
সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের কাছের মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ করেছে, দূরত্ব কমিয়েছে, মুহূর্ত ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে অতিরিক্ত অনলাইন উপস্থিতি কখনো কখনো সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটিতেই প্রভাব ফেলতে পারে। সরাসরি কথা বলা, মন দিয়ে শোনা এবং একে অপরের দিকে মনোযোগ দেওয়া।
একসঙ্গে থাকার অর্থ সবসময় একসঙ্গে থাকা নয়। শারীরিকভাবে কাছাকাছি থেকেও মানসিকভাবে দূরে সরে যাওয়া সম্ভব। ফোনে বারবার নোটিফিকেশন আসছে, নতুন মেসেজ, রিলস, স্টোরি বা কমেন্টের উত্তর দিতে হচ্ছে এসব ছোট ছোট ব্যস্ততা ধীরে ধীরে দুজনের মুখোমুখি সময়টাকে কমিয়ে দিতে পারে।

দিনের শেষে দুজন হয়তো একই সোফায় বসে আছেন। কিন্তু একজন নিজের ফিড দেখছেন, অন্যজন ভিডিও দেখছেন। প্রয়োজনীয় কথাগুলো হয়তো হচ্ছে, কিন্তু দিনের গল্প, মন খারাপ, আনন্দ কিংবা ছোটখাটো অনুভূতিগুলো ভাগ করে নেওয়ার সময়টুকু হারিয়ে যাচ্ছে।
সমস্যা ফোন ব্যবহারেই নয়। আসল বিষয় হলো, ফোন কি সম্পর্কের মধ্যে থাকা কথোপকথনের জায়গা দখল করে নিচ্ছে?
সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের অনেক মানুষের সঙ্গে সংযুক্ত রাখে। কিন্তু অনলাইনে শত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেও পাশে থাকা মানুষটির সঙ্গে সত্যিকারের যোগাযোগ কমে যেতে পারে।

সারাদিন অন্যের পোস্টে লাইক, কমেন্ট, মেসেজের উত্তর কিংবা ভিডিও দেখার পরও হয়তো নিজের সঙ্গীর সঙ্গে কয়েক মিনিট মন দিয়ে কথা বলার সময় বের হচ্ছে না। ফলে সম্পর্কের মধ্যে তৈরি হতে পারে এক ধরনের নীরব দূরত্ব।
এই দূরত্ব খুব ধীরে তৈরি হয়। প্রথমে হয়তো শুধু খাবার টেবিলে ফোন দেখা। পরে কথা বলার মাঝেও স্ক্রিনে চোখ রাখা। তারপর একসঙ্গে সময় কাটানোর বদলে পাশাপাশি বসে আলাদা আলাদা অনলাইন জগতে ডুবে থাকা। একসময় দুজনের মধ্যে কথা কমে যায়, অথচ কেউ ঠিক বুঝতেও পারেন না কখন বদলে গেল সম্পর্কের অভ্যাস।
ইনস্টাগ্রাম বা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা সাধারণত মানুষের জীবনের সুন্দর অংশটুকুই দেখি। সাজানো ঘর, রোম্যান্টিক ডেট, সারপ্রাইজ, ফুল, ভ্রমণ কিংবা সুখী দাম্পত্যের ছবি, সবকিছুই যেন নিখুঁত।

কিন্তু পর্দায় দেখা এই ছবিগুলো একটি সম্পর্কের পুরো গল্প নয়। তারপরও দিনের পর দিন অন্যের সাজানো জীবনের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের তুলনা করতে করতে তৈরি হতে পারে অযৌক্তিক প্রত্যাশা।
মনে হতে পারে, ‘অন্যদের সম্পর্ক এত সুন্দর, আমাদেরটা কেন নয়?’
এভাবে অজান্তেই নিজের সম্পর্কের ভালো দিকগুলো চোখ এড়িয়ে গিয়ে তুলনার জায়গাটা বড় হয়ে উঠতে পারে। সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখা জীবনের সঙ্গে বাস্তব জীবনকে মেলাতে গেলে সম্পর্কের স্বাভাবিক ওঠানামাও তখন অসম্পূর্ণ বলে মনে হতে পারে।
সঙ্গীর কোনো পোস্টে কে লাইক দিলেন, কার সঙ্গে নিয়মিত কথা হচ্ছে, পুরোনো পরিচিত কারও সঙ্গে কেন আবার যোগাযোগ। এসব বিষয় কখনো কখনো অকারণ সন্দেহ তৈরি করতে পারে।

একজনের কাছে যে আচরণ একেবারেই স্বাভাবিক, অন্যজনের কাছে সেটি অস্বস্তিকর মনে হতে পারে। সমস্যা তখন সোশ্যাল মিডিয়ার কোনো একটি পোস্টে নয়; সমস্যা তৈরি হয় আস্থা, সীমারেখা এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার জায়গায়।
আর সঙ্গীর অনলাইন কার্যকলাপ বারবার পরীক্ষা করে নিশ্চিন্ত হওয়ার চেষ্টা করাও সবসময় সমাধান নয়। বরং এতে সন্দেহ আরও বাড়তে পারে।
সম্পর্ক ভালো রাখতে সোশ্যাল মিডিয়া পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং দরকার ব্যবহারে একটু সচেতনতা।
একসঙ্গে খাওয়ার সময় ফোন দূরে রাখা যেতে পারে। রাতে ঘুমানোর আগে কিছুক্ষণ স্ক্রিন ছাড়া শুধু গল্প করা যায়। দিনের শেষে ‘আজ কেমন কাটল?’ এই ছোট প্রশ্নটিও অনেক বড় সংযোগ তৈরি করতে পারে।
সবচেয়ে জরুরি, দুজন মিলে ঠিক করা কোন সময়টা শুধু নিজেদের জন্য। সেই সময় ফোনে নোটিফিকেশন আসতেই পারে, নতুন পোস্টও আসতে পারে; কিন্তু সবকিছুর উত্তর সঙ্গে সঙ্গে দেওয়া জরুরি নয়।
কারণ সম্পর্কের মানুষটি পাশে থাকা অবস্থায় তাকে সময় দেওয়া অনেক সময় একটি ‘লাইক’ বা ‘রিপ্লাই’-এর চেয়ে বেশি মূল্যবান।
আজকের ব্যস্ত ডিজিটাল জীবনে সবচেয়ে দামি জিনিস হয়তো সময় নয়, মনোযোগ। একই ঘরে থেকেও যদি দুজনের মন থাকে আলাদা দুই স্ক্রিনে, তাহলে শারীরিক দূরত্ব না থাকলেও মানসিক দূরত্ব তৈরি হতে পারে।

সোশ্যাল মিডিয়া তখন সমস্যা নয়, যদি সেটি আমাদের সম্পর্কের জায়গা দখল না করে। বরং প্রযুক্তির সঙ্গে সম্পর্কটাকেও একটু সচেতনভাবে সামলাতে হবে অনলাইনে সংযুক্ত থাকার পাশাপাশি বাস্তব জীবনের মানুষটির সঙ্গে চোখে চোখ রেখে কথা বলার অভ্যাসটাও ফিরিয়ে আনতে হবে।
শেষ পর্যন্ত, একটি সম্পর্ককে কাছের করে তোলে শুধু প্রতিদিনের অনলাইন উপস্থিতি নয়; পাশে বসে মন দিয়ে শোনা, কথা বলা আর একে অপরকে সত্যিকারের সময় দেওয়া।
ছবি: এআই