
রুমমেট বা কারও সঙ্গে ফ্ল্যাট শেয়ারিং করে একসঙ্গে থাকা আজকের নগরজীবনে খুবই সাধারণ বিষয়। বিদেশে তো এছাড়া গতিই থাকে না সেখানে পড়তে যাওয়া ছাত্রদের। ইউনিভার্সিটির আবাসন অনেক ক্ষেত্রেই পাওয়া যায় না। আবার পেলেও তার খরচ পড়ে যায় অনেক। তাই অনেকেই বাধ্য হন কারও না কারও সঙ্গে থাকতে একই ফ্ল্যাটে এমনকি এক রুমেও। এদিকে আমাদের দেশেও এখন পড়াশোনা, চাকরি বা ব্যবসার প্রয়োজনে এভাবে একসঙ্গে ফ্ল্যাট নিয়ে থাকেন অনেকে। কিন্তু রুমমেট হিসেবে সঠিক মানুষ বেছে না নিলে এটি দ্রুতই অস্বস্তিকর কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। হতে পারে চরম বিপদ, যেমন ঘটেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দুই বাংলাদেশি ছাত্র জাহিদ আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির সঙ্গে।

তাঁদেরকে পূর্ব পরিকল্পনা করে নৃশংসভাবে ঠান্ডা মাথায় খুন করে মরদেহ নষ্ট করে সরিয়ে ফেলার গুরুতর অভিযোগে এখন লিমনের রুমমেট হিশাম আবুঘরবেহকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এখনও সম্ভাব্য আততায়ী বলা হলেও প্রচুর প্রমাণ মিলেছে তার বিরুদ্ধে।

আমাদের দেশেও এমন ঘটনা যে ঘটে না বা ঘটতে পারে না, তা কিন্তু নয়। তাই নতুন কারও সঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক খেয়াল রাখা জরুরি। কেউ নিশ্চয়তা দিতে পারবে না যে এই বিষয়গুলো লক্ষ্য রাখলেই আমরা নিরাপদ থাকব। তবুও সাবধানের মার নেই।
নতুন কারও সঙ্গে থাকতে গেলে আপনার রুমমেটের এই বিষয়গুলো ভালোভাবে খেয়াল করুন। সন্দেহ হলে উড়িয়ে দেবেন না।
১. পরিচয় ও আর্থিক স্থিতিশীলতা যাচাই
প্রথমেই নিশ্চিত হোন, সম্ভাব্য রুমমেটের একটি নির্ভরযোগ্য আয়ের উৎস আছে কি না। ভাড়া, বিল ও অন্যান্য খরচ কীভাবে ভাগ হবে—সে বিষয়ে স্পষ্টতা থাকা প্রয়োজন। আর্থিক অনিশ্চয়তা ভবিষ্যতে বড় সমস্যার কারণ হতে পারে।
২. পূর্ব অভিজ্ঞতা ও রেফারেন্স
তিনি আগে কোথায় ছিলেন, আগের রুমমেট বা বাড়িওয়ালার সঙ্গে সম্পর্ক কেমন ছিল—এসব জানার চেষ্টা করুন। সম্ভব হলে রেফারেন্স নিন। এতে তার আচরণ সম্পর্কে বাস্তব ধারণা পাওয়া যায়। তাঁর পরিবার সম্পর্কে খোঁজ নিন। কোনো বিষয়ে সন্দেহ হলে তাঁর কোনো অপরাধমূলক কাজের ইতিহাস বা ক্রিমিনাল রেকর্ড আছে কিনা তা চেক করতে দ্বিধা করবেন না। এই বিষয়টি খেয়াল করলেই হয়তো লিমন-বৃষ্টির সঙ্গে এত বড় ভয়ংকর ঘটনা নাও ঘটতে পারত।

৩. জীবনযাত্রার মিল-অমিল
ঘুমের সময়, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, অতিথি আনা, শব্দ সহ্য করার ক্ষমতা—এসব দৈনন্দিন বিষয় মিল না থাকলে ঝামেলা অনিবার্য। শুরুতেই এসব নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা উচিত।
৪. অভ্যাস ও ব্যক্তিগত আচরণ
মদ্যপান, ধূমপান বা অন্য কোনো অভ্যাস আছে কি না তা জেনে নিন। এগুলো আপনার স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে।
৫. আপনার করা প্রশ্নের প্রতি তার প্রতিক্রিয়া
আপনি যখন স্বাভাবিক কিছু প্রশ্ন করেন, তিনি কি সেগুলোর সরাসরি উত্তর দেন? নাকি এড়িয়ে যান বা বারবার ভিন্ন তথ্য দেন? অসঙ্গতিপূর্ণ তথ্য সতর্কতার ইঙ্গিত হতে পারে।

৬. তাড়াহুড়া বা চাপ সৃষ্টি করা
“আজই সিদ্ধান্ত নিন”, “এখনই উঠতে হবে”—এ ধরনের চাপ সৃষ্টি করলে সতর্ক থাকুন। সৎ মানুষ সাধারণত যাচাইয়ের সময় দিতে আপত্তি করেন না।
৭. সীমারেখার প্রতি সম্মান
ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও সীমারেখা মানার মানসিকতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কথা বলার সময়ই বোঝা যায়, তিনি আপনার মতামত ও ব্যক্তিগত পরিসরকে কতটা সম্মান করেন।

৮. রাগ ও আচরণের নিয়ন্ত্রণ
অল্পতেই রেগে যাওয়া, প্রতিক্রিয়ায় অতিরিক্ত উত্তেজিত হওয়া—এসব ভবিষ্যতের ঝুঁকির লক্ষণ হতে পারে। শান্ত ও যুক্তিসঙ্গত আচরণ নিরাপদ সহাবস্থানের জন্য জরুরি।
৯. অন্যদের সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি
যদি কেউ তার আগের সব রুমমেট বা পরিচিতদের দোষারোপ করে, তাহলে বিষয়টি একপাক্ষিক নাও হতে পারে। এতে তার নিজের আচরণ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
১০. লিখিত চুক্তি ও নিয়ম নির্ধারণ
সবশেষে, ভাড়া, বিল, অতিথি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা—এসব বিষয়ে একটি লিখিত চুক্তি রাখা ভালো। এতে ভুল বোঝাবুঝি কমে এবং উভয় পক্ষের দায়িত্ব স্পষ্ট থাকে। সব মিলিয়ে, একজন ভালো রুমমেট মানে শুধু নিরাপদ মানুষ নয়, বরং দায়িত্বশীল, স্বচ্ছ ও সম্মানজনক আচরণকারী ব্যক্তি। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সময় নিয়ে যাচাই করুন। এটাই নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের চাবিকাঠি।
সূত্র: থট ক্যাটালগ, ভেরি ওয়েল মাইন্ড
ছবি: এআই ও ইন্সটাগ্রাম