
ফেরোমোন-ম্যাক্সিং এর প্রবক্তাদের দাবি, সুগন্ধি বা ডিওডোরেন্ট ব্যবহার না করে নিজের স্বাভাবিক শরীরের গন্ধকে ধরে রাখলেই নাকি বাড়তে পারে আকর্ষণ!

‘ম্যাক্সিং’ শব্দটি এখন অনলাইনের নানা ট্রেন্ডে বেশ পরিচিত। কোনো নির্দিষ্ট শারীরিক বৈশিষ্ট্য বা জীবনযাপনের অভ্যাসকে আরও উৎসাহিত করার চেষ্টা বোঝাতে এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়। ‘ফেরোমোন-ম্যাক্সিং’-এর ক্ষেত্রে নিজের স্বাভাবিক শরীরের গন্ধকে ধরে রাখা এবং সেটিকেই আকর্ষণের হাতিয়ার হিসেবে দেখানো হয়।
এই ট্রেন্ডে কিছু তরুণ গোসল কমিয়ে দেওয়া, ডিওডোরেন্ট ব্যবহার বন্ধ করা কিংবা চুলে শ্যাম্পু না করার মতো অভ্যাসের কথা বলছেন। তাঁদের যুক্তি, এসব পণ্য ব্যবহার করলে শরীরের স্বাভাবিক গন্ধ নাকি ঢাকা পড়ে যায়। ফলে শরীরের তথাকথিত ‘প্রাকৃতিক আকর্ষণ’ কমে যেতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু পোস্টে বিষয়টি আরও চরম পর্যায়ে গিয়েছে। এমনকি শরীরের গন্ধ বদলানোর উদ্দেশ্যে অস্বাভাবিক কিছু পদ্ধতি নিয়েও আলোচনা দেখা যাচ্ছে। তবে এসব দাবির পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য কোন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

মানুষের আকর্ষণ তৈরি হওয়ার পেছনে একক কোনো কারণ কাজ করে না। চেহারা, ব্যক্তিত্ব, পরিচিতি, আচরণ এমনকি গন্ধ সবকিছু মিলিয়েই একজন মানুষ আরেকজনের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারেন। তবে মানুষের শরীরে এমন কোনো সুস্পষ্ট ‘ফেরোমোন’ আছে, যা কাউকে দেখামাত্র বা কাছে আসামাত্র অন্য মানুষকে আকৃষ্ট করবে, এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো প্রতিষ্ঠিত নয়।
গবেষণায় মানুষের ‘ফেরোমোন’ নিয়ে এখনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। কিছু গবেষণা ইঙ্গিত দেয়, শরীরের গন্ধ একজন মানুষের খাদ্যাভ্যাস, স্বাস্থ্য কিংবা সম্ভাব্য জৈবিক সামঞ্জস্য সম্পর্কে কিছু তথ্য বহন করতে পারে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে ডিওডোরেন্ট বাদ দিলেই আকর্ষণ বেড়ে যাবে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও রয়েছে, স্বাভাবিক শরীরের গন্ধ আর দীর্ঘ সময়ের ঘাম, ব্যাকটেরিয়া ও অপরিচ্ছন্নতার গন্ধ এক বিষয় নয়।

সম্ভবত সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, ‘ফেরোমোন-ম্যাক্সিং’ সত্যিই কাজ করে কি না, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তরুন–তরুনীরা এই ট্রেন্ড ফলো করতে আগ্রহী হচ্ছে কেন। বর্তমান ডেটিং ট্রেন্ডে নিজেকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার এক ধরনের প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। ভালো ছবি, সুন্দর পোশাক, স্টাইলিশ চুল, নিখুঁত প্রোফাইল, চটকদার কথাবার্তা সবকিছুকেই যেন ‘নিজেকে আপগ্রেড’ করার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
‘ফেরোমোন-ম্যাক্সিং’ সেই একই মানসিকতার আরও অদ্ভুত একটি সংস্করণ। অনলাইনে কেউ যখন দাবি করছেন যে নিজের স্বাভাবিক গন্ধই হয়তো আকর্ষণের গোপন অস্ত্র, তখন অনেকের কাছেই ড্রেসিং টেবিলের ডিওডোরেন্টটিই হয়ে উঠছে ‘সমস্যা’।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো নতুন ধারণা ছড়িয়ে পড়া মানেই সেটি বিজ্ঞানসম্মত, এমন নয়। ‘ফেরোমোন-ম্যাক্সিং’-এর ক্ষেত্রেও সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সেখানেই। স্বাভাবিক শরীরের গন্ধ মানুষের পরিচয়ের একটি অংশ হতে পারে। কিন্তু ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা, নিয়মিত গোসল এবং শরীরের যত্ন বাদ দিয়ে সেই গন্ধকে আকর্ষণের রহস্যময় সূত্র হিসেবে দেখার পক্ষে শক্ত কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

ডেটিংয়ের জগতে আকর্ষণ বিষয়টি নিঃসন্দেহে জটিল। সেখানে গন্ধেরও ভূমিকা থাকতে পারে। কিন্তু আকর্ষণীয় হওয়ার সহজ কোনো ‘ম্যাক্সিং ফর্মুলা’ এখনো বিজ্ঞান দেয়নি। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নতুন ট্রেন্ড দেখে পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস বদলানোর আগে একটু চিন্তা–ভাবনা করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
ছবি: এআই