শুধু ট্রফির লড়াই নয়, ৬ বছরের ছেলেকে নিয়ে এক অজানা যুদ্ধ লড়ে আসছেন স্পেনের কুকুরেয়া
শেয়ার করুন
ফলো করুন

ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে স্পেনের রক্ষণভাগে অন্যতম ভরসা বিশ্বকাপে দারুণ ছন্দে থাকা মার্ক কুকুরেয়া। প্রতিপক্ষের গোল আটকাতে মরিয়া আর দলের জন্য সব করতে প্রস্তুত থাকার মানসিকতাই তাঁকে সমর্থকদের প্রিয় করে তুলেছে। তবে মাঠের বাইরেও জীবন আছে। আর সেখানে কুকুরেয়ার আরেকটি লড়াই আছে।

স্পেনিশ ডিফেন্ডার কুকুরেয়া ও তাঁর বড় ছেলে মাতেও
স্পেনিশ ডিফেন্ডার কুকুরেয়া ও তাঁর বড় ছেলে মাতেও

ফুটবল মাঠের বাইরের জীবন কুকুরেয়াকে নতুনভাবে চিনিয়েছে তাঁর বড় ছেলে মাতেও। অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারে (এএসডি) আক্রান্ত ছেলেকে ঘিরে প্রতিদিনের শেখা, মানিয়ে নেওয়া আর ভালোবাসার অভিজ্ঞতাই বদলে দিয়েছে কুকুরেয়ার জীবন দেখার দৃষ্টিভঙ্গি।

বিজ্ঞাপন

যেহেতু নতুন পরিবেশ, শব্দ আর ভিড় তাকে অস্থির করে তোলে, তাই  বিশ্বকাপজুড়ে বাবার দুর্দান্ত পারফরম্যান্স গ্যালারি থেকে দেখার সুযোগ হয়না মাতেওর। তবে ফাইনালে স্পেনের হয়ে ইতিহাস গড়ার লড়াইয়ে গ্যালারিতে বসে খেলা দেখবে ছোট্ট মাতেও।

ফাইনালে থাকবে বাবার সবচেয়ে বড় সমর্থক

মাতেও
মাতেও

বিশ্বকাপ চলাকালে মাতেওকে খুব বেশি স্টেডিয়ামে আনেননি কুকুরেয়া। কারণ অটিজমে আক্রান্ত ছেলের জন্য গ্যালারির তীব্র শব্দ, ভিড় আর আলো অনেক সময় অসহনীয় হয়ে ওঠে।
জুনে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘সে খুব বেশি স্টেডিয়ামে যায় না। স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে গেলে আমাদের নির্দিষ্ট বক্সে বসে থাকতে ভালো লাগে। কিন্তু গ্যালারির পরিবেশ তার জন্য কঠিন। এখানকার গরমও তাকে অস্বস্তিতে ফেলে। সবকিছু ঠিক থাকলে, সে শুধু ফাইনাল ম্যাচেই আসবে।’

কুকুরেয়ার সেই ইচ্ছাই এবার সত্যি হতে যাচ্ছে। বিশ্বকাপজুড়ে বাবার দুর্দান্ত পারফরম্যান্স গ্যালারি থেকে দেখা না হলেও, ফাইনালে স্পেনের হয়ে ইতিহাস গড়ার লড়াইয়ে বাবাকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাবে ছোট্ট মাতেও। ফুটবলের ভাষায় এটি একটি ফাইনাল, কিন্তু কুকুরেয়ার কাছে গ্যালারিতে ছেলের উপস্থিতিই হয়তো হবে ম্যাচটির সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

বিজ্ঞাপন

যেদিন বুঝলেন, কিছু একটা ভিন্ন

কুকুরেয়া, ক্লদিয়া রদ্রিগেজ ও তাঁদের তিন সন্তান
কুকুরেয়া, ক্লদিয়া রদ্রিগেজ ও তাঁদের তিন সন্তান

কুকুরেয়া ও তাঁর সঙ্গী ক্লদিয়া রদ্রিগেজের তিন সন্তান। মাতেও, রিও ও ক্লদিয়া। বড় ছেলে মাতেও খুব ছোট থাকতেই তাঁরা বুঝতে শুরু করেন, অন্য শিশুদের তুলনায় তার আচরণ কিছুটা আলাদা।

শুরুর দিকে নিজেরেরাও বুঝতে পারছিল না মাতেওকে কীভাবে সাহায্য করা যায়
শুরুর দিকে নিজেরেরাও বুঝতে পারছিল না মাতেওকে কীভাবে সাহায্য করা যায়

কথা বলতে দেরি হচ্ছিল, নতুন পরিবেশেও সহজে মানিয়ে নিতে পারছিল না। গান শুনলে সে হাত নাড়ত, কিন্তু চোখে চোখ রেখে যোগাযোগ করত না। প্রথমদিকে চিকিৎসকেরাও নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি। পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নিশ্চিত হয়, মাতেও অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারে (এএসডি) আক্রান্ত।
সেই সময়ের অসহয়ত্ব ফুটে উঠে কুকুরেয়ার এক ইন্টারভিউতে। তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে কঠিন বিষয় ছিল, আমরা বুঝতেই পারছিলাম না কীভাবে ওকে সাহায্য করব।’

