে রাখতে হবে। প্রয়োজনে প্রাক্তনকে ব্লক করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দূরত্ব তৈরি করা কিংবা পারস্পরিক যোগাযোগ সীমিত করা প্রতিশোধ নয়—নিজেকে সুরক্ষিত রাখারই অংশ।

প্রাক্তনের সঙ্গে কী করবেন, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, নিজের সঙ্গে কী করবেন। একটি সম্পর্ক শেষ হয়েছে মানেই আপনার মূল্য কমে যায়নি। প্রাক্তনকে ভুলে যাওয়া কোনো প্রতিযোগিতা নয়, আবার বন্ধুত্ব রাখাও কোনো বাধ্যবাধকতা নয়। কেউ কেউ জীবনে ফিরে আসেন বন্ধু হয়ে, কেউ থেকে যান স্মৃতি হয়ে। কারও সঙ্গে হয়তো আর কোনো যোগাযোগই রাখা সম্ভব হয় না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, যে সিদ্ধান্ত আপনার মানসিক শান্তি, আত্মসম্মান ও বর্তমান জীবনের জন্য ভালো, সেটিই বেছে নেওয়া। কারণ সব সম্পর্ককে ধরে রাখতে হয় না। কিছু সম্পর্কের সবচেয়ে সুন্দর সমাপ্তি হলো সেখান থেকে শান্তভাবে এগিয়ে যাওয়া।
সূত্র: থট ক্যাটালগ
ছবি: এআই, ইন্সটাগ্রাম ও পেকজেলস