কেউ বাবা-মা হওয়া শেখায় না

ছেলের অটিজম নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে কথা বলতে গিয়ে একাধিকবার আবেগাপ্লুত হয়েছেন কুকুরেয়া।
তাঁর ভাষায়, ‘কেউ আপনাকে বাবা-মা হওয়া শেখায় না। অটিজমে আক্রান্ত একটি শিশু তার ভাইবোনদের মতো সবকিছু বুঝতে পারে না। তাই মা–বাবাকেই শিখতে হয়, কীভাবে তাকে বুঝবেন।’

কেউ বাবা-মা হওয়া শেখায় না
কেউ বাবা-মা হওয়া শেখায় না

নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন এই স্পেনিশ তারকা। শুরুর দিনগুলো ছিল বেশ কঠিন। সাধারণ স্কুলে ভর্তি হলেও মাতেও সেখানে মানিয়ে নিতে পারেনি। নতুন পরিবেশ, শব্দ আর ভিড় তাকে অস্থির করে তুলত। স্কুলে গেলেই কান্না করত, কয়েক ঘণ্টার বেশি থাকতে চাইত না। পরে বিশেষায়িত একটি স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর শিক্ষক ও থেরাপিস্টদের সহায়তায় ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করে।

পরিবারে স্বস্তি, মাঠেও আত্মবিশ্বাস

চেলসিতে যোগ দেওয়ার পর কুকুরেয়ার শুরুটা সহজ ছিল না। বড় অঙ্কের ট্রান্সফার ফির চাপ, প্রত্যাশা আর সমালোচনার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে। একই সময়ে পরিবারও লড়ছিল মাতেওর অটিজম নিয়ে।

মাতেওর জন্য উপযুক্ত স্কুল, থেরাপি ও বিশেষজ্ঞ পাওয়ার পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে
মাতেওর জন্য উপযুক্ত স্কুল, থেরাপি ও বিশেষজ্ঞ পাওয়ার পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে

ধীরে ধীরে ছেলের জন্য উপযুক্ত স্কুল, থেরাপি ও বিশেষজ্ঞদের সহায়তা পাওয়ার পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। পরিবারে স্বস্তি ফিরলে সেই ইতিবাচক পরিবর্তনের ছাপ পড়ে তাঁর ফুটবল ক্যারিয়ারেও।
এরপরই যেন নতুন আত্মবিশ্বাস ফিরে পান স্প্যানিশ এই ডিফেন্ডার। ধারাবাহিক পারফরম্যান্সে হয়ে ওঠেন দলের অন্যতম নির্ভরতার নাম, আর এখন বিশ্বকাপের ফাইনালেও স্পেনের অন্যতম বড় ভরসা।

ফুটবলের আগে এখন পরিবার

কুকুরেলার কাছে পরিবারই এখন সব
কুকুরেলার কাছে পরিবারই এখন সব

ছেলের অভিজ্ঞতা কুকুরেয়ার জীবনের অগ্রাধিকারই বদলে দিয়েছে।
এখন নতুন কোনো ক্লাবে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তিনি শুধু বেতন বা খেলার সুযোগ দেখেন না। প্রথমেই খোঁজ নেন, সেখানে অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের জন্য বিশেষায়িত স্কুল, থেরাপি ও প্রয়োজনীয় সহায়তা ব্যবস্থা আছে কি না।

ফুটবলারদের জীবনও নিখুঁত নয়

 ‘মেরিড টু দ্য গেম’-এ ছেলের অটিজম নিয়ে কথা বলেন কুকুরেলা
‘মেরিড টু দ্য গেম’-এ ছেলের অটিজম নিয়ে কথা বলেন কুকুরেলা

প্রাইম ভিডিওর তথ্যচিত্র ‘মেরিড টু দ্য গেম’-এ ছেলের অটিজম নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কান্না ধরে রাখতে পারেননি কুকুরেয়া।

‘অনেকেই মনে করেন ফুটবলারদের জীবন নিখুঁত। কিন্তু আমাদেরও সাধারণ মানুষের মতো সমস্যা আছে, সংগ্রাম আছে’, বলেন তিনি।

নিজের অভিজ্ঞতা প্রকাশ্যে আনার কারণও ব্যাখ্যা করেছেন তিনি। তাঁর বিশ্বাস, অটিজম নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করলে আরও অনেক পরিবার প্রাথমিক লক্ষণগুলো দ্রুত বুঝতে পারবে এবং সময়মতো বিশেষজ্ঞের সহায়তা নিতে উৎসাহিত হবে।

ট্রফির চেয়েও বড় জয়

ছোট্ট মাতেও, কুকুরেলা ও ক্লদিয়া রদ্রিগেজ
ছোট্ট মাতেও, কুকুরেলা ও ক্লদিয়া রদ্রিগেজ

বিশ্বকাপের ফাইনালে হয়তো কুকুরেয়া আরেকটি ট্রফির জন্য লড়বেন। জিততেও পারেন, হারতেও পারেন। কিন্তু তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় জয় এখন আর কোনো পদক বা শিরোপা নয়; বরং মাতেওর ছোট্ট ছোট্ট অগ্রগতি।
‘সবকিছুই বেশি কঠিন। কিন্তু ও যখন ছোট্ট একটা অগ্রগতি করে, সেই আনন্দের সঙ্গে কোনো কিছুর তুলনা হয় না’, বলেছেন তিনি।

সূত্র: গোল ডট কম, ইনসাইড ফিফা

ছবি: ইন্সটাগ্রাম

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬, ১০: ৪১
বিজ্ঞাপন